আজকাল ওয়েবডেস্ক: দীর্ঘমেয়াদে সম্পদ গড়ে তুলতে আগ্রহী বিনিয়োগকারীদের জন্য মিউচুয়াল ফান্ডের 'সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান' (এসাইপি) এবং পোস্ট অফিসের 'রেকারিং ডিপোজিট' (আরডি)—এই দু'টি ভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে।

এসআইপি-র ক্ষেত্রে বাজার-নির্ভর মিউচুয়াল ফান্ডে নিয়মিত একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। অন্যদিকে, পোস্ট অফিসের আরডি-তে প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জমা রাখা যায়, যার ওপর নিশ্চিত সুদের হার পাওয়া যায়। বিনিয়োগের এই দু'টি পদ্ধতির মধ্যে কিছু সাধারণ মিল থাকলেও, অন্যান্য দিক থেকে এদের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে।

এসআইপি দীর্ঘমেয়াদে অধিক মুনাফা দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, তবে এতে বাজারের ওঠানামার ঝুঁকি থাকে। এর বিপরীতে, আরডি স্থিতিশীল ও নিশ্চিত মুনাফা প্রদান করে এবং এতে সরকারি নিশ্চয়তা থাকে।

যদিও সাধারণ হিসাব অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এসআইপি-কে অধিক বুদ্ধিদীপ্ত পছন্দ বলে মনে হতে পারে, তবুও ঝুঁকির মাত্রার কারণে এটি সবার জন্য আদর্শ নাও হতে পারে। কোন পদ্ধতিটি বেছে নেওয়া হবে, তা নির্ভর করে বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা, আর্থিক লক্ষ্য এবং বিনিয়োগের সামগ্রিক সময়কালের ওপর। নীচে গাণিতিক হিসাবের মাধ্যমে এই দুই বিনিয়োগ পদ্ধতির পার্থক্য তুলে ধরা হল-

৫ বছরে ২৫,০০০ টাকার এসআইপি বনাম আরডি: ১২ শতাংশ বার্ষিক মুনাফার হারে ৫ বছর ধরে প্রতি মাসে ২৫,০০০ টাকার এসআইপি করলে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়াবে ১৫ লক্ষ টাকা। এক্ষেত্রে ৫ বছর পর আনুমানিক মুনাফা হতে পারে ৫.৬২ লক্ষ টাকা, যার ফলে মেয়াদ শেষে মোট তহবিলের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ২০.৬২ লক্ষ টাকা।

এর বিপরীতে, পোস্ট অফিসে আরডি-তে একই পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করলে এবং বর্তমান ৬.৭ শতাংশ সুদের হার বিবেচনা করলে মেয়াদ শেষে মোট তহবিলের মূল্য দাঁড়াবে ১৭.৮৫ লক্ষ টাকা।

প্রথম ৫ বছরে এসআইপি এবং আরডি-র মধ্যে খুব একটা বড় পার্থক্য চোখে পড়ে না। তবে সময় যত গড়াতে থাকে, এসআইপি-এর ক্ষেত্রে চক্রবৃদ্ধি সুদের উচ্চতর ক্ষমতার প্রভাব মোট তহবিলের ওপর স্পষ্ট হতে শুরু করে। 

১০ বছরে ২৫,০০০ টাকার এসআইপি বনাম আরডি: ১০ বছর ধরে প্রতি মাসে ২৫,০০০ টাকার এসআইপি-র জন্য মোট ৩০ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। এক্ষেত্রে, বার্ষিক ১২ শতাংশ রিটার্ন বা মুনাফার হারে অর্জিত মুনাফার পরিমাণ দাঁড়ায় ২৮.০৮ লক্ষ টাকায় এবং মোট তহবিলের পরিমাণ হয় ৫৮.০৮ লক্ষ টাকা।

১০ এর বিপরীতে, ১০ বছরের জন্য ৬.৭ শতাংশ সুদের হারে পোস্ট অফিসের আরডি-তে ৩০ লক্ষ টাকা বিনিয়োগ করলে প্রায় ১২.৮০ লক্ষ টাকা মুনাফা পাওয়া যায়। এর ফলে ১০ বছর শেষে মোট তহবিলের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪২.৮০ লক্ষ টাকায়। মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে চক্রবৃদ্ধি সুদের অধিক সুবিধা পাওয়ার কারণে এই দু'টি বিনিয়োগ পদ্ধতির মধ্যে পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

পার্থক্য: ১০ বছরের মেয়াদে পোস্ট অফিসের আরডি-র পরিবর্তে এসআইপি বেছে নিলে বিনিয়োগকারী অতিরিক্ত ১৫ লক্ষ টাকার তহবিল গড়ে তুলতে সক্ষম হতে পারেন।

হিসাব বুঝুন: 

২০ বছরে ২৫,০০০ টাকার এসআইপি বনাম আরডি  

বিনিয়োগের মেয়াদ: ২০ বছর
প্রত্যাশিত রিটার্নের হার: ৬.৭ শতাংশ
বিনিয়োগকৃত অর্থ: ৬০,০০,০০০ টাকা
আনুমানিক মুনাফা: ৬৬,২৯,০৯০ টাকা
মোট মূল্য: ১,২৬,২৯,০৯০ টাকা

মাসিক এসআইপি = ২৫,০০০ টাকা
বিনিয়োগের মেয়াদ: ২০ বছর
প্রত্যাশিত রিটার্নের হার: ১২ শতাংশ
বিনিয়োগকৃত অর্থ: ৬০,০০,০০০ টাকা
আনুমানিক মুনাফা: ১,৮৯,৭৮,৬৯৭ টাকা
মোট মূল্য: ২,৪৯,৭৮,৬৯৭ টাকা

২০ বছরের মেয়াদে, পোস্ট অফিসের আরডি স্থিতিশীল ও নিশ্চিত রিটার্নের মাধ্যমে বিনিয়োগকৃত অর্থকে দ্বিগুণ করতে পারে। তুলনায়, ইকুইটি মিউচুয়াল ফান্ডে এসআইপি-এর মাধ্যমে বিনিয়োগ প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

বিভিন্ন সময়কালের এই হিসাবগুলো থেকে দেখা যায় যে, দীর্ঘ মেয়াদে এসআইপি বিনিয়োগকারীদের উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি মুনাফা দিতে  পারে। তবে, কোন সম্পদ বা বিনিয়োগের মাধ্যমটি বেছে নেওয়া হবে তা ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষমতা, বিনিয়োগের সময়সীমা এবং আয়ের উৎসের মতো বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।

যদি কোনও বিনিয়োগকারী রক্ষণশীল মনোভাবের হন এবং প্রায় ৫ বছরের জন্য বিনিয়োগ ধরে রাখতে চান, তবে তাঁরা আরডি-কে বেছে নিতে পারেন। কারণ এসআইপি-এর তুলনায় এতে প্রাপ্ত ফলাফলের পার্থক্য খুব একটা বেশি নয়। তবে দীর্ঘ মেয়াদে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে, তাঁরা নিজেদের আর্থিক লক্ষ্য ও ঝুঁকি গ্রহণের ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের কথা বিবেচনা করতে পারেন।