‘জসসি জ্যায়সি কোই নহি’-র সেই সহজ-সরল ‘নন্দু’ হোক কিংবা সোশ্যাল মিডিয়ায় ওঁর তৈরি করা আইকনিক ‘চুটকি’ চরিত্র— অভিনেতা গৌরব গেরা বরাবরই ওঁর নিখাদ কমিক টাইমিংয়ের জন্য দর্শকদের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন। তবে সম্প্রতি পরিচালক আদিত্য ধরের নতুন ব্লকবাস্টার ছবি ‘ধুরন্ধর’ -এ ওঁর অভিনয় দক্ষতা দেখে তাজ্জব বনে গেছেন সকলে। ছবিতে করাচি শহরে আন্ডারকভার ইন্টেলিজেন্স অপারেটর ‘মোহাম্মদ আলম’ ওরফে ‘আলম ভাই’-এর সিরিয়াস চরিত্রে ওঁর পারফরম্যান্স চারদিকে তুমুল প্রশংসা কুড়োচ্ছে।
আজ গৌরব গেরা সাফল্যের শিখরে থাকলেও, ওঁর এই সাফল্যের পেছনের পথটা একেবারেই সহজ ছিল না। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে অভিনেতা নিজের পুরনো দিনের হাড়ভাঙা খাটুনি এবং চরম আর্থিক অনটনের দিনগুলো মনে করে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি জানান, মুম্বাইতে স্ট্রাগল করার সময় এমন একটা দিনও গেছে যখন ওঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পড়েছিল মাত্র ৮৪ টাকা!
কোনও গ্ল্যামার বা ফিল্মি ব্যাকগ্রাউন্ড ছাড়াই দিল্লি থেকে মুম্বাই এসেছিলেন গৌরব। বাড়ির কেউ কোনওদিন সিনেমার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। স্কুলে পড়ার সময় বিভিন্ন নাটক ও ক্রিয়েটিভ কম্পিটিশনে অংশ নিতে নিতেই অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা জন্মায়। পড়াশোনায় মাঝারি হলেও শিল্প বা সৃজনশীল বিষয়ে সবসময়ই টপ করতেন তিনি।
মুম্বই আসার পর প্রথম জীবনের সেই চরম অর্থকষ্টের কথা মনে করে গৌরব বলেন, “একটা সময় আমার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে মাত্র ৮৪ টাকা পড়েছিল। আমি যখন রাস্তা দিয়ে যেতাম, সামনে একটা এইচডিএফসি ব্যাঙ্ক পড়ত। আমি প্রতিদিন ওই ব্যাঙ্কের দিকে তাকিয়ে মনে মনে মজা করে বলতাম, ‘আমার একটু খেয়াল রেখো ভাই!’ আমি রাস্তায় যাতায়াতের সময় আক্ষরিক অর্থেই ওই ব্যাঙ্কটাকে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করে যেতাম।”
গৌরব জানান, ওঁর এই কঠিন সময়ে ওঁর মধ্যবিত্ত চাকরিজীবী বাবা নিজের সাধ্যমতো ওঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বাবার পাঠানো সেই দিনগুলোর স্মৃতি হাতড়ে গৌরব বলেন, “বাবা একটা স্যালারিড চাকরি করতেন। ওঁর পাঠানো পুরোনো চিঠিগুলো আজও আমি যত্ন করে রেখে দিয়েছি। সেখানে বাবা লিখতেন— ‘তোকে ২,০০০ টাকা পাঠাচ্ছি, আমার এর থেকে বেশি দেওয়ার সামর্থ্য নেই।’ টাকার অঙ্কটা ছোট হলেও আমার কাছে ওটার গুরুত্ব ছিল আকাশপ্রমাণ।”
এই আর্থিক অভাব অবশ্য গৌরবের জেদ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। যাতায়াতের জন্য অটো বা বাসের ভাড়া না থাকলে তিনি মাইলের পর মাইল হেঁটে অডিশন দিতে যেতেন। গৌরবের কথায়, “তখন ওটাকে কষ্ট মনে হতো না। টাকা নেই তো কী হয়েছে, হেঁটে চলে যাব! আমি বড্ড অভিমানী টাইপের ছেলে ছিলাম। আমি জীবনে সবসময় হাত পেতে নেওয়া মানুষ নয়, বরং হাত খুলে দেওয়া মানুষ হতে চেয়েছিলাম।”
চলতি বছরের মার্চ মাসেই গৌরব ওঁর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ১৯৯৮ সালের কিছু হাতে লেখা চিঠি শেয়ার করেছিলেন, যা তিনি মুম্বই থেকে ওঁর বাবা-মাকে লিখেছিলেন। সেই চিঠির ছত্রে ছত্রে লুকিয়ে ছিল এক স্বপ্নভঙ্গ ও লড়াকু যুবকের গল্প।
একটি চিঠিতে গৌরব লিখেছিলেন,“প্রিয় মাম্মা এবং পাপা, তোমরা কেমন আছো? আমি এখানে খুব ভাল আছি। এখনও পর্যন্ত টাকার মুখ দেখতে পাইনি বা কোনও বড় কাজ হাতে আসেনি, তবে আশা করছি খুব শীঘ্রই সব ঠিক হয়ে যাবে। দিল্লির চেয়ে মুম্বাইতে কাজের সুযোগ অনেক বেশি। আমি সকালবেলা বিভিন্ন মানুষের সাথে কাজের জন্য দেখা করি আর সন্ধেবেলা থিয়েটারের রিহার্সাল করি। এখন ‘ম্যান অফ লা মাঞ্চা’ নামের একটি বিখ্যাত মিউজিক্যাল প্লে-র সঙ্গে যুক্ত হয়েছি, যা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ।”
আরেকটি চিঠিতে নিজের থাকার জায়গার বিবরণ দিয়ে তরুণ গৌরব লিখেছিলেন, “আমি যেখানে থাকছি সেটা একটা ছোট্ট কটেজ, পকেটের ওপর খুব একটা চাপ পড়বে না। আমি আর রাজেশ (রুমমেট) যদি ১ হাজার টাকা করে শেয়ার করি, তবে এক একবারে ১১ মাসের ভাড়া চুকিয়ে দেওয়া যাবে। এছাড়া বাকি খরচের মধ্যে রয়েছে টেলিফোন, বিদ্যুৎ, গ্যাস, জল আর খাবারের বিল। মা-বাবা, এখানে ভবিষ্যৎ খুব উজ্জ্বল, তবে আমার এখনও অনেক কিছু শেখার বাকি আছে। সঠিক মানুষের খোঁজ পেতে একটু সময় লাগে, দয়া করে বোঝার চেষ্টা করো। জানি এখন তোমাদের থেকে টাকা নিচ্ছি, তবে বিশ্বাস করো— বেশিদিনের জন্য নয়।”
১৯৯৮ সালের সেই ছটফটে ছেলেটাই যে ২০২৬ সালে এসে আদিত্য ধরের ‘ধুরন্ধর’ ছবিতে করাচির লিয়ারি বস্তিতে জুস বিক্রেতার ছদ্মবেশে থাকা এক তুখোড় ভারতীয় এজেন্টের চরিত্রে অভিনয় করে আসমুদ্রহিমাচল কাঁপিয়ে দেবে, তা হয়তো সেই মধ্যবিত্ত বাবা-মাও ভাবেননি। গৌরবের এই জিরো থেকে হিরো হওয়ার গল্প আজ ইন্ডাস্ট্রির লক্ষাধিক স্ট্রাগলারের কাছে এক মস্ত বড় অনুপ্রেরণা।















