আজকাল ওয়েবডেস্ক: রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর সোমবার প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করল নতুন বিজেপি সরকার। আর এই বাজেট ঘিরেই এক নজিরবিহীন ও নাটকীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাক্ষী থাকল পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা। সাধারণত সরকারের বাজেট পেশের পর তার ভালো-মন্দ নিয়ে প্রধান বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবে সবার আগে গর্জে ওঠার কথা মমতা ব্যানার্জির। কিন্তু রাজনীতির কী অদ্ভুত পরিহাস! বাজেট পেশ হওয়ার পর বেশ কয়েক ঘণ্টা কেটে গেলেও সম্পূর্ণ নিশ্চুপ তৃণমূল সুপ্রিমো। শুধু তিনি একাই নন, তাঁর পন্থী কোনও  প্রথম সারির নেতাকেও এই নিয়ে মুখ খুলতে দেখা যায়নি।

মমতা ব্যানার্জির এই নীরবতার মাঝেই বিধানসভায় প্রথম বিরোধী দল হিসেবে বাজেট সমালোচনা করতে ময়দানে নেমে পড়লেন ‘আসল তৃণমূল’-এর দলনেতা ঋতব্রত ব্যানার্জি। আসলে ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই বাংলার রাজনীতিতে এক বিরাট ওলটপালট ঘটে গেছে। মমতার হাত ছেড়ে তাঁরই প্রতীকে জেতা ৬৪ জন বিধায়ক একজোট হয়ে বিধানসভায় নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করেছেন, যার রাশ এখন ঋতব্রতর হাতে। নিজেদের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে দাবি করা এই শিবিরের দাপটে মমতা ব্যানার্জি এখন অনেকটাই কোণঠাসা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে কোনও  ভুল পদক্ষেপ করতে চাইছেন না মমতা। সেই কারণেই গত রবিবারই নিজের শিবিরে থাকা বাকি নেতাদের তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, বাজেটের অন্ধ বিরোধিতা করা যাবে না; আগে খতিয়ান ভালোভাবে দেখে, বুঝে, তারপর মন্তব্য করতে হবে। আর সেই রণকৌশল মেনেই আপাতত ‘ধীরে চলো’ নীতি নিয়েছেন মমতা ও তাঁর সহযোদ্ধারা। কিন্তু বাজেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনে এভাবে মমতার ব্যাকফুটে চলে যাওয়া এবং লাইমলাইট থেকে ‘উধাও’ হয়ে যাওয়া স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, রাজ্যের রাজনীতিতে তিনি ক্রমশ প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছেন।

তবে রাজনৈতিক এই টানাপোড়েন এবং বিরোধীদের তরজার মাঝেই নতুন সরকারের বাজেটে রাজ্যের যুবসমাজের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে, যা অনেকেরই নজর কেড়েছে। বাজেটে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, খেলাধুলা, গবেষণা এবং উদ্যোগে বিনিয়োগের মাধ্যমে এমন এক আত্মবিশ্বাসী প্রজন্ম তৈরি করা হবে, যারা বিশ্বের দরবারে প্রতিযোগিতায় সক্ষম হবে এবং বাংলায় আগামী দিনে বিকাশ আনবে।

এই লক্ষ্যেই পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রতি বছর AVGC-XR সেক্টরে প্রায় ১ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রী ও যুবসমাজকে বিশেষ ট্রেনিং দেওয়ার প্রস্তাব রেখেছে বাজেটে। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, চলতি বছরেই প্রায় ৭,০০০ যুবক-যুবতীকে এই প্রশিক্ষণ দিতে রাজ্যে ৫০০টি নতুন ‘কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ল্যাব’ স্থাপন করা হবে। এর জন্য বাজেটে আলাদা করে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে ওয়েবেল অ্যানিমেশন অ্যাকাডেমিকে একেবারে ঢেলে সাজানোর কথা বলা হয়েছে। সেখানে 3D অ্যানিমেশন এবং VFX-এর ওপর নতুন কোর্স চালু করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যাতে রাজ্যের উদীয়মান ক্ষেত্রগুলোতে যুবসমাজের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য একটি উপযুক্ত ইকোসিস্টেম তৈরি হয়।

এদিকে সরকারের এই সমস্ত ঘোষণার পর প্রধান বিরোধী দলনেতার মেজাজেই বাজেট নিয়ে নিজেদের প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট করেন ঋতব্রত ব্যানার্জি। তবে তাঁর গলায় অন্ধ বিরোধিতার সুর শোনা যায়নি। ঋতব্রত বলেন, “আমরা অন্ধ বিরোধিতা করব না। সরকারি কর্মচারীদের ডিএ (DA) বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাচ্ছি, এটা খুব প্রয়োজন ছিল। পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের চা বাগানের জন্য যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেটাও ভালো। তবে বাজেটের বেশ কিছু বিষয় নিয়ে আমাদের আপত্তিও রয়েছে, যা আমরা বাজেট আলোচনার দিন বিধানসভার ভেতরেই বলব।”

তবে ঋতব্রত নরম সুর বজায় রাখলেও, বাজেটের কড়া সমালোচনা শোনা গেছে ‘আসল তৃণমূল’-এর মুখ্য সচেতক আখরুজ্জামানের গলায়। বাজেট নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি বলেন, “এই বাজেটে একটা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে পুরোপুরি কোণঠাসা করা হয়েছে। আগের সরকারের আমলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উন্নয়নের জন্য যেখানে ৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, এবার নতুন সরকার তা কমিয়ে মাত্র ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা করেছে। এটা পিছিয়ে পড়া মানুষের প্রতি এক্কেবারে বিমাতৃসুলভ আচরণ।”

সব মিলিয়ে, নতুন সরকারের প্রথম বাজেট পেশের দিনে একদিকে যেমন তথ্যপ্রযুক্তি, যুবসমাজের কর্মসংস্থান ও বরাদ্দের নতুন চমক ছিল, অন্যদিকে তেমনই বিরোধী শিবিরে মমতার নীরবতা এবং ঋতব্রতর ‘আসল তৃণমূল’-এর প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের লড়াইয়ে সরগরম রইল রাজ্য রাজনীতি।