হাসি-ঠাট্টায় মোড়া অপরাধের গপ্পো। মন কাড়ল কি ‘ভার্জিনপুর’? সিরিজ দেখে লিখছেন পরমা দাশগুপ্ত


শহরের নাম ভার্জিনপুর। সম্পর্ক, ঘনিষ্ঠতা, রাজনীতি বা অপরাধ— এ শহরে কে কীসে ভার্জিন, আগেভাগে বলা মুশকিল। নেতার নাম বোম। তবু তার ছোঁড়া বোমা যে ফাটতে চায় না কিছুতেই! নেতার ছেলের নাম অ্যাটম। এদিকে ক্ষমতার মলিকিউল তার অধরাই থেকে যায়!
হস্টেলের নাম ম্যাডাম নিবাস। ম্যানেজার দেবা-ই সেখানে স্যর! আর মাঝখানে দুইখান ছেলেমেয়ে আর তাদের মিষ্টি একটা প্রেম।

চুম্বকে এটাই ‘ভার্জিনপুর’। যাকে ঘিরে হাল্কা মেজাজের এক ফুরফুরে গল্প বুনেছে ক্লিকের নতুন ওয়েব সিরিজ। হাসি-ঠাট্টা-ফাজলামি, তার হাত ধরে বলে দেওয়া বাস্তবের কিছু কঠিন সত্যি, কালজয়ী রেফারেন্স গোঁজা মজাদার সংলাপ, নেতা, পুলিশ, অপরাধ— সবকিছু মিলেজুলে তাতে খাট্টামিঠা ভেলপুরির স্বাদ। আর তার ঘটনাক্রম? অনেকটা নয়ের দশকে বলিউডি ছবিতে যেমনধারা কাণ্ডকারখানার দেখা মিলত।

গল্পে গ্রাম থেকে এ শহরে ভার্জিনপুর কলেজে পড়তে আসে একেবারে নিরীহ, নিষ্পাপ, শান্তশিষ্ট জিতু (ঋতব্রত মুখার্জি)। এতটাই সে সরল, সাধাসিধে যে মুরগির দোকানি চ্যাং থেকে ম্যাডাম নিবাস মেসের ম্যানেজার তথা দালালির ‘আর্টিস্ট’ দেবা (সত্যম ভট্টাচার্য) কিংবা ঝকঝকে স্মার্ট কন্যে রাই (শার্লি মোদক) কেউই তাকে বোকা বানাতে ছাড়ে না! প্রথম দিনেই জিতু ঝুপ করে ডুব দেয় রাইয়ের প্রেমে। আর কী কাণ্ড! রাইও এমন সহজসরল জিতুর প্রেমে পড়ে যায় নিমেষে! বেশ চলছিল। এ সবের মধ্যেই জিতুর গায়ে অপমানের কাদা ছিটিয়ে যায় অপরাধ জগৎ থেকে রাজনীতির ময়দানে আসা দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা বোমবাবু (বিশ্বজিৎ দাস)। তার প্রতিশোধ নিতে দেবা রাই আর জিতুকে নিয়ে প্ল্যান করে বোমবাবুর ছেলে যুবনেতা অ্যাটমকে (শুভজিৎ কর) অপহরণ করে আনে। তাদের সাহায্য করে এয়ারহোস্টেস হতে চাওয়া মাসাজওয়ালি ঝিন্টি (নিশান্তিকা দাস)। ঘটনার তদন্তে নামে এলাকার ইনস্পেক্টর গরমেন্ট সরকার (দেবপ্রসাদ হালদার)। জিতুর অপমানের বদলা নেওয়া কি সম্ভব হবে শেষমেশ? সর্বক্ষণ মদ্যপানে ডুবে থাকা, ছেড়ে চলে যাওয়া স্ত্রী-মেয়েকে ঘরে ফিরিয়ে আনতে চাওয়া গরমেন্ট পারবে কেসের সমাধান করতে? রাই-জিতুর প্রেমই বা গড়াবে কোনদিকে? পাঁচ পর্বের কাহিনিতে তার উত্তর পেয়ে যাবেন।

অভিনয়ের খাতায় এ সিরিজকে খানিকটা নম্বর দিতেই হয়। ভোলেভালা জিতুকে একদম ঠিক ঠিক মশলায় গড়েছেন ঋতব্রত। সত্যমের বলিষ্ঠতায় কলেজ তথা মেসের ‘দাদা’ দেবাও যাকে বলে নিখুঁত। বন্ধু থেকে প্রেমিকা হয়ে ওঠা রাইকে ভারী মিষ্টি লাগে শার্লির অভিনয়ে। সংলাপ থেকে কমেডি টাইমিংয়ে জমিয়ে দেয় বিশ্বজিতের বোমবাবু কিংবা দেবপ্রসাদের গরমেন্ট সরকারও। অ্যাটমরূপী শুভজিৎ কিংবা ঝিন্টির ভূমিকায় নিশান্তিকাও বেশ।

কিন্তু হাসি-ঠাট্টায় মোড়া গোলমেলে অপরাধের গপ্পে গোলমালটা যে হল অন্য জায়গায়! ভার্জিনপুরে সবই যে বড্ড তাড়াতাড়ি, বড্ড সহজে হয়ে যায়! সে প্রেম হোক বা অপরাধ! কোনটা কেন হচ্ছে, তার একটু-আধটু লজিক থাকাও যে প্রয়োজন। স্রেফ গ্রামের ছেলে বলে রাইয়ের মতো স্মার্ট মেয়ে প্রথম দিনেই কেন জিতুর প্রেমে পড়ে; এত সাধাসিধে, বাবা-মায়ের বাধ্য ছেলে জিতু কী করে এক কথাতেই অপহরণের মতো অপরাধে রাজি হয়ে যায়; অপরাধ জগতের ঘাঁতঘোঁত চেনা এত বুদ্ধিমান অ্যাটমই বা কেন এত সহজে ফাঁদে পা দেয়— সে প্রশ্নগুলোর উত্তর গল্পে থাকা জরুরি ছিল। তারপর ক্লাইম্যাক্সে এসে কোথা থেকে কী হইয়া গেল, সেটাও একটু ভাবার বিষয়।

তবে হ্যাঁ, মজার উপাদান যথেষ্ট আছে সিরিজে। সংলাপে বুদ্ধিমত্তার ছাপ, সত্যি সত্যি হাসি পাওয়ার মতো কিছু মুহূর্ত, স্যাটায়ারের স্বাদ মিলিয়ে গল্পের ফুরফুরে মেজাজটা টিকে থাকে শুরু থেকে শেষ। তার জন্য নিশ্চিতভাবেই পরিচালক শুভদীপ মুখোপাধ্যায়-সহ গোটা টিমের প্রশংসা প্রাপ্য। বাস্তবের দুনিয়াটা আজকাল এতই জটিল, কুটিল আর গাম্ভীর্যে ভরা, সেখানে কিছুক্ষণের জন্য হলেও তো মনটা হাল্কা লাগে। সেটাই এ সিরিজের ইউএসপি হয়ে থাক বরং।