কয়েকদিন আগে বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষের নেতৃত্বে 'পারফর্মার্স অফ বেঙ্গল' গঠিত হয়েছে৷ বাংলার অনেক শিল্পীরা সেদিন উপস্থিত ছিলেন৷ রাঘব চট্টোপাধ্যায় তাঁদের মধ্যে অন্যতম৷ পূর্বতন সরকারের আমলে সঙ্গীতজগতে কী কী সমস্যা হয়েছিল এবং 'পারফর্মার্স অফ বেঙ্গল'-এর আগামী পদক্ষেপ কী? এই বিষয় জানতে আজকাল ডট ইন যোগাযোগ করেছিল সঙ্গীতশিল্পীর সঙ্গে।
রাঘব বলেন, "একটা সময় ছিল আমার এফ এম-এ সারাদিন বাংলা গান বাজত৷ ওদের মতো করে বাংলা গানের প্রচার আর কেউ করেনি৷ অথচ কোম্পানিটা অস্ট্রেলিয়ার, একটা অস্ট্রেলিয়ার সংস্থা কলকাতার নতুন বাংলা গানের প্রচার কতে গিয়েছে৷ ওরা কিন্তু মুনাফার কথা ভাবেনি৷ সিনেমার গান বাজানো হয়, কারণ প্রযোজক টাকা দেয়৷ কিন্তু বাংলা অরিজিনাল গান বা বাংলা নন ফিল্ম অ্যালবামের ক্ষেত্রে টাকা না দিলে যদি গান না বাজে এটা কী করে হয়৷ মহারাষ্ট্র বা সাউথে তো এরকম হয় না৷ হাতে গোনা দু-তিনটে চ্যানেল তবুও আমাদের গান বাজায়, আমরা যাঁরা বহুদিন গান বাজনা করছি তাদের গানই বাজায়৷ নতুনদের গান বাজায় না৷ বাকিরাও তো কিছুই বাজায় না।"
এফ এম চ্যানেলগুলির বক্তব্য ছিল বাংলা অরিজিনাল গানের ব্যবসা হচ্ছে না তাই বাজানো হচ্ছে না। রাঘব বলেন, " ২০১৭-১৮ সালে সমীক্ষা করেছিলাম, নতুন অরিজিনাল বাংলা গানের প্লেলিস্টের পার্সেন্টেজ হচ্ছে পয়েন্ট জিরো টু (০.০২%)। তারও আগে থেকে গান বাজানো কমিয়ে দেওয়া হয়েছে৷"
গান বাজানো ছাড়া আরও অনেক সমস্যা প্রকাশ্যে এসেছে৷ সেই সমস্ত সমস্যা কি রাঘব চট্টোপাধ্যায়ের ক্ষেত্রে হয়েছিল? আজকাল ডট ইন এর প্রশ্নে রাঘব বলেন, "কাটমানির যে অভিযোগ উঠছে কিছু মানুষের বিরুদ্ধে, আমার তেমন অভিজ্ঞতা হয়নি কখনও৷ আমাকে কেউ ১০ টাকা নিয়ে বলেনি যে ৭ টাকা তুমি নিয়ে ৩ টাকা আমাকে ফেরত দাও৷ সরকারি অনুষ্ঠানে সময় থাকলে সুযোগ থাকলে ডেট ম্যাচ করলে গান গাইতে যেতাম৷ অস্বীকার করব না, কিছু সম্মানও পেয়েছি৷ কিন্তু বেশ কিছু নতুন শিল্পী বঞ্চিত হয়েছেন। একটা পরিধির মধ্যে থাকা লোকজনকেই ডাকা হত৷ দুটো অনুষ্ঠানে আমি গান করলে অন্য দুটো অনুষ্ঠানে আমার সহকর্মীরা গাইবেন এটাই হওয়া উচিত। মাসে ১০ টা সরকারি অনুষ্ঠান হবে ১০ টা জেলায়, সব অনুষ্ঠানেই আমি গাইতে যাব, আমি উপার্জন করব এটা হওয়া উচিত নয়৷ আমার কাছে সততা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সকলে আনন্দ করে গান গাইবেন, উপার্জন করবেন এই সমবণ্টন প্রয়োজন।"
রাঘব আরও বলেন,"পাড়ায় পাড়ায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও কমে গিয়েছে। সরকারি অনুষ্ঠানে শিল্পীদের ন্যূনতম অর্থে গাওয়ানো হত৷ কোনও একটা শ্রদ্ধাঞ্জলি অনুষ্ঠান বা কোনও একটা বিশেষ শিল্পীর স্মরণে যে সরকারি অনুষ্ঠান করা হত, সেই সব অনুষ্ঠানে যে শিল্পীদের ডাকা হত সেখানে সম্মান ছিল। কিন্তু কলকাতা বর্ধমান শিলিগুড়ি যেখানেই অনুষ্ঠান হোক একটা গোষ্ঠীর শিল্পীদেরই ডাকা হত৷ সেই শিল্পীদের যে পারিশ্রমিক দেওয়ার কথা তার ১০% দেওয়া হত না। এটা আমার অত্যন্ত খারাপ লাগত৷ আমি বলেওছিলাম যে এই পারিশ্রমিক কি আমাদের প্রাপ্য? সেখানে একটা চাপ থাকত যে গাইতেই হবে অমুক মন্ত্রী বলেছেন। এগুলো আমরা সব শিল্পীই কমবেশি শুনেছি৷"
অ্যাপস নিয়ে অভিযোগ উঠেছে৷ রাঘব বলেন, "বছর দুই আগে সম্মানার্থে একটা সদস্যপদ আমাকে দেওয়া হয়েছিল কিন্তু আমি অ্যাপস-এর কেউ নই৷ নথিপত্রও কিছু নেই৷ কিচ্ছু জানি না। এক আধবার হয়তো গিয়ে একটা গান গেয়েছি৷ এর বাইরে কোনও যোগাযোগ নেই৷"
'পারফর্মার্স অফ বেঙ্গল' গঠনের পর রুদ্রনীল জানিয়েছিলেন, সঙ্গীতশিল্পী এবং যন্ত্রশিল্পীদের সমস্যা এবং পরিকল্পনা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে জানানোর জন্য তিনি একটা মাধ্যম৷ বার্তাবহ হিসাবে কাজ করবেন৷ আগামী পদক্ষেপ কী হবে? রাঘব বলেন, "অনিন্দ্য, প্রবীর, সিধু, দেব চৌধুরী আরও যাঁরা আছেন ওঁদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে৷ তবে অনুষ্ঠানের বিষয় জানিয়েছি। বাংলায় এতগুলো এফ এম চ্যানেল, এতগুলো সংস্থা ব্যবসা করছে কিন্তু সেখানে বাংলা গানের কোনও জায়গা নেই, কোনও সম্মান নেই এটা আমাদের অত্যন্ত খারাপ লাগার জায়গা৷ এই বিষয় যদি কিছু করা যায়৷ আমরা বলেছি যদি সম্ভব হয় আকাশবাণী যেমন কেন্দ্র সরকারের অধীনে থাকা একটা সংস্থা, সেখানে যদি সারাদিনে অন্তত দুই ঘণ্টার একটা স্লট থাকে যেখানে নতুন বাংলা অরিজিনাল গান বাজানো হবে৷ একটা নতুন চ্যানেল যদি করা যায় যেখানে শুধু বাংলা আধুনিক গান, বাংলা নন ফিল্ম অরিজিনাল গান, রবীন্দ্রনাথের গান, কলকাতার শিল্পীদের নতুন গান, এককথায় বাংলা ভাল গান শোনানো হয়, যে কাজটা আমার এফ এম করেছিল৷ তাঁরা এত ভাল ভাবে গানগুলো শুনিয়েছিল যে কত গান মানুষের কাছে পৌঁছেছিল শুধু নয়, তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিল৷ সেইরকম একটা এফ এম চ্যানেল যদি তৈরি করা যায়, তাহলে আমাদের সকলের খুব ভাল হয়৷"
শহর ব্যান্ডের অনিন্দ্য বসু বলেন, "পারফমার্স অফ বেঙ্গল' এর সাংবাদিক বৈঠক প্রথম সিঁড়ি৷ আমাদের বিশ্বাস রুদ্র একজন শিল্পী হিসাবে আমাদের সমস্যাটা বুঝবে৷ ও দীর্ঘদিন স্রোতের বিপরীতে লড়াই করেছে৷ রুদ্রর মাধ্যমে মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে, সরকারের কাছে বার্তাটা পৌঁছে দিতে চাই। পশ্চিমবঙ্গ সরকার যেন নতুন পুরনো সমস্ত শিল্পীদের জন্য শিল্পের উন্নতির জন্য কাজ করেন৷ এই ফোরামটা কারও কুৎসা করার জন্য নয়৷ ভাল গান কীভাবে হতে পারে, আগামী দিনে নতুন প্রজন্মের জন্য কী করা যেতে পারে, তাদের যেন আমাদের মতো স্ট্রাগল না করতে হয়, সাবস্ক্রাইব করার জন্য, গান শোনানোর জন্য প্লিস আমার গানটা শুনুন এভাবে যেন না করতে হয় সেটাই চাই৷ পশ্চিমবঙ্গে বাংলা গানের জন্য একটা এফএম চ্যানেল দরকার৷ প্রযুক্তির মাধ্যমে এখন গোটা পৃথিবীকে সেই গান শোনানো যেতে পারে৷ আধুনিক বাংলা গানের অসম্ভব ভাল লেগ্যাসি আছে৷ আজকে কেন একজন শিল্পীকে বারবার বলতে হবে প্লিস আমাকে সাবস্ক্রাইব করুন, কেন গুণী মানুষদের গান শোনানোর জন্য বাংলায় কোনও মাধ্যম থাকবে না৷ এই গানের উত্তরাধিকার যেন হারিয়ে না যায়৷ সুরকার গীতকারের নাম জানছে না মানুষ৷ এভাবে তো সঙ্গীতের ইতিহাস ঘেঁটে যাচ্ছে৷ এরপর আশা করছি আলোচনার মাধ্যমে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করা হবে৷"















