আজকাল ওয়েবডেস্ক: মৃত্যু জীবনের একটি অনিবার্য সত্য। অথচ এমন একটি নিশ্চিত ঘটনার জন্য অধিকাংশ পরিবারই পরবর্তী পরিস্থিতির প্রস্তুতির পেছনে খুব কম সময় ব্যয় করে। কোনও ব্যক্তির মৃত্যুর পর একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এসে পড়ে, সেটি হল কোনও উইল করা ছিল না।

শোকের রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হয়ে যায় নথিপত্র গোছানো, আইনি প্রক্রিয়া এবং কখনও কখনও পারিবারিক বিবাদ। যেসব পরিবার ভেবেছিল যে সম্পদ আপনা-আপনিই পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হস্তান্তরিত হবে, তারা প্রায়শই উত্তরাধিকার আইন, উত্তরাধিকার সনদ  এবং আদালতের এমন সব প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হয় যার কথা তারা আগে কখনও শোনেনি।

'জেএসএ অ্যাডভোকেটস অ্যান্ড সলিসিটরস'-এর পার্টনার ভার্গিস থমাস বলেন, "এটি এমন একটি অস্বস্তিকর বিষয় যা নিয়ে অধিকাংশ মানুষই আলোচনা করতে চান না। অথচ বিষয়টি নিয়ে আগেভাগে ভাবলে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব।" থমাসের মতে, বাস্তবতা হল উত্তরাধিকার সংক্রান্ত অধিকাংশ জটিলতাই উইল নিয়ে বিরোধ থেকে শুরু হয় না, বরং উইল না থাকার কারণেই সেগুলোর সূত্রপাত ঘটে।

ভারতে কেউ উইল না করে মারা গেলে কী হয়?

নীচে এই সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি মূল প্রশ্ন ও তার উত্তর দেওয়া হল-

১. সম্পদের মালিকানা কার হাতে যাবে, তা কে ঠিক করে?
যদি কোনও ব্যক্তি উইল না করে মারা যান, আইনি পরিভাষায় যাকে বলা হয় 'ইনটেস্টেট' বা উইলবিহীন মৃত্যু, তবে সম্পদের বণ্টন ব্যক্তিগত ইচ্ছার পরিবর্তে আইনের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। থমাস ব্যাখ্যা করেন, "'ইনটেস্টেট' বা উইলবিহীন মৃত্যুর অর্থ হল উইল না করেই মারা যাওয়া। এর অর্থ হল, সম্পদ কীভাবে হস্তান্তরিত হবে তা আইনই নির্ধারণ করে দেয়।"

আইনটি নির্ভর করে মৃত ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন তার ওপর। হিন্দু, বৌদ্ধ এবং জৈনদের ক্ষেত্রে 'হিন্দু উত্তরাধিকার আইন'  কার্যকর হয়। খ্রিস্টান ও পার্সিরা 'ভারতীয় উত্তরাধিকার আইন'-এর আওতাভুক্ত, আর মুসলিমরা তাদের নিজস্ব ব্যক্তিগত আইন অনুসরণ করেন।

একজন হিন্দু পুরুষের ক্ষেত্রে নিয়মগুলো তুলনামূলকভাবে সহজ। এক্ষেত্রে সম্পদ বিধবা স্ত্রী, মা এবং সন্তানদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া হয়।

থমাস বললেন, "ধরুন একশো টাকা আছে এবং সেখানে মৃত ব্যক্তির বিধবা স্ত্রী, মা ও দু'টি সন্তান রয়েছেন। সম্পত্তিটি চারটি ভাগে ভাগ হবে, যার অর্থ প্রত্যেকে ২৫ টাকা করে পাবেন। বিষয়টি খুবই সহজ।" এক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়েরা সমানভাবে উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তির ভাগ পায়।

আপনি যদি 'হিন্দু উত্তরাধিকার আইন'-এর আওতাভুক্ত না হন, তবে কী হবে?
সেক্ষেত্রে নিয়মগুলো বদলে যায়। 'ভারতীয় উত্তরাধিকার আইন'-এর আওতাভুক্ত খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রে, জীবনসঙ্গী সাধারণত সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ পান এবং বাকি অংশ সন্তানদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করা হয়। যদি কোনও সন্তান না থাকে, তবে উত্তরাধিকারের পরিধি প্রসারিত হয়ে অন্যান্য আত্মীয়দেরও অন্তর্ভুক্ত করে।

থমাসের কথায়, "জীবনসঙ্গীর অংশ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে এবং অবশিষ্ট অংশ অন্যান্য আত্মীয়দের মধ্যে ভাগ করা হয়। এই প্রক্রিয়াটি শুরু হয় মৃত ব্যক্তির বাবার মাধ্যমে, এরপর মা এবং তারপর ভাই-বোনদের বিষয়টি আসে।"

উত্তরাখণ্ডের কাঠামোর অনুরূপ 'ইউনিফর্ম সিভিল কোড' (অভিন্ন দেওয়ানি বিধি) যদি আরও বেশি রাজ্য গ্রহণ করে, তবে এই ব্যবস্থায় ভবিষ্যতে পরিবর্তন আসতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, "যদি ইউনিফর্ম সিভিল কোডের ধারণাটি কার্যকর করা হয়, তবে উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে এই সমস্ত ব্যক্তিগত আইনের (পার্সোনাল ল) আর কোনও অস্তিত্ব থাকবে না।"

২. পরিবারগুলো বাস্তবে কীভাবে সম্পদ হস্তান্তর করে?
কারা উত্তরাধিকারী হবেন তা জানাটা কেবল অর্ধেক কাজ, আসল চ্যালেঞ্জ হল তা প্রমাণ করা। থমাসের মধ্যে, সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হল একটি 'আইনি উত্তরাধিকারী সনদ' সংগ্রহ করা, যা মৃত ব্যক্তির বৈধ উত্তরাধিকারীদের শনাক্ত করে।

সাধারণত মৃত্যুসনদ এবং সম্পর্কের প্রমাণপত্র জমা দিয়ে রাজ্য সরকারের পোর্টাল থেকে এই সনদ সংগ্রহ করা যায়। একবার ইস্যু হয়ে গেলে, সম্পত্তি, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, ফিক্সড ডিপোজিট এবং বিনিয়োগ হস্তান্তরের ক্ষেত্রে এটিই প্রধান নথিতে পরিণত হয়। থমাস ব্যাখ্যা করেন, "অধিকাংশ ব্যাঙ্ক বা ডিপোজিটরি প্রতিষ্ঠান উত্তরাধিকারী সনদ দেখতে চায়, যাতে তারা বুঝতে পারে সম্পদটি কার কাছে হস্তান্তর করতে হবে।"

৩. মনোনীত ব্যক্তি (নমিনি) কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মালিক হবেন?
অনেক বিনিয়োগকারী মনে করেন যে, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, মিউচুয়াল ফান্ড ফোলিও বা ডিমেট অ্যাকাউন্টে নাম থাকা মনোনীত ব্যক্তি (নমিনি) মৃত্যুর পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই সম্পদের মালিক হয়ে যান। কিন্তু আইন সেভাবে কাজ করে না। থমাস বলেন, "আইনি অবস্থান হল, কেবল মনোনীত ব্যক্তি হওয়ার কারণেই কেউ সেই সম্পদের মালিক হওয়ার অধিকার পান না।"

এর পরিবর্তে, মনোনীত ব্যক্তি কেবল একজন সাময়িক তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করেন, যতক্ষণ না বৈধ উত্তরাধিকারীরা তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। থমাসের কথায়, "প্রকৃত উত্তরাধিকারী দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত তাঁরা তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কাজ করেন এবং এরপরই মালিকানা হস্তান্তরের বিষয়টি সম্পন্ন করা হয়।"

৪ উত্তরাধিকারীরা যদি সম্পত্তি বিক্রি করতে চান, তবে কী হবে?
যখন একাধিক উত্তরাধিকারী কোনও একক সম্পত্তির মালিক হন, তখন উত্তরাধিকারের বিষয়টি জটিল হয়ে পড়ে। পরিবার যদি সম্পত্তি বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ ভাগ করে নিতে চায়, তবে কোনও উত্তরাধিকারীকে আদালতের শরণাপন্ন হয়ে 'লেটার অফ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন' (সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার আইনি অনুমোদনপত্র) সংগ্রহের প্রয়োজন হতে পারে।

থমাস বলেন, "এটি মূলত আদালতের মাধ্যমে পরিচালিত একটি প্রক্রিয়া, যার শেষে আদালত উত্তরাধিকারীদের মধ্যে একজনকে 'লেটার অফ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন' প্রদান করে।" এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একজন উত্তরাধিকারী সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, সম্পত্তি বিক্রি এবং বিক্রয়লব্ধ অর্থ সুবিধাভোগীদের মধ্যে বণ্টনের আইনি ক্ষমতা লাভ করেন। তিনি বলেন, "কোন আদালতে মামলাটি চলছে তার ওপর ভিত্তি করে এই প্রক্রিয়ায় আট, বারো বা পনেরো মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।"

থমাস উত্তরাধিকার সংক্রান্ত মূলত দুই ধরনের মামলার সম্মুখীন হন। প্রথমটি হল পারিবারিক বিরোধ, যেখানে পরিবারের সদস্যরা কোনও উইল  নিয়ে আপত্তি তোলেন। দ্বিতীয়টি, যা প্রায়শই বেশি দেখা যায় তা হল এমন পরিস্থিতি যেখানে কোনও উইল না থাকায় পরিবারগুলো বুঝতে পারে না পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে। ভারতের উত্তরাধিকার আইন সম্পদ হস্তান্তরের একটি কাঠামো প্রদান করে ঠিকই, কিন্তু তা স্বচ্ছতার বিকল্প হতে পারে না।

তিনি বলেন, "মক্কেলরা আমাদের কাছে এসে বলেন যে তাঁদের বাবা বা কাকা মারা গিয়েছেন এবং সম্পত্তি রয়েছে, কিন্তু তাঁরা বুঝতে পারছেন না এরপর কী করণীয়। তখন আমরা জানতে চাই, কোনও নথিপত্র আছে কি না। তাঁরা জানান যে কোনো নথিপত্র নেই। তাহলে তখন কী নিয়ম প্রযোজ্য হবে? আইন কি কার্যকর হবে? এই সম্পত্তির মালিকানা কার হবে—সে বিষয়ে আইনের নির্দেশনা কী?"

এর উত্তর নির্ভর করে উত্তরাধিকার আইন, আইনি নথিপত্র এবং বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার সমন্বয়ের ওপ, যার মুখোমুখি অধিকাংশ মানুষ জীবনে কেবল একবারই হন।