চলচ্চিত্র তৈরির ওয়ার্কশপে তিনি যেমন একমেবাদ্বিতীয়ম, তেমনই থিয়েটারের দুনিয়ায় নাট্য নির্দেশক হিসেবে তিনি এক আইকনিক পার্সোনালিটি। একের পর এক মঞ্চসফল নাটক উপহার দিয়ে দর্শকদের মন জয় করেছেন তিনি। এবার ‘অনসম্বল’ নাট্যদলের হাত ধরে নতুন প্রযোজনা নিয়ে আসছেন নাট্যব্যক্তিত্ব সোহাগ সেন । তাঁর নির্দেশনায় আগামী ২৫শে জুন কলকাতার অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এর মঞ্চে মঞ্চস্থ হতে চলেছে তাঁর পরিচালিত নাটক ‘ভীতি’।
জার্মান নাট্যকার বার্টল্ট ব্রেখট -এর বিখ্যাত নাটক 'ফিয়ার অ্যান্ড মিজারি অফ দ্য থার্ড রাইখ' -এর নির্যাস নিয়ে ‘ভীতি’ নাটকটি সৃজন করেছেন সোহাগ সেন। ব্রেখটের সেই আন্তর্জাতিক চলনকে পরিচালক একেবারে আপাদমস্তক বাঙালি জীবনের মোড়কে বঙ্গীয়করণ করেছেন। আজকাল ডট ইন-কে পরিচালক জানান, নাৎসি জার্মানিতে যেসব সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার ইহুদি হত্যায় কোনওভাবেই যুক্ত ছিলেন না, সমর্থনও করতেন না, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আঁচ কীভাবে তাঁদের জীবনকেও ওলটপালট করে দিয়েছিল— সেটাই ছিল ব্রেখটের নাটকের মূল থিম। সোহাগ সেনের কথায়, “এই নাটক আমাদের এই সময়ে দাঁড়িয়েও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সেই গল্প যেন অদ্ভুতভাবে আজকের সমাজের বাস্তবের সঙ্গে মিলে যায়। তাই আমাদের এই চেষ্টা।”

আজকের সমাজে এত প্রতিবাদ, ধর্না, মিটিং, মিছিল— এগুলোতে কি উচ্চবিত্ত সমাজের আদৌ কিছু এসে যায়? নিজেদের আর্থিক নিরাপত্তা আর স্টেটাস ধরে রাখতে তাঁরা কি প্রতিবাদের স্বর থেকে গা বাঁচিয়ে চলেন? ‘ভীতি’ দর্শকদের ঠিক এই অস্বস্তিকর প্রশ্নটার মুখোমুখি দাঁড় করাবে।
পরিচালক স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই নাটক রাজনীতি থেকে পালিয়ে বাঁচে না, আবার সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র হয়েও কথা বলে না। তবে মোটা দাগে না হলেও, সূক্ষ্ম অথচ তীব্র এক সামাজিক ও রাজনৈতিক বার্তা লুকিয়ে আছে এর পরতে পরতে। যা দর্শককে ভাবাবে, ভয় পাওয়াবে এবং সেই ভয় থেকে উত্তরণের পথও দেখাবে।

নাটকের গল্পটি আবর্তিত হয়েছে দুটি উচ্চবিত্ত পরিবারকে কেন্দ্র করে। দিনশেষে মদ্যপান, নৈশভোজ আর আড্ডায় মেতে ওঠে তারা। সমাজের রসাতলে যাওয়া নিয়ে ড্রইংরুমে বসে তাঁরা চিন্তিত হলেও, তা থেকে সমাজকে বাঁচানোর কোনো তাগিদ তাঁদের নেই। কারণ, সেই সমস্যার আঁচ তখনও তাঁদের গায়ে লাগেনি।
প্রথম পরিবার: রণ (অর্থনীতির অধ্যাপক) এবং শর্মিষ্ঠা। দুজনেই আর্থিকভাবে দারুণ প্রতিষ্ঠিত। তাঁদের এক ছেলে— অন্তু।
দ্বিতীয় পরিবার: দিব্য (উচ্চপদস্থ সরকারি আমলা) এবং আরফিন (সমাজসেবিকা)। দিব্য মাত্র তিন বছরের কাজের অভিজ্ঞতায় সরকারের তরফ থেকে বিদেশ ভ্রমণের অফার পেয়েছে। কিন্তু সামাজিক প্রতিবাদ ও ধর্না ধীরে ধীরে দুজনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে।
এরপরই এই দুই পরিবারের শান্তি ঘেরা সাজানো ড্রইংরুমে ধীর পায়ে উঁকি মারতে থাকে এক অদৃশ্য ভয়ের ছায়া! তারপর কী ঘটে? সেই উত্তর মঞ্চের জন্যই তুলে রেখেছেন পরিচালক। তবে ওঁর দৃপ্ত দাবি, “এই নাটক আমাদের সামনে আয়না ধরবে। দর্শকেরা অনেকেই রণ, শর্মিষ্ঠা, দিব্য বা আরফিনের মধ্যে নিজেদের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাবেন।”
নাটকে ‘রণ’-র চরিত্রে অভিনয় করছেন সুজয়প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, ‘শর্মিষ্ঠা’র চরিত্রে সুতপা ঘোষ এবং তাঁদের ছেলে ‘অন্তু’-র চরিত্রে রয়েছেন বিশাল চক্রবর্তী। অন্যদিকে, ‘দিব্যে’র চরিত্রে মঞ্চ কাঁপাবেন কৌশিক বোস এবং ‘আরফিন’-এর চরিত্রে দেখা যাবে সোমা মুখোপাধ্যায়কে।















