যাদবপুরের সন্তোষপুর লেকের ধারের ময়দান গত দু’দিন দিন ধরে মেতে উঠেছে এক চিলতে রুপোলি আলোর মায়ায়। আজ এই উৎসবের শেষ দিন। ‘দিশা’ নামক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে প্রতি বছরের মতো এবারও অনুষ্ঠিত হলো ‘শিশু-কিশোর চলচ্চিত্র উৎসব’। ২৯ মে থেকে ৩১ মে— এই তিন দিন ব্যাপী উৎসবে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এলাকার অসংখ্য মানুষ ও কচিকাঁচারা উপভোগ করলেন দেশ-বিদেশের মোট ৫টি মননশীল ও জনপ্রিয় চলচ্চিত্র।

গত ২৯ মে উৎসবের শুভ উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট অভিনেতা তথা আবালবৃদ্ধবনিতার প্রিয় ‘ফেলুদা’ সব্যসাচী চক্রবর্তী। উদ্বোধনী বক্তব্যে তিনি এই মহতী উদ্যোগের জন্য উদ্যোক্তাদের কুর্নিশ জানান এবং উপস্থিত কচিকাঁচাদের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান। উদ্বোধনী সন্ধ্যায় মঞ্চ আলো করে উপস্থিত ছিলেন টলিউডের আরও একঝাঁক নক্ষত্র— বিশিষ্ট অভিনেতা ও নাট্যব্যক্তিত্ব চন্দন সেন, শঙ্কর দেবনাথ এবং জয়রাজ ভট্টাচার্য।

আজকের এই দ্রুত বদলে যাওয়া ডিজিটাল যুগ এবং সামাজিক অস্থিরতার সময়ে দাঁড়িয়ে শিশু ও কিশোরদের কাছে সুস্থ ও মননশীল সিনেমা নিয়ে পৌঁছনো কেন এতটা জরুরি, উপস্থিত অভিনেতারা তাঁদের বক্তব্যে অত্যন্ত সহজভাবে তা ব্যাখ্যা করেন। মোবাইল-রিলসের দুনিয়া থেকে বের করে ছোটদের মনের বিকাশ ঘটাতে এমন চলচ্চিত্র উৎসবের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম বলে জানান তাঁরা।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ঠিক পরেই প্রদর্শিত হয় সৌরভ পালোধী পরিচালিত জনপ্রিয় সিনেমা ‘অঙ্ক কি কঠিন’। উৎসবের প্রথম দিনেই বাধা সেজেছিল প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা। কিন্তু দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া এবং ঝড়-বৃষ্টির ভ্রূকুটি উপেক্ষা করেই সন্তোষপুর লেকের পাশের ময়দানে হাজির হয়েছিলেন কয়েকশো মানুষ। ছাতা মাথায়, চাদর গায়ে দিয়েই ছোট থেকে বড়— সকলেই চুটিয়ে উপভোগ করলেন উদ্বোধনী ছবি।

 

উৎসবের দিনগুলোতে হাজির ছিলেন ‘দিশা’র সভাপতি তথা কলকাতা পুরসভার ১০৩ নম্বর ওয়ার্ডের পৌরমাতা নন্দিতা দাস। পুরো অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সঞ্চালনা করেন ‘দিশা’র সম্পাদক সুব্রত দাশগুপ্ত।
উৎসবের পরবর্তী দিনগুলোতে (৩০ ও ৩১ মে) ছোটদের জন্য দেখানো হয় বিশ্ব চলচ্চিত্রের বেশ কিছু কালজয়ী ও জনপ্রিয় সিনেমা, যার মধ্যে ছিল ‘মাকড়ি’, ‘সং অফ দ্য সি’ (Song of the Sea) এবং আন্দ্রেই তারকোভস্কির বিখ্যাত ‘ইভান’স চাইল্ডহুড’ (Ivan's Childhood)।

চলচ্চিত্র উৎসবের বিনোদনের মাঝেও মিশে থাকল এক টুকরো বিষাদ ও শ্রদ্ধার সুর। সিনেমার জায়ান্ট স্ক্রিনের ঠিক পাশেই সযত্নে রাখা ছিল বাঙালি সিনেমাপ্রেমীদের অত্যন্ত প্রিয়, সদ্যপ্রয়াত দুই নক্ষত্র— খ্যাতনামা পরিচালক অনীক দত্ত এবং প্রতিভাবান অভিনেতা-লেখক রাহুল বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি। সিনেমা দেখতে এসে সন্তোষপুর এলাকার আপামোর সাধারণ মানুষ অশ্রুভেজা চোখে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানিয়ে যান তাঁদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে। সব মিলিয়ে, প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও দিশা-র এই শিশু-কিশোর চলচ্চিত্র উৎসব আরও একবার প্রমাণ করল— সিনেমার টানে বাঙালি আজও মাঠমুখী হতে পারে।