নিজস্ব সংবাদদাতা: প্রয়াত প্রবীণ অভিনেতা দেবরাজ রায়। বৃহস্পতিবার কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন তিনি। বয়স হয়েছিল ৬৯। বেশ কিছুদিন আগে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন অভিনেতা। দীর্ঘদিন কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন অভিনেতা। বড়পর্দা ও ছোটপর্দার পাশাপাশি দূরদর্শনে সংবাদপাঠেও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন দেবরাজ। তাঁর সহকর্মী হিসাবে তখন কাজ করতেন জনপ্রিয় বাচিকশিল্পী সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরবর্তী সময় পর্দাতেও জুটি বেঁধে কাজ যেমন করেছেন তাঁরা তেমনই তাঁদের কন্ঠ শোনা গিয়েছে শ্রুতি নাটকেও।

 

দেবরাজ রায়ের মৃত্যুতে স্বভাবতই মনখারাপ শিল্পীর। আজকাল ডট ইন-এর সঙ্গে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি আরও নানা রঙের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলেন এই জনপ্রিয় বাচিকশিল্পী।

 

সুতপার কথায়, "যখন আমি সংবাদপাঠে যোগ দিই ততদিনে সেই মাধ্যমে সাংঘাতিক জনপ্রিয় নাম দেবরাজ রায়। আমি তখন বেশ ছোট। ওঁকে দেখে খানিক ভয়ই লাগত। ওরকম গম্ভীর, আপনমনে থাকা ব্যক্তি। তার উপর কথা খুব কম বলতেন তখন। আর... ওঁর দৃষ্টিটা এত তীব্র ছিল ফলে আরও গুটিসুটি মেরে থাকতাম। আলাপ হওয়ার পরে বুঝেছিলাম যখন অন্যমানস্ক হয়ে খুব গভীর কোনও চিন্তায় ডুবে যেতেন, তখন একভাবে তাকিয়ে থেকে ভাবাটা ওঁর স্বভাব। কাউকে লক্ষ্য করতেন‌ না...আর এত ভদ্র, এত নম্র মানুষ ছিলেন যে ভাবা যায় না! একটা কথা এখানে বলা উচিত, কাজের জায়গায় অসম্ভব পেশাদার ছিলেন।"

 

সামান্য থেমে ফের বলা শুরু করলেন সুতপা বন্দ্যোপাধ্যায়, "খুব সাধারণ মানুষ ছিলেন। নিজের জগতে থাকতেন। তবে আলাপ হওয়ার পর দেখেছি কী অপূর্ব তাঁর ব্যক্তিত্ব। দিব্যি হাসাহাসি করতেন। একটা কথা জোর দিয়ে বলছি, কোনওদিন কোন অশালীন অথবা অভব্য আচরণ করতে দেখেনি ওঁকে। বাইরেও আমরা একসঙ্গে অনুষ্ঠান করতে গিয়েছি... এক মুহূর্তের জন্য শালীনতার গণ্ডি পেরোননি। আর একটা অদ্ভুত ছেলেমানুষি ছিল দেবরাজদার। সবাই মিলে হইহই করে যদি গাড়িতে চাপা হত, তাহলে তা আর পিছিয়ে আনতেন না। মানে শুধু গাড়ি এগোবে, কিছুতেই পিছোবে না...এরকম আর কি! কত বিষয়ে পড়াশোনা ছিল ওঁর, আড্ডা শুরু হলে চিন্তা থাকত না, গল্পের অফুরন্ত ভান্ডার যে। আর জানেন, নিজের মাকে বড্ড ভালবাসতেন উনি।"

 

"দেবরাজদার অভিনয় নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই। সবাই জানেন কোন মাপের অভিনেতা ছিলেন...যুবক বয়সে কি সুন্দর দেখতে ছিলেন। 'মার্জিনা আবদাল্লা'র কথা তো সবাই জানেন। একটা মজার ঘটনা মনে পরছে এই ফাকে বলে ফেল যে মানুষটাকে প্রথম দেখাতে ভয় লেগেছিল একসময় টেলিফ্লেমে সেই মানুষটার সঙ্গেই জুটি বেঁধে অভিনয় করেছে। একটি টেলিফিল্মে আমি দেবরাজদার স্ত্রীর চরিত্রে ছিলাম। একটি রোম্যান্টিক দৃশ্য ছিল আমাদের মধ্যে। অভিনয় করব কি দেবরাজদাকে দেখে হাসতে হাসতে মরে যাচ্ছি। দেবরাজদা চুপ করে আছেন আর আমি হেসেই যাচ্ছি... আজ সেই মানুষটাই আর নেই। বইয়ে পড়া ভাল মানুষ বলতে যা বোঝায়,ঠিক তাই ছিলেন দেবরাজদা। এইসব স্মৃতি আজ বারবার ফিরে আসছে..."

 

 

দেবরাজ রায়কে নিয়ে নানা স্মৃতির মালা যেভাবে গাঁথা যেভাবে শুরু করেছিলেন সুতপা, আলাপচারিতার অন্তিম লগ্নেও সেরকম নিপুণভাবেই তাঁকে ইতি টানতে দেখা গেল কথায় ও আবেগে।