অভিনয় করার পাশাপাশি পরিচালনাতেও হাত পাকাচ্ছিলেন উজান গঙ্গোপাধ্যায়। এক সময় বাবা তথা জনপ্রিয় পরিচালক-অভিনেতা কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘নগর কীর্তন’ ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসাবে কাজ করেছেন উজান। এবার অভিনয়ের পর পরিচালনায় হাত রেখেছেন উজান গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর ছবির নাম ‘কাতুকুতু বুড়ো’। আগেই জানা গিয়েছিল এই ছবিতে, প্রধান চরিত্রে দেখা যাবে কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়-চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়ের একমাত্র অভিনেতা-পরিচালক পুত্রকেই। এবং তাঁর বিপরীতে অভিনেত্রী হিসেবে প্রথমবার পর্দায় দেখা যাবে গায়িকা রাপূর্ণা ভট্টাচার্য-কে। এছাড়াও ছবিতে গুরুত্বপূর্ণ সব চরিত্রে রয়েছেন শঙ্কর চক্রবর্তী, ভাস্বর চট্টোপাধ্যায় এবং বিশ্বনাথ বসু, বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী-কে। আছেন রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ও। 

প্রথমবার এই ছবির নাম শুনলে যে কেউ ভেবে নিতে পারেন, এটি হয়তো কৌতুকে মোড়া, ঝকঝকে এক প্রেমের ছবি। আর এমনটাই প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছিল। কিন্তু আজকাল ডট ইন জানতে পেরেছে, ছবির ভিতরের সত্যি ছবির নামের মতো নিরীহ নয়, বরং ভয়ংকরভাবে বাস্তব।

‘কাতুকুতু বুড়ো’-র কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সমাজের এমন এক অন্ধকার অধ্যায়, যা বছরের পর বছর ধরে চাপা পড়ে এসেছে -শিশুদের প্রতি যৌন হেনস্থা। এই ছবি শুধু একটি ঘটনার কথা বলে না, বলে তার পরবর্তী দীর্ঘ ছায়ার কথা। বলে, একটি শিশুর উপর ঘটে যাওয়া সেই মুহূর্তের আঘাত কীভাবে তার পুরো জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে।

ছবিতে প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন স্বয়ং উজান। তাঁর চরিত্রের নাম ‘কেদার’। ছোটবেলায় যৌন হেনস্থার শিকার হওয়ার পর মানুষের স্পর্শের প্রতি এক গভীর আতঙ্ক জন্ম নেয় তার মনে। সেই ভয় সময়ের সঙ্গে কমে না। বরং স্কুল, কলেজ পেরিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনেও ক্রমশ গ্রাস করে তাকে। স্পর্শ মানেই আতঙ্ক, ঘনিষ্ঠতা মানেই শ্বাসরুদ্ধতা।কিন্তু ‘কাতুকুতু বুড়ো’ শুধুই যন্ত্রণার গল্প নয়। এই ছবি সেই প্রশ্নও তোলে ভুক্তভোগী কি সারাজীবন নীরব থাকবে না কি একদিন ভয়কে জয় করে প্রতিবাদের ভাষা শিখবে?

কেদারের সেই উত্তরণের পথই ছবির মূল চালিকাশক্তি। কীভাবে সে নিজের ভয় কাটিয়ে ওঠে এবং তার মতো অসংখ্য শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলতে শেখায়, সেই গল্পই বলবে এই ছবি।

ছবির নাম ‘কাতুকুতু বুড়ো’ কেন? সূত্রের খবর, কেদারের উপর যৌন হেনস্থার সময় আশপাশে আবৃত্তি হচ্ছিল সুকুমার রায়ের সেই বিখ্যাত ছড়া -‘কাতুকুতু বুড়ো’। অর্থাৎ, যে ‘কাতুকুতু’ সাধারণত শিশুর হাসির প্রতীক, সেই স্পর্শই কীভাবে ভয়ংকর অভিজ্ঞতায় পরিণত হতে পারে, সেই নির্মম বৈপরীত্যকেই নামের মধ্যে বেঁধে ফেলেছেন নির্মাতা।

এই ছবিতে কেদারের প্রতিবেশীর চরিত্রে রয়েছেন শঙ্কর চক্রবর্তী। ছোটবেলা থেকে কেদার যাকে ‘জেঠু’ বলে ডাকে। সেই চরিত্রই জানত কেদারের উপর হওয়া নির্যাতনের কথা। কিন্তু জেনেও চুপ করে থাকে। অস্বীকার করে। এখানেই ‘কাতুকুতু বুড়ো’ শুধু ব্যক্তিগত ট্রমার গল্প হয়ে থাকে না। এটি হয়ে ওঠে সমাজের নীরব অপরাধের দলিল।

ছবির আরেকটি বড় চমক ভাস্বর চট্টোপাধ্যায়। সূত্রের দাবি, এমন ভয়ংকর নেতিবাচক চরিত্রে তাঁকে আগে কখনও দেখা যায়নি। এমন একটি চরিত্র, যা দেখে দর্শকের শিউরে ওঠাই স্বাভাবিক। এই রূপান্তরই নাকি ছবির অন্যতম বড় ‘শক ভ্যালু’। গায়িকা রাপূর্ণা ভট্টাচার্য এই ছবির মাধ্যমে প্রথমবার অভিনয়ে পা রাখছেন। এছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন বিশ্বনাথ বসু, বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী, রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ একাধিক পরিচিত মুখ।এই মুহূর্তে জোরকদমে চলছে ‘কাতুকুতু বুড়ো’-র ডাবিংয়ের কাজ। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়েই বড়পর্দায় মুক্তি পাবে উজান গঙ্গোপাধ্যায়ের এই ছবি।

‘কাতুকুতু বুড়ো’ এমন একটি ছবি, যা দর্শককে আরাম দিতে আসছে না। বরং চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে চাইছে, আমরা কীভাবে বছরের পর বছর ধরে শিশুদের কষ্টকে হাসির আড়ালে ঢেকে রেখেছি।

এই ছবি প্রশ্ন তুলবে। অস্বস্তি তৈরি করবে। এবং হয়তো, সেই অস্বস্তির মধ্য দিয়েই শুরু হবে প্রয়োজনীয় কথোপকথন।