আজকাল ওয়েবডেস্ক: সামাজিক বৈষম্যের কঠোর বাস্তব তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। তাই নিজের বিলাসবহুল জীবন, সফল কর্পোরেট চাকরি এবং আর্থিক নিরাপত্তা- সব ছেড়েছুড়ে সুইজারল্যান্ড থেকে ভারতে চলে এসেছেন স্যান্ড্রা লাভিয়ে গোজকোভিচ। বিদেশে নিজের বাসস্থান ছেড়ে ১৫ বছর আগেই এসেছেন পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন অঞ্চলে। সেখানকার প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত পড়ুয়াদের শিক্ষার আলো দেখাচ্ছেন তিনি। সম্প্রতি ইনস্টাগ্রামে স্যান্ড্রার এই জীবনকাহিনি বহু মানুষের মন ছুঁয়েছে।

 

জুরিখের মতো শহরে বেড়ে ওঠা স্যান্ড্রা সুন্দরবনে একটি অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় গড়ে তুলেছেন। সেখানে শুধু সুবিধাবঞ্চিত পড়ুয়াদের পড়াশোনার দিকে নজর দেওয়া হয় তা নয়। বরং বাল্যবিবাহ, মানব পাচার এবং গার্হস্থ্য হিংসা রুখতে এই বিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

 

সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথোপকথনে স্যান্ড্রা জানিয়েছেন, সুইজারল্যান্ড এবং দুবাইয়ের কর্পোরেট দুনিয়ায় সাফল্যের শিখরে থাকা স্যান্ড্রা পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা ঘুরতে গিয়ে তিনি চরম বৈষম্য লক্ষ্য করেছেন। তখন বহুবার নিজেদের জিজ্ঞেস করতেন, "আমি এত সুযোগ পাচ্ছি অথচ বাকিরা কেন বঞ্চিত?" এই প্রশ্নই তাঁর জীবন মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তাঁর উপলব্ধি হয়, সাফল্য তাঁকে স্বাচ্ছন্দ্য দিতে পারে কিন্তু জীবনের প্রকৃত অর্থ আদতে এখানে লুকিয়ে নেই। তারপরই তিনি চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং চলে আসেন ভারতে।

 

দেশে এসে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় কাজ করার সময় স্যান্ড্রা নিজেই একটি এনজিও গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন। তবে শহর কলকাতায় নয়। সুন্দরবনের এক প্রত্যন্ত দ্বীপে যেখানে বহু আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের বসবাস। সেখানে প্রথমে গিয়ে তিনি গ্রামবাসীদের সমস্যা মন দিয়ে শোনেন। শুরুতেই একজন বিদেশিকে বিশ্বাস করা গ্রামবাসীদের পক্ষে মুশকিল হয়। তা ছাড়া অনেক শিশুই বাবা-মায়ের সঙ্গে চিংড়ির মীন ধরার কাজে যুক্ত ছিল। তবে তাতে দমে যাননি স্যান্ড্রা।স্থানীয় একটি দলের সঙ্গে তিনি দিনের পর দিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার গুরুত্ব বোঝাতে থাকেন। ধীরে ধীরে যখন গুণগত শিক্ষা এবং পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা দেখে স্থানীয়দের তাঁর প্রতি ভরসা বাড়ে, তখন স্কুলের বাইরে পড়ুয়াদের ভর্তির লম্বা লাইন পড়ে যায়।

 

দীর্ঘ ১৫ বছর পরিশ্রমের পর এই স্কুলের উদ্যোগে এখন ৩০টি গ্রামের প্রায় ১০০ জন তরুণকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যাঁরা প্রায় ২০,০০০ শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছেন। এমনকি কিশোর-কিশোরীরা নিজেরাও উদ্যোগী হয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষকদের সহায়তায় বেশ কিছু বাল্যবিবাহ রুখে দিয়েছে বলে জানা গিয়েছে।

 

স্যান্ড্রা জানিয়েছেন, সুইজারল্যান্ড তাঁকে শৃঙ্খলা ও নিয়মানুবর্তিতা শিখিয়েছিল। কিন্তু ভারতে এসে তিনি এক অন্যরকম ছন্দ আবিষ্কার করেছেন। গ্রামের দীর্ঘ চা-পর্ব এবং ধীরস্থির জীবনযাত্রায় মানিয়ে নিতে শুরুতে তাঁর সমস্যা হলেও পরে তা-ই তাঁকে ধৈর্য ও সহনশীলতা শেখায়। তাঁর এই কাজকে তিনি মহান কিছু ভাবতে নারাজ। তাঁর বক্তব্য, "এরকম মানবিক কাজের মাধ্যমেই সমাজ বদলে দেওয়া সম্ভব।"