বিগত কয়েকদিন ধরেই একের পর এক শিল্পী ইন্দ্রনীল সেন এবং শিবাজী চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ এনেছেন। কেউ এনেছেন সরকারি অনুষ্ঠানে গান না গাইতে দেওয়ার অভিযোগ, কেউ তুলেছেন কাটমানি নেওয়া বা নেক্সাস চালানোর দাবি। এই সমস্ত বিষয়ে অ্যাপস সংগঠনের অন্যতম ফাউন্ডিং মেম্বার সৈকত মিত্র আজকাল ডট ইনকে কী বললেন?
অ্যাপসের পথচলা শুরুর প্রসঙ্গে সৈকত মিত্র এদিন বলেন, "অ্যাপস শুরু হয়েছিল ১৯৯৩ সালের মার্চ মাসে। তার প্রেক্ষিত কী ছিল? ওই সময় শহরাঞ্চলের একটু বাইরে গেলেই বাংলা গান করাটাই খুব কঠিন ছিল। মানে ৯০-এর গোড়ার দিকের কথা বলছি। গিল্ড করতে হবে, আমাদের মাথায় এটা ঢোকান মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। আমি আর শিবাজীদা ওঁর বাড়ি গিয়েছিলাম। সেই সময়ই উনি বলেন, 'বাংলা গান শুনবে না মানে? একটা গিল্ড কর।' সেই গিল্ড কী করে করব সেটা ভাবতে ভাবতে দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, প্রমুখের কাছে যাওয়া হয়। তারপর ৩৭ জন শিল্পীকে নিয়ে এটা শুরু হয়। এরপর আস্তে আস্তে সংগঠন বাড়ে। যে কোনও সংগঠন যখন ৩৭ জন দিয়ে শুরু করে বাড়তে বাড়তে ৪০০-৪৫০ জনে পৌঁছে যায় তখন তার মধ্যে বেশ কিছু মতানৈক্য থাকবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু মূল বিষয়টা সংগঠনের বিষয় নিয়ে নয়। আসল কথাটা যাঁদের ক্ষোভ রয়েছে তাঁদের নিয়ে। তাঁদের নিয়ে কথা বলেছি, কিন্তু খুব একটা সুফল পাচ্ছি না।"
ইন্দ্রনীল সেন বা শিবাজী চট্টোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে যে কাটমানি বা টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠছে সেই প্রসঙ্গে সৈকত মিত্র এদিন বলেন, "এরকম কোনও ঘটনা আমার জানা নেই। কাটমানি নেওয়া, টাকা ফেরত দিতে হবে, অমুক তমুক, এসব ব্যাপার আমার নিজের অন্তত জানা নেই। যদি তাঁরা ভুক্তভুগী হয়ে থাকেন, ঘটনাটা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তবে সেটা অত্যন্ত অনুচিত কাজ। কিন্তু আমি এসব জানি না। কাদের সঙ্গে হয়েছে সেটাও জানি না। কিন্তু আমার মনে হয় না এই ধরনের কিছু হয়েছে। অ্যাপসের তরফ থেকে কখনই হয়নি।"
সঙ্গীতমেলা নিয়েও উঠছে একের পর এক অভিযোগ। এই বিষয়ে বিস্তারে তিনি বলেন, "সংগঠনের তরফে আমরা একটি চ্যালেঞ্জ নিয়ে শুরু করি সঙ্গীতমেলা, যে বাংলা গানই শোনাব। ৭ দিন ধরে বাংলা গান কেন শুনবে না লোকে। বামফ্রন্ট আমলে ১৯৯৫ সালে শুরু হয়। সরকার বলেছিল টাকাপয়সা কিছু দিতে পারবে না। আমরা বলেছিলাম, লাগবে না, খালি যে তিনটে হল আমরা বেছেছিলাম, সেগুলো যদি বিনামূল্যে পাওয়া যায় ভাল হয়। বাকিটা আমরা করে নেব। সেই থেকে শুরু হয়। ১৯৯৭-৯৮ সাল থেকে সরকার এটার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়তে শুরু করে। কিন্তু বামফ্রন্ট আমলে আমরা শিল্পীরা এতটাই এক জোট ছিলাম যে, বহুবার এমন হয়েছে যে সরকারের সঙ্গে আমাদের বিরোধ হয়েছে নানা ব্যাপারে, আমাদের তখন একটা বলার জায়গা ছিল। আমাদের সংগঠনের তরফে ফেব্রুয়ারির শেষ থেকেই সিনিয়রদের ফোন করা শুরু করতাম যে কবে কাকে, কীভাবে, কোন হলে দেওয়া হবে। সিনিয়র, জুনিয়র, উভয়কেই। আমরাই ফোন করতাম, কোনও অফিসার ফোন করছেন, এই জিনিসটা ছিল না। এই জিনিসটা কালক্রমে আস্তে আস্তে হতে শুরু করে। তাতেও কিন্তু আমাদের একটা জায়গা ছিল। কিন্তু একটা সময় এমন এল যখন এটা একেবারেই সরকারি মেলা হয়ে গেল, সরকারের তরফে পুরোটা করা হচ্ছে। ২০১৩-১৪ সাল থেকে এটা শুরু হল। সরকার বদল হওয়ার পর প্রথম বছর আমি অনেকটা দায়িত্ব নিয়েছিলাম। প্রথমবার ওপেনিং হয় ইনডোর স্টেডিয়ামে। আমিই প্রস্তাব দিই সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে দিয়ে যদি ওপেনিং সং গাওয়ানো যায়। তাই নিয়েও অনেক কিছু হয়। তারপর থেকে আস্তে আস্তে ব্যাপারটা বদলাল। ২০১৪ সালের পর থেকে যখন নবান্নে মিটিং হতে শুরু করল, আমাকে তখন ডাকা হয়নি। যোগাযোগ কমে যায় আমার। পুরোপুরি সরকারি অনুষ্ঠান হয়ে যায়। এবং সরকারি দফতরের যাঁরা তাঁরাই শিল্পীদের ফোন করতেন।" একই সঙ্গে ইন্দ্রনীল সেনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, "ইন্দ্রনীলকে আমি অনেক ছোট থেকে জানি। কাজেই, এই জিনিসটা আমার খুব একটা ঠিক বলে মনে হচ্ছে না। যদি হয়ে থাকে, সেটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। তবে, একটা জিনিস হয়েছিল যেটা নিয়ে আমি বারবার বিরোধ করেছি সেটা হল ছোট একটা গোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল। আমি সবসময় বলেছি, কেন এই শিল্পীরাই সব জায়গায় গান করছেন? অ্যাপসের জেনারেল মিটিংয়ে এই নিয়ে অনেকে বিক্ষুব্ধ হয়েছেন। আমি তখন ইন্দ্রনীলকে বারবার বলেছি, এটা কেন হচ্ছে, সেটা দেখ। কিছুই হয়নি, উল্টে আমি প্রতিবাদ করায়, আমি বহু জায়গা থেকে বাদ পড়ে গিয়েছি।"
এমনকী সৈকত মিত্র অ্যাপসে সিসিটিভি লাগালে তাঁকে বিদ্রুপ করা হয় বলেও জানান। এই বিষয়গুলো ছাড়াও অ্যাপসের আরও একটি বিষয়ে তিনি আপতি জানিয়েছিলেন বলেই এদিন জানালেন সৈকত মিত্র। তাঁর কথায়, "এছাড়া একটা বিষয় হয়েছিল, যেটা আমি বিরোধ করেছিলাম। একটা কথা উঠেছিল যে মিউজিক ক্লাব মতো হোক, তাতে ২৫-৪০ জন থাক। এতজনকে নিয়ে ভাবার দরকার নেই। আমি তাতে বলেছিলাম এতে আমার একদম সায় নেই। শেষ পর্যন্ত সেটাই হয়েছে। আমি যখন বলেছি কেন এসব হচ্ছে, লোকের চোখে লাগছে, তখন বলেছে তুই বাদ যাবি। আমি বলেছি তাতে, দে বাদ। নাম বলতে চাই না কারও। ২৫ বৈশাখের অনুষ্ঠানে আমি যখন বলেছি শ্রীকান্ত, শ্রাবণীকে কেন বলা হচ্ছে না, সেটা নিয়ে আমার সঙ্গে বিরোধ হয়েছে। এগুলো হয়েছে, কিন্তু সেগুলো ভিতরে ভিতরে ছিল। কিন্তু সেটা হওয়াটা উচিত হয়নি। ভিতর ভিতর ছিল বিক্ষোভ, সেটা বাইরে আসছে। ক্ষমতা চলে গিয়েছে, স্বাভাবিক ভাবেই সকলে এখন বলছে। কিন্তু আমি ব্যক্তিগত ভাবে বলতে চাই না। এগুলো না হলেও ভাল হতো।"
বর্তমানে রাজ্যে পালাবদল হওয়ার পর অনেকেই মুখ খুলেছেন তাঁদের সঙ্গে হওয়া অন্যায় নিয়ে। ফেসবুকে নিজেদের অভিযোগ জানাচ্ছেন। সেই বিষয়ে সৈকত মিত্র বলেন, "শিল্পীরা নিজেদের জায়গা ধরে রাখার জন্য যতটা সচেষ্ট তার থেকে অনেক বেশি সময় এখন দেওয়া হচ্ছে ফেসবুকে। এটা খুব একটা ঠিক নয়। ফেসবুকে বিক্ষোভ জানালাম, এটা এখন একটা স্টাইল হয়েছে। বামফ্রন্ট আমলে তো সরকারি অনুষ্ঠান তেমন হতো না। তাতে কি আমরা গান করার সুযোগ পাইনি, না গান করিনি? আমাকে অনেক সরকারি অনুষ্ঠান থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রীকে জানিয়েছিলাম কিন্তু কোনও কাজ হয়নি। তাতে কি অনুষ্ঠান না করে থেকেছি?
এটা খানিকটা ঠিক হলেও, পুরোটা সত্যি নাও হতে পারে। কিন্তু ইন্দ্রনীল সেনের দায়িত্ব অনেক বড় ছিল। হয়তো শিবাজী দার থেকে সে সাহায্য নিয়েছে এই ব্যাপারে। এই বিক্ষোভটা শিল্পীদের মধ্যে বিরাট আকারের। আমি আগে বলেছিলাম এটা ঠিক হচ্ছে না। কিন্তু শোনা হয়নি। সেই কারণে আমি নিজে অনেকটা সরে এসেছিলাম।"
সৈকত মিত্র জানান তিনি একবারই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর লেখা গান গেয়েছেন। সেই বিষয়ে তাঁর বক্তব্য, "মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন রেলমন্ত্রী তখন একটা গান গাই, পরে জানতে পারি ওটা তাঁর লেখা গান। কিন্তু যেহেতু গোটা বিষয়টার সামনে শিবদাস দা ছিলেন, আমার ধারণা ছিলেন, গানগুলো লেখা শিবদাস দার। এই একবারই ওঁর লেখা গান আমি গেয়েছিলাম। আর কখনও গাইনি, গাইতে ডাকেনি। এর বাইরে অ্যাপস নিয়ে নানা আলোচনা আমাদের মধ্যে অনেকবার হয়েছে। শিবাজী চট্টোপাধ্যায় একবার অ্যাপস ছেড়ে দুই বছরের জন্য বেরিয়ে গেছিলেন। তাঁর বাড়িতে গিয়ে অনুরোধ জানাতে। পরে আবার যোগ দিয়েছেন। নিজেদের মধ্যে মান অভিমান চলতে থাকে।"















