সতীর্থদের কাছে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন শুধুই ‘দাদা’। আর সেই দাদাই ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে গাব্বা টেস্টে ব্যাট হাতে এমন জবাব দিয়েছিলেন, যা তাঁর টেস্ট কেরিয়ারের অন্যতম মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হয়ে ওঠে।
2
14
ব্রিসবেনে প্রথম টেস্টের আগে অস্ট্রেলীয়রা সৌরভকে ‘চিন মিউজিক’ অর্থাৎ একের পর এক বাউন্সার দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। কিন্তু মাঠে নেমে ভারতীয় অধিনায়ক যেন সেই চ্যালেঞ্জই উপভোগ করলেন। অস্ট্রেলিয়ার পেস আক্রমণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে করেন ১৪৪ রান। এটি ছিল তাঁর টেস্ট কেরিয়ারের ১১তম শতরান এবং অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম।
3
14
যে ব্যাটসম্যানকে বাউন্সি উইকেটে শর্ট বলের দুর্বল খেলোয়াড় হিসেবে সমালোচনা করা হয়েছিল, সেই সৌরভই অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে দাঁড়িয়ে বাউন্সারের জবাব দেন ব্যাটে। তাঁর এই ইনিংস শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য ছিল না, ভারতীয় দলের জন্যও তৈরি করেছিল নতুন আত্মবিশ্বাস।
4
14
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে গাব্বায় ভারতকে নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী ছিলেন না ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা। দ্রুত ও বাউন্সি উইকেটে ভারতীয় দল প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করতে পারবে না, এমন ধারণাই ছিল অনেকের। কিন্তু সৌরভের ১৪৪ সেই ধারণায় প্রথম ধাক্কা দেয়।
5
14
৩১ বছরের ভারত অধিনায়ক নিজের অতীতের দুর্বলতার মুখোমুখি হয়েই খেলেছিলেন এই ইনিংস। শর্ট বলের বিরুদ্ধে তাঁর সমস্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চললেও গাব্বায় সেই পুরনো সংশয়কে পাশে সরিয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেন তিনি। তাঁর ব্যাটিং যেন গোটা দলকেই বার্তা দিল, অস্ট্রেলিয়াকে ভয় পাওয়ার দিন শেষ।
6
14
বিদেশের মাটিতে ভারতের দুর্বল রেকর্ডও তখন আলোচনায় ছিল। ৭১ বছরে বিদেশে ভারত মাত্র ১৮টি টেস্ট জিতেছিল। তবে সৌরভের নেতৃত্বে শেষ ২০টি ম্যাচে তার মধ্যে পাঁচটি জয় এসেছিল। তারও আগে ২০০১ সালে তাঁর নেতৃত্বেই ভারত অস্ট্রেলিয়াকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে স্টিভ ওয়ার দলের টানা ১৬টি টেস্ট জয়ের বিশ্বরেকর্ড থামিয়েছিল।
7
14
সৌরভের অধিনায়কত্বের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে চাপে রাখা। ২০০১ সালের সিরিজে স্টিভ ওয়াকে টসের জন্য মাঠে অপেক্ষা করানোর ঘটনাও তাঁর সেই আগ্রাসী নেতৃত্বের উদাহরণ হয়ে আছে। ভিভিএস লক্ষ্মণের ২৮১ এবং হরভজন সিংয়ের ৩২ উইকেটের মতোই সৌরভের মানসিক লড়াইও সেই সিরিজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।
8
14
তবে সতীর্থদের কাছে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল, দলের খেলোয়াড়দের উপর আস্থা রাখা। হরভজন সিং আটটি টেস্ট খেলে দল থেকে বাদ পড়েছিলেন। সৌরভই নির্বাচকদের তাঁকে ফেরানোর ব্যাপারে রাজি করান।
9
14
আশিস নেহরাকেও তিনি ফের সুযোগ দিয়েছিলেন। ১৯৯৯ সালে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে টেস্ট অভিষেকের পর নেহরা দল থেকে ছিটকে গিয়েছিলেন। ২০০১-এর শেষ দিকে সৌরভ তাঁকে ফেরান এবং জাহির খানের সঙ্গে তৈরি হয় ভারতের সফল বাঁ হাতি পেস জুটি।
10
14
শুধু তাই নয়, শ্রীলঙ্কায় একটি ত্রিদেশীয় সিরিজে সৌরভই বীরেন্দ্র সেহওয়াগকে ওপেন করানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই সিদ্ধান্ত পরে একের পর এক ম্যাচজয়ী ইনিংসের জন্ম দেয়। এমনকি ওপেনিংয়ে সেহওয়াগের জায়গা করে দিতে গিয়ে নিজেকেই সরিয়ে নিয়েছিলেন সৌরভ।
11
14
তবে তাঁর নিজের ব্যাটিং নিয়েও সমালোচনা কম ছিল না। ভাল পেস আক্রমণের বিরুদ্ধে তাঁর টেকনিক নিয়ে প্রশ্ন উঠত, বিশেষ করে অফস্টাম্পের বাইরের বল ছেড়ে দেওয়া, সেখানে ব্যাট চালিয়ে ফেলা এবং শর্ট বলের বিরুদ্ধে অস্বস্তিকর পুল শট নিয়ে।
12
14
গাব্বায় ১৪৪ তাই সৌরভের কাছে স্পেশাল ইনিংস হয়ে ওঠে। বিশ্বকাপে তিনটি শতরান করে ভারতকে ফাইনালে তুললেও তাঁর ব্যাট নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে এই শতরান সেই সমালোচনা অনেকটাই থামিয়ে দেয়।
13
14
ম্যাচের পর সৌরভ বলেছিলেন, তাঁর ক্রিকেটজীবনে অভিষেকের শতরানের পর এটিই ছিল দ্বিতীয় সেরা সেঞ্চুরি। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে শতরান করা তাঁর স্বপ্ন ছিল। আর সেই শতরান এসেছিল তখনকার বিশ্বের সেরা দলের বিরুদ্ধে।
14
14
তবে লড়াই তখনও শেষ হয়নি। অ্যাডিলেডে দ্বিতীয় টেস্টের আগে অস্ট্রেলিয়ার পেসারদের কাছ থেকে আরও ‘চিন মিউজিক’-এর অপেক্ষা ছিল। আর সৌরভের নিজের কথাতেই, সিরিজ তখন সবে শুরু। সেই সিরিজে সৌরভের ১৪৪ নিয়ে এখনও চর্চা হয়। ভারতীয় দলের লক্ষ্য স্থির করে দিয়েছিল সৌরভের ওই শতরান। সৌরভের এই সেঞ্চুরি কেউ কোনওদিন ভুলবেন না।