শুটিং শুরু হতে আর মাত্র ১০ দিন বাকি। হঠাৎই জানতে পারলেন, যে ছবির জন্য ৬ মাস ধরে দিন-রাত এক করে পরিশ্রম করছেন, সেখান থেকে বাদ পড়েছেন তিনি। প্রযোজকেরা তাঁর জায়গায় সুযোগ দিচ্ছেন তৎকালীন এক বড় তারকাকে। ঠিক এমনটাই ঘটেছিল বর্ষীয়ান অভিনেতা অনুপম খেরের সঙ্গে। ১৯৮৪ সালে তাঁর জীবনের প্রথম ছবি ‘সারাংশ’-এর শুটিংয়ের ঠিক আগে।


সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে পরিচালক মহেশ ভাটের সঙ্গে হওয়া তাঁর সেই পুরনো অধ্যায়টি নতুন করে উস্কে দেন অনুপম খের। অভিনেতা জানিয়েছেন, যখন মহেশ ভাট তাঁকে ‘সারাংশ’ ছবির মূল চরিত্রের জন্য বেছে নেন, তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২৭ বছর। ছবিতে তাঁকে এক ৬৫ বছরের বৃদ্ধ, শোকার্ত বাবার চরিত্রে অভিনয় করতে হতো। এই জটিল চরিত্রের জন্য টানা ৬ মাস ধরে বয়স্কদের মতো হাঁটাচলা ও কথা বলার রিহার্সাল দেন তিনি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে ছবির প্রযোজনা সংস্থা রাজশ্রী প্রোডাকশন একজন নবাগত অভিনেতার ওপর সুযোগ দেয়। বাণিজ্যিক সাফল্যের কথা চিন্তা করে অনুপম খেরকে বাদ দিয়ে সেই সময়ের সুপারস্টার সঞ্জীব কুমারকে কাস্ট করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।


প্রযোজনা সংস্থার এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে অনুপম খের মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েন। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম এক নিমেষে ভেস্তে যাওয়ায় তিনি মুম্বই শহর ছেড়ে নিজের বাড়ি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সমস্ত জিনিসপত্র গুছিয়ে ট্যাক্সি নিয়ে রেলস্টেশনের দিকে রওনাও হয়ে যান। তবে যাওয়ার আগে ভাবেন, পরিচালকের মুখে তাঁর আসল রূপটা প্রকাশ করে যাওয়া দরকার।


অনুপম খের যখন মহেশ ভাটের ফ্ল্যাটে পৌঁছন, তখন সেই ফ্ল্যাটের  লিফট নষ্ট ছিল। তীব্র ক্ষোভ নিয়ে তিনি হেঁটে ৬ তলার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠেন। ঘরের ভেতর ঢুকতেই মহেশ ভাট পরিস্থিতি সামাল দিতে তাঁকে অন্য একটি ছোট চরিত্রে অভিনয় করার প্রস্তাব দিলে অনুপম রাগে আরও ফেটে পড়ে। চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, "নিচে ট্যাক্সিতে আমার সব মালপত্র রাখা আছে, আমি এই শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি। কিন্তু যাওয়ার আগে আপনাকে বলে যেতে চাই, আপনি এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রতারক’ এবং ভণ্ড! আপনি সততার ওপর সিনেমা বানাচ্ছেন, অথচ নিজের জীবনে আপনি বিন্দুমাত্র সৎ নন।" চরম উত্তেজিত থাকায় কথার শেষে রাগের মাথায় পরিচালককে ‘অভিশাপ’ পর্যন্ত দিয়ে বসেন অভিনেতা।


সেসময় অনুপম খেরের চোখের জল, তীব্র ক্ষোভ আর অভিনয়ের প্রতি এমন জেদ দেখে স্তব্ধ হয়ে যান মহেশ ভাট। তিনি বুঝতে পারেন যে এই চরিত্রের দুঃখ-কষ্ট পর্দায় ফুটিয়ে তোলার জন্য অনুপম ছাড়া আর কেউ উপযুক্ত নয়। তারপর প্রযোজনা সংস্থাকে অনুপমকে নেওয়ার জন্য বলেন তিনি। পরিচালকের সেই একটি ফোনেই চরিত্রটি ফিরে পান অভিনেতা।


মুক্তি পাওয়ার পর ‘সারাংশ’ সিনেমাটি বক্স অফিসে ঝড় তোলে এবং অনুপম খেরের অভিনয় দেখে দর্শক চোখের জল ধরে রাখতে পারেনি। এমনকী সেই বছর অস্কারের মঞ্চেও ভারতের তরফ থেকে অফিশিয়াল এন্ট্রি হিসেবে পাঠানো হয়েছিল এই ছবিটিকে।