আজকাল ওয়েবডেস্ক: আপনি কি কখনও ভেবে দেখেছেন, প্রতিদিন আমরা কতগুলো মাইক্রোপেমেন্ট করি? পেটিএম, ফোনপে, গুগল পে-র মতো ডিজিটাল ওয়ালেটের মাধ্যমে খুব কম অঙ্কের এই লেনদেনগুলো আজ প্রতিটি স্মার্টফোনকে পরিণত করেছে একেকটি ‘ফ্রিকশনলেস’ পেমেন্ট ডিভাইসে। সকালবেলার এক কাপ চা, অটোয় দ্রুত ভাড়া পরিশোধ, কিংবা কোনো অ্যাপের সাবস্ক্রিপশন—একটি ট্যাপেই হয়ে যাচ্ছে সব লেনদেন।


মাসের শেষে অনেক ভারতীয়ই অবাক হয়ে দেখেন যে তাঁর ডিজিটাল ওয়ালেট—পেটিএম, ফোনপে বা গুগল পে—ধীরে ধীরে শত শত টাকা গিলে ফেলেছে। ডিজিটাল পেমেন্টের সহজলভ্যতার কারণে এই ক্ষুদ্র ব্যয়গুলো নজরে আসে না, যতক্ষণ না আমরা ব্যাংক স্টেটমেন্ট খুঁটিয়ে দেখি।


আপনি কি কখনও খেয়াল করেছেন, প্রতি মাসে আপনার ডিজিটাল পেমেন্ট অ্যাপ থেকে কতগুলো সাবস্ক্রিপশন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন হয়? আমি যখন আমার নিজের সাবস্ক্রিপশনগুলো পর্যালোচনা করলাম, তালিকা দেখে বিস্মিত হতে হল—নেটফ্লিক্স বেসিক: ১৯৯, অ্যাপল মিউজিক: ১১৯, অ্যামাজন প্রাইম: ২৯৯, অ্যাপল ক্লাউড: ৭৫, স্পটিফাই: ১১৯—এবং আরও রয়েছে হটস্টার, জোম্যাটো গোল্ড, সুইগি ওয়ানসহ বহু সাবস্ক্রিপশন। প্রতিটি ব্যয় সামান্য মনে হলেও, এরা মিলে গড়ে তোলে এক অদৃশ্য মাইক্রোপেমেন্টের প্রবাহ, যা নিঃশব্দেই সঞ্চয় কমিয়ে দেয়।


এটাই ভারতের নতুন ব্যয়ের বাস্তবতা—মাইক্রোপেমেন্টের যুগ, যেখানে সুবিধার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়েছে অদৃশ্য আর্থিক ফাঁস। ডিজিটাল সুবিধা আজ আমাদের পকেট থেকে নীরবে খরচ টেনে নিচ্ছে।


এই ছোট ছোট ব্যয়গুলো ধীরে ধীরে ঐচ্ছিক ও প্রয়োজনীয় ব্যয়ের সীমারেখা অস্পষ্ট করে দিচ্ছে। ইন-অ্যাপ নাজ, ক্যাশব্যাক, এবং ‘বাই নাউ পে লেটার’-এর মতো প্রলোভন সিদ্ধান্তকে আরও কঠিন করে তোলে, আর স্বাভাবিক কেনাকাটাকে পরিণত করে অভ্যাসে।


ভারতে ডিজিটাল পেমেন্ট বিপ্লব বিশ্বের দ্রুততমগুলোর একটি। দোকান থেকে শুরু করে অটোরিকশা—কোথাও কিউআর কোডের অভাব নেই। আরবিআই জানিয়েছে, দেশে মোট লেনদেনের ৯৯.৮% এখন ডিজিটাল, আর ইউপিআই এক মাসেই রেকর্ড ১৮ বিলিয়ন লেনদেন করেছে।


২০১৩ সালে বেঙ্গালুরুতে মোবাইল পেমেন্ট নিয়ে আমার গবেষণায় দেখা গিয়েছিল—ব্যবহারের সহজত্বই ছিল গ্রাহক গ্রহণের প্রধান কারণ। এক দশক পর সেটিই রূপ নিয়েছে “ট্যাপ ইকোনমি”-তে—সহজ, দ্রুত এবং প্রায় অনুভূতিহীন। কিন্তু এই নিঃশব্দ সুবিধাই ব্যয়কে করে তুলেছে অবচেতন।


নগদ টাকা দেওয়ার সময় এক প্রকার ‘ব্যথা’ কাজ করে—নোট বের করলে খরচটা অনুভূত হয়। ডিজিটাল ওয়ালেট সেই অনুভূতি মুছে দেয়। আচরণগত অর্থনীতিবিদদের মতে, যখন আর্থিক ঘর্ষণ কমে যায়, আত্মনিয়ন্ত্রণও দুর্বল হয়।


২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৮% ব্যবহারকারী স্বীকার করেছেন যে ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবহারের পর তাঁরা আরও বেশি ফ্রিকোয়েন্ট খরচ করছেন—বিশেষ করে রিচার্জ, ওটিটি সাবস্ক্রিপশন এবং অনলাইন খাবার অর্ডারে। প্রতিটি মাইক্রোপেমেন্ট মস্তিষ্কে সামান্য ডোপামিন উত্পন্ন করে, যা অভ্যাস তৈরি করে এবং বাজেটে অদৃশ্য ‘লিক’ তৈরি করে।


সাবস্ক্রিপশন ক্রিপ ও অটো-ডেবিটের ফাঁদ
৪৯ বা ৯৯-র অটো-ডেবিট সাবস্ক্রিপশন অনেকেই ভুলে যান। ক্যাশব্যাকের নোটিফিকেশন সেভিংসের ভ্রম তৈরি করে। ২০২০ থেকে ভারতের সাবস্ক্রিপশন অর্থনীতি প্রায় ৩০% হারে বাড়ছে, কিন্তু কতগুলো সাবস্ক্রিপশন আমরা বাস্তবে ব্যবহার করি—তা অনেকেই জানেন না।


আরবিআই-এর ‘ফিনান্সিয়াল লিটারেসি ভিশন ২০২৫’-এ বলা হয়েছে, ডিজিটাল ব্যবহারে সচেতনতা জরুরি। সেজন্য দরকার কিছু সহজ অভ্যাস—অটো-পে পর্যালোচনা, ব্যয় সতর্কতা সেট করা, অপ্রয়োজনীয় দিনে খরচ সীমাবদ্ধ করা, আর পেমেন্ট ট্যাপ করার আগে মাত্র ৫ সেকেন্ড বিরতি নেওয়া।


ডিজিটাল ওয়ালেট আমাদের ক্ষমতায়িত করেছে ঠিকই, তবে শৃঙ্খলা এখনও মানুষেরই হাতে। প্রযুক্তি বদলেছে—কিন্তু ব্যয়ের সতর্কতা বদলানো আরও জরুরি।