বলিউডের থ্রিলার এবং হরর সিনেমাপ্রেমীদের কাছে ১৯৮৮ সালের জনপ্রিয় ছবি ‘ভিরানা’ এক আইকনিক নাম। রামসে ব্রাদার্স -এর এই ছবি বক্স অফিসে ঝড় তোলার পাশাপাশি দর্শকের মনে ভয়ের পাশাপাশি  মুগ্ধতা তৈরি করেছিল। আর এই ছবির মাধ্যমেই রাতারাতি তারকার আসনে পৌঁছেছিলেন অভিনেত্রী জ্যাসমিন ধুন্না। কিন্তু সবথেকে অদ্ভুত বিষয় হল, যখনই বলিউড তাঁর সাফল্যের রঙে রঙিন হতে চেয়েছিল, ঠিক সেই সময়ই রুপোলি পর্দা থেকে চিরতরে হারিয়ে যান তিনি। প্রায় চার দশক কেটে গেলেও তাঁর এই রহস্যজনক অন্তর্ধান আজও বলিউডের অন্যতম বড় অমীমাংসিত রহস্য। 

খুব কম বয়সেই বিনোদন দুনিয়ায় পা রেখেছিলেন জ্যাসমিন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বিনোদ খান্নার সঙ্গে ‘সরকারি মেহমান’ ছবিতে অভিনয় করে বড়পর্দায় আত্মপ্রকাশ করেছিলেন তিনি। যদিও সেই ছবি বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। এরপর ১৮ বছর বয়সে ‘ডিভোর্স’ ছবিতেও কাজ করেন, কিন্তু তাতেও বিশেষ পরিচিতি পাননি।

দীর্ঘদিন স্ট্রাগল করার পর র‍্যামসে ব্রাদার্সের হাত ধরে আসে তাঁর জীবনের মোড় ঘোরানো সুযোগ। সেই সময় মূলধারার প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রীরা যেখানে হরর বা বি-গ্রেড ঘরানার ছবি এড়িয়ে চলতেন, জ্যাসমিন সেই ঝুঁকি সানন্দে গ্রহণ করেছিলেন।

১৯৮৮ সালের ৬ মে মুক্তি পায় ‘ভিরানা’। ছবিতে এক রক্তমাংসের সুন্দরীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন জাসমিন, যাঁর ওপর ভর করেছিল এক ভয়ঙ্কর ডেমন বা পিশাচী। ছবির বাজেট কম হলেও এটি দারুণ বাণিজ্যিক সাফল্য পায়, বিশেষ করে ছোট শহর ও গ্রামীণ এলাকায়। জাসকিনের মায়াবী চোখ, নিষ্পাপ সৌন্দর্য এবং পর্দায় তাঁর সেই হাড়হিম করা রূপ দর্শকদের চোখ কপালে তুলেছিল। গবেষক ধ্রুব সোমানির মতে, “গ্রামের মানুষ অন্ধকারে একা হাঁটতে ভয় পেত। জাসমিন হয়ে উঠেছিলেন ভয়ের আসল প্রতীক।”
প্রযোজক দীপক রামসে এক সাক্ষাৎকারে জানান, ছবির মুক্তির পর চারিদিকে হুলুস্থুল কাণ্ড বেধে যায়। প্রযোজকরা রামসে ব্রাদার্সের অফিসে লাইন দিয়ে জাসমিনের ফোন নম্বর চাইতে শুরু করেন। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটে যায় অপ্রত্যাশিত এক ঘটনা।

 

বলিউড যখন তাঁর পায়ের নিচে লাল কার্পেট বিছিয়ে দিতে প্রস্তুত, তখনই অভিনয় জগত থেকে পুরোপুরি সরে দাঁড়ান জ্যাসমিন। তিনি ফোন ধরা বন্ধ করে দেন এবং এরপর আর কখনও কোনও ছবিতে কাজ করেননি।

তাঁর এই অন্তর্ধানকে ঘিরে বহু জল্পনা তৈরি হয়:

আন্ডারওয়ার্ল্ডের নজর: অনেকের মতে, কিছু অবাঞ্ছিত ও আন্ডারওয়ার্ল্ডের যোগসূত্র থাকা ব্যক্তির নজর পড়ার কারণে ভয়ে দেশ ছেড়েছিলেন জাসমিন।

আমেরিকায় বসবাস ও ডিপ্রেশন: কেউ বলেন তিনি আমেরিকায় গিয়ে থিতু হয়েছেন, আবার কারও মতে মায়ের মৃত্যুর পর গভীর অবসাদে একা হয়ে যান তিনি।

মৃত্যুর গুজব: এমন গুঞ্জনও রটেছিল যে তিনি আর বেঁচে নেই।

আজ কোথায় আছেন জ্যাসমিন?

এই সব গুজবের মাঝেই ‘ভিরানা’ ছবির সহ-অভিনেতা হেমন্ত বীরজে একটি বড় তথ্য সামনে আনেন। তিনি জানান যে জাসমিন জীবিত আছেন এবং আমেরিকায় বসবাস করেন। মাঝে মাঝে তিনি মুম্বইয়ের ভার্সোভাতেও আসেন। হেমন্তের দাবি, জাসমিনের সঙ্গে তাঁর ফোনে কথাও হয়, কিন্তু জাসমিন নিজের সেই ব্লকবাস্টার ছবি বা অতীত নিয়ে মুখ খুলতে নারাজ।

পরিচালক দীপক রামসে জানান, শুরুতে তুলসী ও শ্যাম রামসের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলেও ধীরে ধীরে তিনি সবার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে পুরোপুরি আড়ালে চলে যান।  পরিচালক দীপক রামসেও একসময় স্বীকার করেছিলেন যে, শুরুতে তুলসী ও শ্যাম রামসের সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও ধীরে ধীরে একেবারে হারিয়ে যান জাসমিন। আজও ভক্তদের মনে একটাই প্রশ্ন—কোথায় আছেন তিনি?

হয়তো তিনি পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন সেই খ্যাতির হাতছানি থেকে, কিংবা কোনও ব্যক্তিগত ক্ষত তাঁকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। কারণ যা-ই হোক না কেন, ১৯৮৮ সালে জাসমিন ধুন্না এমন এক মুখ হয়ে উঠেছিলেন যা সবাই দেখতে চেয়েছিল—আর পরবর্তী চার দশক ধরে তিনি নিশ্চিত করেছেন যেন কেউ তাঁকে আর খুঁজে না পায়।