ইন্দ্রজিৎ সাহু: মকর সংক্রান্তির পুণ্যলগ্নে পশ্চিম-পূর্ব দুই মেদিনীপুরের সবং–পটাশপুরে আবারও প্রাণ ফিরে পেল ঐতিহ্যবাহী তুলসীচারা মেলা। প্রায় ৫০০ বছরেরও বেশি পুরোনো এই লোকমেলা শুধু একটি কেনাবেচার ক্ষেত্র নয়, বরং অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আবেগের ইতিহাস বহন করে চলেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। পটাশপুর ব্লকের গোকুলপুর গ্রামে নদীবক্ষে অবস্থিত তুলসী মন্দিরকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর পৌষ সংক্রান্তিতে এই মেলার সূচনা হয়। সেই তুলসী মন্দিরের নামানুসারেই মেলার নাম তুলসীচারা মেলা। প্রায় ১২ বিঘা জমি জুড়ে বিস্তৃত এই মেলা বর্তমানে ছয় দিন ধরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

এক সময় মাওবাদী আন্দোলন ও নিরাপত্তাজনিত কারণে এই ঐতিহ্যবাহী মেলা মাত্র এক দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন ও প্রশাসনিক উদ্যোগে বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে। ফলে আবারও আগের মতোই ছয় দিনের মেলায় ফিরেছে তুলসীচারা মেলা। স্বাভাবিকভাবেই বছরভর অপেক্ষায় থাকা মানুষের উচ্ছ্বাস চোখে পড়ার মতো। তুলসীচারা মেলার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো তুলো ব্যবসা। বহু দশক ধরেই তুলো ব্যবসায়ীরা এই মেলায় তাঁদের পসরা সাজিয়ে আসছেন। বিভিন্ন মান ও প্রকারের তুলো কেনাবেচার পাশাপাশি এখানে পাওয়া যায় ভাবসংগীত ও লোকসংগীতের জন্য ব্যবহৃত ঢোল, কাঁসর, খোল, করতাল-সহ নানান ধরনের বাদ্যযন্ত্র, যা গ্রামীণ সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে।

মেলার আনাচে-কানাচে সাজানো রয়েছে মাটির সামগ্রীর দোকান। সেখানে পাওয়া যাবে হাঁড়ি, কলসি, শিলনোড়া, ঝাঁটা, কুলো। পাশাপাশি বিক্রি হচ্ছে শীতকালীন সবজি, টাটকা মাছ। সবং–পটাশপুরের পরিচিত হস্তনির্মিত মাদুর, বাগমারির শঙ্খশিল্প, নানা ধরনের মিষ্টি ও কদমা মেলায় আলাদা মাত্রা যোগ করেছে।

এই মেলা শুধু ব্যবসা বা বিনোদনের জায়গা নয়, বরং মানুষের জীবনের আবেগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। বহু মানুষ যারা সারা বছর ভিন্‌রাজ্য বা অন্য জেলায় কর্মসূত্রে থাকেন, তাঁরা এই মেলার সময় বাড়ি ফেরেন। পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে মিলনমেলা যেন এই ক’দিনেই সম্পূর্ণতা পায়।

মেলা মানেই নতুন জামাকাপড়, সাজগোজ, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা আর সারাদিন ঘোরাঘুরি। কোন দিন কোন পোশাক পরা হবে, কেমন হেয়ারকাট করা হবে এই নিয়ে অনেক আগে থেকেই শুরু হয়ে যায় পরিকল্পনা। শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা, জমে থাকা কাজ সেরে ফেলা, ব্যাগ গুছনো সব মিলিয়ে তুলসীচারা মেলা মানেই এক আলাদা উত্তেজনা।

বছরের পর বছর এক নাগাড়ে কাজ করে চলা মানুষজন এই ক’দিনের জন্য কাজ থেকে ছুটি নিয়ে মেলায় এসে নিজেকে উজাড় করে দেন আনন্দে। তাই তো এলাকার মানুষের কাছে “তুলসীচারা মেলা আসছে” এই খবরটাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে সুখবর। সব মিলিয়ে তুলসীচারা মেলা আজও প্রমাণ করে, আধুনিকতার ভিড়েও লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের টান মানুষকে এক সুতোয় বেঁধে রাখে। পাঁচ শতাব্দীর ইতিহাস বুকে নিয়ে এই মেলা আজও সমানভাবে মানুষের জীবনে আনন্দ, আবেগ ও মিলনের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে।