টলিপাড়ায় আরও এক যুগের অবসান। শেষ হল বাংলা সিনেমার এক স্বতন্ত্র, স্পষ্টবক্তা ও মেরুদণ্ডী পরিচালকের জীবনাবসান। আর শোনা যাবে না সেই দৃপ্ত, আপসহীন কণ্ঠস্বর। বুধবার নিজের আবাসনের চত্বর থেকেই উদ্ধার হল ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ খ্যাত বিশিষ্ট পরিচালক অনীক দত্ত -র নিথর শরীর। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে অনুমান, এটি আত্মহত্যার ঘটনা। তবে পুলিশ আরও জানিয়েছে, তদন্ত চলছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পূর্ণাঙ্গ না এলে স্পষ্ট করে কিছু বলা সম্ভব নয়। ফলে পরিচালকের মত্যুর কারণ ঘিরে ধোঁয়াশা এখনও অব্যাহত। আজ সন্ধেবেলায় অনীক দত্তের দেহ ময়নাতদন্তের জন্য এসএসকেএম হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। 

পরিচালক অনীক দত্ত-র আকস্মিক রহস্যমৃত্যুর পর স্টুডিও পাড়ায় যখন শুধুই শোক আর আত্মহত্যার ধোঁয়াশা, ঠিক তখনই ওঁর অনুরাগীদের মনে ভেসে উঠছে ওঁর সেই চেনা মেজাজের চওড়া হাসি আর রসবোধ। চিরকালই ‘স্পিরিটেড’ এবং খাঁটি বাঙালি মননের মানুষ ছিলেন অনীক।এহেন আবহেই প্রয়াত পরিচালকের খানিক অজানা দিকের উপর ঘুরে দেখা যাক। এবং সেই পথ দেখিয়েছিলেন খোদ অনীক-ই। ছোটবেলা থেকে খুব ডানপিটে না হলেও অ্যাডভেঞ্চারের  প্রতি প্রবল টান ছিল অনীক দত্তের। এবং করতেও শুরু করে দিয়েছিলেন। তা কিন্তু মোটেই আকাশকুসুম অ্যাডভেঞ্চার নয়। যাকে বলে হাতে-পায়ে অ্যাডভেঞ্চার। আজকাল ডট ইন-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের ছোটবেলার এমনই এক রঙিন ও মজাদার অধ্যায় নিজের স্বভাবসিদ্ধ উইটি ভঙ্গিতে হাট করে খুলে দিয়েছিলেন ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর পরিচালক।


একটি ঘটনা বলা যাক। প্রথমে পাঠ ভবন, সাউথ পয়েন্ট এবং তারপর কলেজ সেন্ট জেভিয়ার্স।  স্কুল জীবনেই প্রথমবার বাবা-মায়ের হাত ধরে প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা দেখতে গিয়েছিলেন ছোট্ট অনীক। হলিউড ছবি - নাম ছিল ‘হাটারি’। ছবিটা ছিল একদল লোক কীভাবে নানান কসরৎ করে বন্যপ্রাণী ধরছে  এবং তারপর তাদের হাটে-বাজারে বিক্রি করবে ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই সিনেমার একটি রোমাঞ্চকর দৃশ্য ছোট্ট অনীকের মনে গভীরভাবে দাগ কেটে গিয়েছিল। অনীকের কথায়, " একটা স্টেশন ওয়াগনের সামনে চেয়ার সাঁটানো, সেখান একজন বসে ল্যাসো ছুড়ে গন্ডার ধরল! সে কী উত্তেজনা! এবার দেখে তো ফেলেছি, করতে হবে ওরকম। কী করি, কী করি? মাথায় একটা মারাত্মক বুদ্ধি খেলে গেল। আমার বাবারও একটা স্টেশন ওয়াগন ছিল। মনে আছে, ব্যারাকপুরের জুট মিল কোয়াটার্সে আমার মামারবাড়ির পরিবার থাকতেন। দাদু থাকতেন। তো, গিয়েছি সেখানে। এবার সেখানে গিয়ে দড়ি পাকিয়ে পাকিয়ে একটা ল্যাসো বানিয়েছিলাম! বেশ পাকাপোক্ত ল্যাসো।  একজন বানাতে সাহায্য করেছিলাম। তো সেখানে তো আর জন্তু-জানোয়ার পেতাম না, তাই পথচলতি মানুষদের উপরেই...বুঝতেই পারছেন!” বলতে বলতে হো হো করে হেসে উঠেছিলেন ভূতের ভবিষ্যতের পরিচালক। 

 

 

এই অবধি বলে নিজের চিরপরিচিত ভঙ্গিতে হো হো করে হেসে উঠেছিলেন পরিচালক। হাসি থামিয়ে ওঁর সংযোজন ছিল— “ব্যাপারটা মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারত এবং আমি পিটুনিও খেতে পারতাম, যদি আমার হাতের টিপ দারুণ হতো! কিন্তু সুখের বিষয়, আমার নিশানা বা টিপ মোটেই ভালো ছিল না। দড়ি কারোর গায়ে লাগত না। তাই সে যাত্রা খুব জোর বেঁচে গিয়েছিলাম।”

আজ অনীক দত্তর এই চলে যাওয়ার দিনে ওঁর এই মন ভালকরা মজার গল্পগুলোই প্রমাণ করে দেয়— উনি হয়তো আজ আর আমাদের মধ্যে নেই, কিন্তু ওঁর সৃষ্টি, ওঁর রসবোধ আর ওঁর এই ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ চরিত্র চিরকাল বাঙালির মনে চিরকাল থাকবে।