আজকাল ওয়েবডেস্ক: বৃহস্পতিবারের ঘটনাপ্রবাহ কেবল রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়ানোর কথা ছিল, কিন্তু আদতে তা পশ্চিমবঙ্গের বুকে বিজেপির সাংগঠনিক দৈন্যদশা আর সাধারণ মানুষের মোহভঙ্গের ছবিটাই স্পষ্ট করে দিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাই-প্রোফাইল সভাগুলো ঘিরে দলের যে প্রত্যাশা ছিল, বাস্তবে তা ফিকে হয়ে গেল পাতলা ভিড়, টাকা দিয়ে লোক আনার অভিযোগ আর চুরিকাণ্ডের জেরে ক্ষুব্ধ মানুষের বিক্ষোভে। গেরুয়া শিবিরের জন্য দিনটি জয়ের বার্তার বদলে একরাশ অস্বস্তি নিয়ে এল।
আসানসোলের পোলো গ্রাউন্ডকে বিজেপি নেতারা ‘মোদির পয়া জায়গা’ বলে মনে করেন। সেখানে তিনটি বিশাল হ্যাঙ্গার তৈরি করা হয়েছিল যার ধারণক্ষমতা প্রায় ২০ হাজার। কিন্তু জনসভার অন্দরের খবর বলছে, ভিড় জমাতে হিমশিম খেতে হয়েছে স্থানীয় নেতাদের। পূর্ব বর্ধমান, বাঁকুড়া আর পুরুলিয়া থেকে বাস ভর্তি করে লোক আনতে হয়েছে। বাঁকুড়ার এক শ্রমিক রাজু সিং খোলাখুলিই জানালেন, ৫০০ টাকা আর খাবারের প্যাকেটের লোভে তিনি এসেছেন। তাঁর সোজাসাপ্টা কথা, "আগেও বিজেপিকে ভোট দিইনি, এখনো দেব না। স্রেফ চড়া রোদে একটু বাড়তি উপার্জনের জন্য আসা।" দুপুর ১২টা থেকে দীর্ঘ সময় প্রখর রোদে অপেক্ষা করতে করতে মানুষ যখন ধৈর্য হারাচ্ছিল, তখন জল আর স্লোগান দিয়ে তাঁদের আটকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালান নিচুতলার কর্মীরা। এমনকি প্রধানমন্ত্রী যখন আসলেন, তখনও সেই উদ্দীপনায় কৃত্রিমতার ছাপ ছিল স্পষ্ট।
তবে সব কিছুকে ছাপিয়ে গেল আসানসোলের মোবাইল চুরির ঘটনা। ভিড়ের সুযোগ নিয়ে প্রায় ৫০টি মোবাইল গায়েব হয়ে যায়। মোদির ছবি তোলার আশায় থাকা সিমা দেবীর মতো বহু সাধারণ মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়েন। নিরাপত্তা কর্মীদের গাফিলতির অভিযোগ তুলে রাত নামতেই আসানসোল থানার সামনে শুরু হয় লঙ্কাকাণ্ড। প্রায় ২০০ জন মানুষ পথ অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান, যার জেরে শহরজুড়ে তীব্র যানজট তৈরি হয়। দলেরই এক প্রভাবশালী নেতা স্বীকার করে নিলেন, "এই চুরির ঘটনা আমাদের সব পরিশ্রমের ওপর জল ঢেলে দিল। মানুষ উৎসাহিত হওয়ার বদলে রেগে বাড়ি ফিরল।"
সিউড়ির সভাতেও বাহ্যিক জাঁকজমক থাকলেও ভেতরে ছিল একই শূন্যতা। বীরভূমের মীনা দাসের মতো অনেকেই এসেছিলেন স্রেফ মোদিকে কাছ থেকে দেখতে কিংবা একটা ফ্রি টি-শার্টের আশায়। সেখানে টি-শার্ট বিলিকে কেন্দ্র করে হুড়োহুড়ি আর বিশৃঙ্খলা কার্যত পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। যা দেখে তৃণমূল নেতা ফিরহাদ হাকিম কটাক্ষ করে বলেন, "মোদি ম্যাজিক শেষ। ঘরের লোক আসছে না বলেই বাইরে থেকে লোক ভাড়া করতে হচ্ছে।"
দিনের সবথেকে বড় ধাক্কাটি ছিল হলদিয়ার সভা। যে পূর্ব মেদিনীপুর একসময় বিজেপির গড় হিসেবে পরিচিত ছিল, সেখানে মাত্র হাজার পাঁচেক লোকের উপস্থিতি দলের অন্দরেই ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। বৃষ্টির অজুহাত দেওয়া হলেও, মূল কারণ ছিল বক্তৃতার বিষয়ের সাথে সাধারণ মানুষের সংযোগের অভাব। জনৈক পুরনো বিজেপি কর্মী প্রশান্ত দাসের মতে, মাছ চাষ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘ ভাষণ স্থানীয় মানুষের মনে কোনও রেখাপাত করেনি। মানুষ মাঝপথেই সভা ছেড়ে বেরিয়ে যেতে শুরু করেন। কেউ বা বাইরে দাঁড়িয়ে চায়ের দোকানে আড্ডা দিতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করছিলেন।
দিনশেষে বিজেপির জেলা সভাপতি অভিজিৎ তাহ যতই বলুন যে প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও মানুষের মনে উৎসাহ ছিল, বাস্তবটা ছিল ভিন্ন। চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের মতো তৃণমূল নেতারা বিষয়টিকে ‘ফ্লপ শো’ বলে দেগে দিয়েছেন। আসানসোলের জয়ন্তর মতো অনেক তরুণই যারা উৎসাহ নিয়ে এসেছিলেন, মোবাইল চুরির পর তিতিবিরক্ত হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। সব মিলিয়ে, কেবল তারকা প্রচারকের ওপর ভর করে যে বাংলায় বৈতরণী পার হওয়া কঠিন, বৃহস্পতিবারের এই ‘হেডেক’ ভরা সভাগুলো বিজেপির সামনে সেই কঠিন সত্যটাই তুলে ধরল। মানুষের ভরসা অর্জন করতে মোদি ম্যাজিকের চেয়েও বেশি কিছু এখন বিজেপির প্রয়োজন।















