২০২৩ সালে যখন ‘ডঙ্কি’ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিল, তখন দর্শকমহলে প্রত্যাশার পারদ ছিল আকাশছোঁয়া। কারণ, বলিউডের ইতিহাসে প্রথমবার জুটি বেঁধেছিলেন ‘কিং অফ রোম্যান্স’ শাহরুখ খান এবং বলিউডের ‘হিটমেশিন’ পরিচালক রাজকুমার হিরানি। কিন্তু মুক্তির পর বক্স অফিসে সেই চেনা ‘হিরানি ম্যাজিক’ দেখতে পাননি অনেক দর্শকই। বক্স অফিসের সেই আকাশচুম্বী প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল ছবি ছবিটি। আজ দীর্ঘ তিন বছর পর, সেই ছবির বক্স অফিস পারফর্ম্যান্স এবং ব্যর্থতা নিয়ে অবশেষে মুখ খুললেন পরিচালক রাজকুমার হিরানি। ছবিটির আশানুরূপ ফল না হওয়া কি ওঁর মনে কোনও ক্ষত তৈরি করেছিল? স্পষ্ট জানালেন তিনি।সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে রাজকুমার হিরানি ‘ডঙ্কি’র বক্স অফিস কালেকশন এবং দর্শকের মিশ্র প্রতিক্রিয়া নিয়ে অত্যন্ত সততার সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেন।

ছবিটি কেন দর্শকের মন পুরোপুরি ছুঁতে পারল না, তার ব্যাখ্যা দিয়ে রাজকুমার হিরানি বলেন, “প্রতিটি সিনেমা আলাদা আলাদা মানুষের মনকে আলাদাভাবে ছুঁয়ে যায়। আমি যখন ‘৩ ইডিয়টস’  বানিয়েছিলাম, তখন ওঁর বিষয়বস্তু ছিল আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা। এই সমস্যাটি প্রতিটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের ঘরে ঘরে রয়েছে, তাই ছবিটিও দেশের প্রতিটি কোণায় পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু আমি যখন ‘ডঙ্কি’-র মতো একটা সিনেমা বানালাম, ওঁর পরিধিটা কিন্তু শুধুমাত্র সেইসব মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, যাঁরা বেআইনিভাবে বিদেশে অনুপ্রবেশ করার সঙ্গে কোনও না কোনওভাবে যুক্ত।”

হিরানি আরও জানান, ছবি মুক্তির পর তিনি বিদেশ থেকে অজস্র বার্তা পেয়েছিলেন। ওঁর কথায়, “আজও আমি কানাডা বা আমেরিকা থেকে এমন মানুষের মেসেজ পাই, যাঁরা বাস্তবে এই ‘ডঙ্কি রুট’ দিয়ে বিদেশে গেছেন এবং ওঁর ফলে যাঁদের জীবন পুরোপুরি বদলে গেছে। সেখানে বসবাসকারী মানুষেরা আমাকে লিখেছেন— ‘আমরা এখানে রয়েছি ঠিকই, কিন্তু আমরা ভেতরে ভেতরে প্রতিদিন কষ্ট পাচ্ছি। আমরা কেন নিজেদের দেশ ছেড়ে এলাম, ওখানেই আমাদের ভালভাবে কেটে যেত।’ তাই বলাই বাহুল্য, এই সিনেমাটা দেখার বা অনুভব করার মতো মানুষের সংখ্যাটা একটু কম বা সীমিত ছিল।”

চলচ্চিত্র সমালোচক ও দর্শকদের মিশ্র প্রতিক্রিয়ার কথা মাথায় রেখে হিরানি স্বীকার করেন যে, ‘ডঙ্কি’-র মূল ভাবনাটি হয়তো মূলধারার প্রেক্ষাগৃহের দর্শকদের একটা বড় অংশের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে পারেনি। তিনি বুঝিয়ে বলেন, আজকের দিনে সিনেমা হলে আসা দর্শকদের একটা বড় অংশ এমন পরিবার থেকে আসেন, যাঁদের জন্য আন্তর্জাতিক স্তরে যাতায়াত করা বা বৈধ উপায়ে ভিসা পাওয়াটা খুব একটা অসম্ভব লক্ষ্য নয়। কিন্তু এই ছবিতে দেখানো হয়েছিল সমাজ ও অর্থনীতির একেবারে নিচের স্তরে থাকা সেইসব মানুষদের কথা, যাঁদের আর্থিক সামর্থ্য নেই এবং আইনি উপায়ে ভিসা পাওয়ার কোনও সুযোগই নেই। এই চরম ও নির্মম বাস্তবতার সঙ্গে হয়তো মাল্টিপ্লেক্সের অনেক দর্শক নিজেকে মেলাতে পারেননি।

বক্স অফিসে ব্যবসা কম হলেও বা সমালোচকদের একাংশ মুখ ফিরিয়ে নিলেও, ‘ডঙ্কি’ ছবিটিকে কোনোভাবেই নিজের কেরিয়ারের ‘ব্যর্থতা’ বা ‘হতাশা’ বলে মানতে নারাজ রাজকুমার হিরানি। তিনি এখনও এই ছবির গল্প এবং শাহরুখের অভিনয়ের পাশেই দাঁড়িয়েছেন।

হিরানির কথায়, “আমি আজও এই ছবিটির জন্য ভীষণ গর্ব বোধ করি। এটা খুব স্বাভাবিক যে, আপনি যদি কোনও বিষয়ের সঙ্গে নিজেকে মেলাতে না পারেন, তবে সেই সিনেমাটা আপনাকে কম প্রভাবিত করবে। প্রত্যেক পরিচালকের কেরিয়ারেই এমন একটা গ্রাফ থাকে— ওঁর কিছু সিনেমা খুব বড় অংশের মানুষের মন ছোঁয়, আবার কিছু সিনেমা অল্প কিছু মানুষের মন ছুঁয়ে যায়। এটাই স্বাভাবিক।”

প্রসঙ্গত, ‘ডঙ্কি’ ছবিতে শাহরুখ খান ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তাপসী পান্নু, বোমান ইরানি, বিক্রম কোছর এবং অনিল গ্রোভার। এছাড়াও ছবিতে ভিকি কৌশলের একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী ‘স্পেশাল অ্যাপিয়ারেন্স’ দর্শকদের চোখে জল এনে দিয়েছিল।