বাঙালির মননে তিনি চিরকালের ‘জটায়ু’ । লালমোহন গাঙ্গুলি বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে তাঁর সেই চেনা চওড়া হাসি, অমায়িক চাউনি আর হাত-পা নেড়ে সংলাপ বলার অসামান্য কায়দা। তিনি কিংবদন্তি অভিনেতা সন্তোষ দত্ত। বেঁচে থাকলে বর্তমানে ওঁর বয়স হতো ঠিক ১০০ বছর । সত্যজিৎ রায়ের ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এর খ্যাপাটে ‘হাল্লার রাজা’ কিংবা শান্ত ‘শুন্ডির রাজা’— দুই চরিত্রেই তিনি ছিলেন অনবদ্য। তবে ‘সোনার কেল্লা’ ছবিতে ওঁর অভিনয়ের ম্যাজিক এমন ছিল যে, খোদ সত্যজিৎ রায় বইয়ের পাতায় জটায়ুর ইলাস্ট্রেশন বা ছবি আঁকার ধরনটাই পুরোপুরি সন্তোষ দত্তের আদলে বদলে ফেলেছিলেন। সাহিত্যে এমন ঘটনা সত্যিই বিরল।

তবে সিনেমা যাঁদের নেশা, তাঁরা অনেকেই জানেন যে অভিনয় কিন্তু সন্তোষ দত্তের মূল পেশা ছিল না। তিনি ছিলেন কলকাতার এক অত্যন্ত নামী এবং দাপুটে ক্রিমিনাল লয়ার । আদালতে ধারালো যুক্তি আর চোখা চোখা প্রশ্নে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ওঁর জুড়ি মেলা ভার ছিল। কিন্তু সেই গম্ভীর কালো কোট পরা সিরিয়াস আইনজীবীর আড়ালে ওঁর ভেতরে যে এক রসিক ‘লালমোহন বাবু’ লুকিয়ে ছিলেন, ভরা এজলাসে মাঝেমধ্যেই তার প্রমাণ মিলত। অবস্থা এমনও হতো যে ওঁর কাণ্ড দেখে বিচারক থেকে উপস্থিত সবাই হেসে কুটিপাটি হতেন এবং আদালত মুলতুবি পর্যন্ত করতে হতো!

‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ ছবির ‘বিশ্বশ্রী গুণময় বাগচী’ খ্যাত অভিনেতা মলয় রায় এক সাক্ষাৎকারে আইনজীবী সন্তোষ দত্তের ময়দানের সেই অজানা দুই ঐতিহাসিক কীর্তি ফাঁস করেছিলেন।

 

এক সাক্ষাৎকারে মলয় রায়ের স্মৃতিচারণায় উঠে আসে মেদিনীপুর আদালতের এক অদ্ভুত ঘটনার কথা। একটি মামলার শুনানিতে এক সরকারি ডাক্তারকে জেরা করছিলেন আইনজীবী সন্তোষ দত্ত। কাঠগড়ায় দাঁড়ানো ওই সরকারি ডাক্তারবাবু অত্যন্ত চতুর ছিলেন। সন্তোষবাবু ওঁকে যে প্রশ্নই করুন না কেন, ফাঁদ এড়াতে ডাক্তারবাবু ক্রমাগত একই উত্তর দিয়ে যাচ্ছিলেন— “হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে।”বেশ কিছুক্ষণ ধরে এই একই একঘেয়ে উত্তর চলার পর সন্তোষ দত্ত বুঝলেন সোজা আঙুলে ঘি উঠবে না। তিনি আচমকা ওঁর সেই চেনা ‘জটায়ু’র স্টাইলে এক মোক্ষম চাল চাললেন। গম্ভীর মুখে ডাক্তারবাবুকে হঠাৎ প্রশ্ন করে বসলেন— “আচ্ছা, আপনি কি মানুষ?”

অভ্যাসবশত অবচেতন মনে ওই ডাক্তারের মুখ থেকে প্রায় বেরিয়েই আসছিল— “হতেও ...”! কিন্তু অর্ধেক বলেই নিজের ভুল বুঝতে পেরে থতমত খেয়ে জিভ কেটে চুপ করে গেলেন ডাক্তারবাবু। ওঁর এই দশা দেখে জজ সাহেব থেকে শুরু করে আদালতে উপস্থিত জনতা হো হো করে হেসে ওঠেন। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছয় যে হাসির চোটে সেদিনের মতো নাকি কোর্টের কাজই বন্ধ করে দিতে হয়েছিল।

 

সন্তোষ দত্তের বুদ্ধিমত্তা এবং অন্যকে সাহায্য করার উদার মনের আরও একটি গল্প শুনিয়েছিলেন মলয় রায়, যার সঙ্গে জড়িয়ে খোদ মহানায়ক উত্তমকুমার -এর নাম!একবার কলকাতার বিবেকানন্দ রোডের একটি ওষুধের দোকানের সামনে এক বড়সড় গণ্ডগোল ও মারপিটের ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তমকুমারকে আদালতে সাক্ষী হিসেবে হাজিরা দিতে হয়েছিল। মহানায়ক কোর্টে আসবেন শুনেই আদালত চত্বরে তিল ধারণের জায়গা নেই। সাধারণ মানুষের ভিড় সামলাতে পুলিশ ও আদালত কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছিল। সবাই চিন্তিত— কীভাবে উত্তমকুমারকে নিরাপদে ভেতরে আনা হবে?

উত্তমকুমারকে ভিড়ের হাত থেকে বাঁচাতে ত্রাতা হয়ে এগিয়ে এলেন আইনজীবী সন্তোষ দত্ত। তিনিই জজ সাহেবদের এক অভিনব উপায় বাতলালেন।সন্তোষবাবুর পরামর্শেই মহানায়ক উত্তমকুমারকে সাধারণ পথ দিয়ে না এনে, জজ সাহেবরা যে গোপন রাস্তা দিয়ে কোর্টে ঢোকেন ও বেরোন, সেই পথ ব্যবহার করতে দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, ভিড় এড়াতে স্বয়ং জজ সাহেবের খাস চেম্বারেই বসিয়ে রাখা হয়েছিল ‘নায়ক’কে।

তবে গল্পের টুইস্ট এখানেই। নিজে মহানায়ককে বাঁচালেও, সহকর্মী আইনজীবীদের আবদার কিন্তু ভোলেননি সন্তোষবাবু। কালো কোট পরা বাকি আইনজীবীরা যাতে উত্তমকুমারকে অন্তত এক পলক দেখতে পান, তাই সন্তোষবাবু নিজেই জজের চেম্বারে গিয়ে উত্তমকুমারকে বুঝিয়ে রাজি করান। ওঁর অনুরোধে মহানায়ক কিছুক্ষণের জন্য কোর্টের বাইরের লবিতে এসে দাঁড়ান এবং সমস্ত আইনজীবীদের হাত নেড়ে অভিবাদন জানান।

পেশার প্রতি যেমন নিখাদ সততা ও দায়িত্ববোধ ছিল, তেমনই মানুষের আবদার মেটানোর মতো এক বিশাল উদার হৃদয় ছিল এই ‘জটায়ু’র।