আজকাল ওয়েবডেস্ক: নির্বাচন পর্বের নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় শুনানি ঘিরে ফের চাঞ্চল্য রাজ্য রাজনীতিতে। নৈহাটির বাসিন্দা ৬৩ বছরের বৃদ্ধা রত্না চক্রবর্তীর মৃত্যু ঘিরে শাসক-বিরোধী তরজার সুর সপ্তমে। অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের শুনানিতে হাজিরার চাপেই অসুস্থ ওই বৃদ্ধার মৃত্যু হয়েছে। আর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ফের শাসক দল কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে নির্বাচন কমিশনকে।
এই ইস্যুতেই আজ, বুধবার নির্বাচন কমিশনের দপ্তরে হাজির হন শাসকদলের পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধি দল। ছিলেন সাংসদ পার্থ ভৌমিক, মন্ত্রী শশী পাঁজা, বীরবাহা হাঁসদা-সহ তৃণমূল কংগ্রেসের পাঁচ সদস্য। প্রতিনিধি দল কমিশনের সঙ্গে দেখা করে মৃত ভোটার রত্না চক্রবর্তীর মৃত্যু নিয়ে কথা বলেন এবং পাশাপাশি ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা যুক্তিগত ত্রুটি নিয়েও আলোচনা করেন।
বৈঠক শেষে সাংসদ পার্থ ভৌমিক কড়া সুরে বলেন,'নির্বাচন কমিশন সাধারণ মানুষের সঙ্গে অনৈতিক আচরণ করছে। এটা কোনও ভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। এখন নরম ভাষায় বলছি—আর দু’দিন দেখব, তার পর প্রতিবাদের সুর আরও চড়বে।'
অমর্ত্য সেনকে নোটিস, ঝড় রাজ্য রাজনীতিতে-
বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার শুনানি পর্বে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনকে নোটিস পাঠানো ঘিরে রাজ্যজুড়ে শুরু হয় প্রবল বিতর্ক। নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে রীতিমতো ক্ষুব্ধ তৃণমূল কংগ্রেস। সভার মঞ্চ থেকেই কমিশনকে হুঁশিয়ারি দেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি। অভিষেক বলেন, 'হায় রে পোড়া কপাল! অমর্ত্য সেনকে হিয়ারিংয়ের নোটিস পাঠিয়েছে। অমর্ত্য সেন। ভারতবর্ষের জন্য নোবেল পুরস্কার জিতে এনেছেন। দেশের নাম যিনি বিশ্ববন্দিত করেছেন। যাঁর মাধ্যমে দেশকে চেনেন মানুষ, সেই অমর্ত্য সেনকে এসআইআর-এর নোটিস।' এই মন্তব্যের পরই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বঙ্গ রাজনীতি। শাসকদলের অভিযোগ, পরিকল্পিত ভাবেই সম্মানীয় ব্যক্তিদের নিশানা করা হচ্ছে।
যদিও অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক দপ্তর জানিয়েছে, অমর্ত্য সেনও আইনের চোখে একজন সাধারণ নাগরিক। ফর্ম ফিলাপের সময় ভুল হওয়ার কারণেই নোটিস পাঠানো হয়েছে। কমিশনের দাবি, অমর্ত্য সেনের ফর্ম অন্য একজন পূরণ করেছিলেন এবং সেখানেই বড় ভুল হয়। মায়ের সঙ্গে বয়সের পার্থক্য ১৫ বছরের কম দেখানো হওয়ায় সিস্টেম অনুযায়ী শুনানির নোটিস জারি হয়েছে।
কমিশন আরও জানায়, আজ বুধবার ৭ জানুয়ারিই নোটিশ পাঠানো হয়েছে। তবে অমর্ত্য সেনকে শুনানির জন্য কোথাও যেতে হবে না। তাঁর বাড়িতেই ERO ও AERO আধিকারিকরা গিয়ে শুনানি সম্পন্ন করবেন।
এই প্রসঙ্গে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল বলেন, 'অমর্ত্য সেন একজন সম্মানীয় ব্যক্তি। তাঁকে জেনে-বুঝে ইচ্ছাকৃত ভাবে নোটিস পাঠানো হয়নি। নিয়ম ও সিস্টেম মেনেই এই নোটিশ জারি হয়েছে।'
বয়স্ক ও অসুস্থদের শুনানি নিয়ে আধিকারিকদের কড়া বার্তা-
এদিকে, বয়স্ক, গুরুতর অসুস্থ বা বিশেষভাবে সক্ষম ভোটারদের বাড়িতে গিয়ে শুনানি করার নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও তাঁদের শুনানি কেন্দ্রে ডেকে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। উল্লেখ্য, ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ নির্বাচন কমিশন স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিল—এই শ্রেণির ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে হবে না, বাড়িতেই শুনানি হবে।
মনোজ আগরওয়াল কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, 'যদি প্রমাণ হয় যে কোনও BLO বা আধিকারিক ইচ্ছাকৃত ভাবে বয়স্ক বা অসুস্থ ভোটারদের কেন্দ্রে ডেকে পাঠাচ্ছেন, তবে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে মামলা পর্যন্ত করা হবে।'
ডোমিসাইল সার্টিফিকেট নিয়েও কমিশনের স্পষ্ট নির্দেশ-
ডোমিসাইল বা স্থায়ী আবাসিক শংসাপত্র ইস্যু নিয়েও কমিশন পুরনো নির্দেশিকা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। ১৯৯৯ সালের ২ নভেম্বরের সার্কুলার অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা ও প্যারামিলিটারি বাহিনীতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ডোমিসাইল সার্টিফিকেট ইস্যুর ক্ষমতা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের হাতে। আবেদনকারীর দীর্ঘদিনের বসবাস, সম্পত্তির মালিকানা, জন্মস্থান, শিক্ষাগত যোগ্যতা, DIB রিপোর্ট—সবকিছু খতিয়ে দেখেই শংসাপত্র দিতে হবে বলে জানিয়েছে কমিশন। সব মিলিয়ে ভোটার তালিকা সংশোধন, শুনানি প্রক্রিয়া ও নোটিশ বিতর্কে উত্তাল বাংলা। আগামী দিনে এই ইস্যুতে রাজনীতি আরও কতটা গরম হয়, এখন সেদিকেই নজর।
