ওয়েটিং ফর গডো। স্যামুয়েল বেকেটের বিশ্বখ্যাত নাটক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী অস্থির পৃথিবীতে লেখা এই অ্যাবসার্ডধর্মী নাটক আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। ধর্ম, দর্শন, সমাজ, মনোবিশ্লেষণ এমনকী জীবনের অর্থহীনতা ও অস্তিত্বের সংকট, একাধিক স্তরে প্রশ্ন তোলে এই নাটক। হালকা চোখে দেখলে এটি হাস্যকর, উদ্দেশ্যহীন আচরণ আর কথাবার্তার সমাহার। কিন্তু সময় যত গড়ায়, ততই স্পষ্ট হয়ে ওঠে এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা তীব্র, অস্বস্তিকর অভিঘাত। জনপ্রিয়তার নিরিখে ‘ওয়েটিং ফর গডো’-র প্রতিদ্বন্দ্বী সত্যিই হাতে গোনা।

 

নাটকের কেন্দ্রে রয়েছে দুটি চরিত্র -ভ্লাদিমির ও এস্ট্রাগন। তারা দিনের পর দিন অপেক্ষা করে গডো নামের এক অদৃশ্য মানুষের জন্য। তাদের বিশ্বাস, গডো এলেই মিলবে মুক্তির পথ। অপেক্ষার ফাঁকে চলে কথোপকথন, দার্শনিক তর্ক-বিতর্ক। পথে আসে পোজ্জো ও তার ভৃত্য লাকি। রয়েছে এক ছোট্ট ছেলে, যে নিজেকে পরিচয় দেয় গডো-র ভৃত্য হিসেবে। কিন্তু প্রশ্ন একটাই শেষপর্যন্ত কি গডোর সঙ্গে দেখা হয় ভ্লাদিমির কিংবা এস্ট্রাগনের? সেই উত্তর নাটকের শেষেই, নিঃশব্দে রেখে যান বেকেট।এক কথায়, জনপ্রিয়তার দিক থেকে এ নাটকের প্রতিদ্বন্দ্বী মেলা ভার।

 

এই বিশ্বখ্যাত নাটককেই বাংলায় রূপান্তর করেছেন বিশিষ্ট নাট্যকার ও পরিচালক অশোক মুখোপাধ্যায়। নাম দিয়েছেন, ‘গদাইবাবু আসছেন’। ভ্লাদিমির হয়ে গিয়েছেন ভোলা, এস্ট্রাগন হয়েছেন আশু। পোজ্জো বদলে পুজো, আর লাকি রূপান্তরিত হয়েছেন লুকা-য়। আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি, শনিবার সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টা নাগাদ এই নাটক মঞ্চস্থ হবে গিরিশ মঞ্চে।

‘গদাইবাবু আসছেন’-এর পরিচালক অশোক মুখোপাধ্যায় জানালেন, এই নাটককে কোনও সেরিব্রাল এক্সারসাইজ হিসেবে তিনি দেখছেন না। সেভাবে ট্রিট ও করছেন না। এটা একেবারে রং-তামাশা-মজায় ভরা একটি ভরপুর নাটক। বলা ভাল রঙ্গনাট্য। মজা করেই গোটা বিষয়টি দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। লক্ষণীয়, নাটকে যে দু'টি ভবঘুরের কিচ্ছু নেই...তাদের সেই দুঃখটাকে কিন্তু তারা দুঃখ দিয়ে উদযাপন করে না। আনন্দ দিয়ে করে যেমনটা চার্লি চ্যাপলিন করেছেন, রাজ কাপুর করেছেন। আশা করি, এই নাটকটি দেখার পর লোকে আর বেকেট-বেকেট চিৎকার করবে না, এটা বাংলা নাটক হিসেবেই দর্শক মনে রাখবে।  

‘ওয়েটিং ফর গডো’-র ‘ভ্লাদিমির’ অর্থাৎ ‘ভোলা’ হিসেবে এই নাটকে রয়েছেন গৌতম হালদার। বিখ্যাত এই অভিনেতা স্পষ্ট কথায় বললেন, “এরকম একটি নাটকের বাংলা রূপান্তরে অভিনয় করার সুযোগ পাওয়া নিঃসন্দেহে বড় ব্যাপার। তার উপর পরিচালক যখন অশোক মুখোপাধ্যায়। তাই ভয় ও আনন্দ দু'টোই হয়। যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি।” পাশাপাশি তিনি এও জানালেন, তরুণ প্রজন্মের কাছে এই নাটক কতটা গৃহীত হবে, তা এখনই তিনি বলতে অপারগ। "তবে হ্যাঁ, এই নাটক তো বাজারি কমার্শিয়াল নয়। ভীষণ গভীর...চটজলদি চটক নয়। তাই এই দিশাহীন সময়ে এই নাটক জীবন সম্পর্কিত কিছু গভীর প্রশ্ন তুলছে। সেই প্রশ্নগুলো যদি তরুণ দর্শকদের ভাবায়, সেটাই আমাদের কাছে অনেক" মন্তব্য তাঁর। 

">

লোকনাথ দে রয়েছেন এই নাটকে ‘আশু’-র ভূমিকায়। তাঁর মতে, “এই নাটক বেশ কিছু প্রশ্ন তোলে যা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ বলেই আমার মনে হয়। কেন আছি এই পৃথিবীতে? কী করতে আছি? যে পরিস্থিতির মধ্যে আমরা আছি সেখান থেকে উদ্ধার পাব কি না? বেঁচে থাকার থেকে কি কোনও উত্তরণ হবে আমাদের? এগুলো তো সবসময়ের কথা। স্রেফ এখনকার কথা নয়! এটা ছাড়াও একজন অভিনেতা হিসেবে মঞ্চে তো এমন নাটকে পারফর্ম করার স্বপ্ন দেখি আমরা যা ভাববে, সমাজের কথা বলবে, জীবনের কথা বলবে। সবসময় হয়তো সেই সুযোগ আসে না। এই নাটকের ক্ষেত্রে কিন্তু আমার কাছে সেই সুযোগ এসেছে।"

 

অভিনেতার কাছে প্রশ্ন ছিল - এই নাটকে ‘কিছু না হওয়ায়’ সবচেয়ে বড় ঘটনা। সেখানে একজন অভিনেতা হিসেবে এই ‘নন-অ্যাকটিং’ মঞ্চে ধরে রাখা কতটা চ্যালেঞ্জের? স্মিত হেসে জবাব এল, “হ্যাঁ, এটা ঠিকই। খানিক কঠিন তো বটেই। কিন্তু এত বছর ধরে যেহেতু রেওয়াজের মধ্যে আছি,বাস্তবসম্মত অভিনয় ব্যাপারটা খুব একটা সমস্যার হয় না। আর এর পাশাপাশি গৌতম হালদারের মধ্যে একজন এত বড় মাপের সহ-অভিনেতা পাশে থাকলে কাজটা আরও সহজ হয়ে যায় একজন পারফর্মারের পক্ষে। আর সবার উপরে পরিচালক তো রয়েইছেন।”