আজকাল ওয়েবডেস্ক: চলছে এসআইআর প্রক্রিয়ার শুনানি পর্ব। যা ঘিরে আতঙ্কের আবহ জেলায় জেলায়। সেই আবহেই মর্মান্তিক দৃশ্য প্রকাশ্যে আসছে বারবার। এবার দেখা গেল, কয়েকজন বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা অ্যাম্বুল্যান্সে করে, স্ট্রেচারে শুয়ে শুনানি কেন্দ্রে পৌঁছলেন। 

ঘটনাস্থল নদিয়ায় চাপড়ার সিকরা কলোনি। স্ট্রেচারে শুয়ে শুনানি কেন্দ্রে পৌঁছলেন ৮০ বছরের এক বৃদ্ধা। পরিবারের তরফে জানানো হয়েছে, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম নেই তাঁর। যা ঘিরে গত কয়েক দিন ধরেই আতঙ্কে ভুগছিলেন তিনি। ওই বৃদ্ধা দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ। হাঁটার ক্ষমতা প্রায় নেই। তারপরও ওই বৃদ্ধকে এভাবে যেতে হল শুনানি কেন্দ্রে। পরিবারের তরফে আরও জানানো হয়েছে, বাড়িতে যাতে শুনানির ব্যবস্থা করা যায়, তার জন্য আবেদন জানানো হয়েছিল। কিন্তু সেই আবেদনে নাকি কর্ণপাত করেনি নির্বাচন কমিশন।

নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে বাড়ি বাড়ি গিয়ে এসআইআর ফর্ম পৌঁছে দিয়েছিলেন সংশ্লিষ্ট BLO-রা। সেই ফর্ম যথাযথভাবে পূরণ করে জমাও দেওয়া হয়েছিল। খসড়া ভোটার তালিকায় ওই বৃদ্ধার নাম থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ করেই তাঁর বাড়িতে পৌঁছে যায় শুনানির নোটিশ। নির্ধারিত দিন অনুযায়ী আজ ছিল তাঁর শুনানি চাপড়া বিডিও অফিসে। অসুস্থ অবস্থায় হাঁটাচলা করতে অক্ষম হওয়ায় পরিবারের লোকজন তাঁকে স্ট্রেচারে করে শুনানি কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। 

জানা গিয়েছে, ওই বৃদ্ধার নাম হাচিনা শেখ। তিনি নদিয়ার চাপড়া থানার শিক্ষা ৯৩ নম্বর বুথ কলোনির বাসিন্দা। পরিবারের সদস্যদের দাবি, এসআইআর-এর কাজ শুরু হওয়ার পর এলাকার অন্যান্য পরিবারের মতো তাঁদের বাড়িতেও ফর্ম দেওয়া হয়েছিল। সেই ফর্ম যথারীতি পূরণ করে জমা দেওয়ার পর খসড়া তালিকায় হাচিনা শেখের নাম ওঠে। তা সত্ত্বেও শুনানির নোটিশ পাঠানো হয়। পরিবারের আরও অভিযোগ, হাচিনা শেখ দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ। তবুও কোনও বিকল্প ব্যবস্থা না রেখে তাঁকে সশরীরে হাজির হতে বাধ্য করা হয়। 

ফলে উপায় না পেয়ে স্ট্রেচারে করেই তাঁকে শুনানি কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়। জানা গিয়েছে, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর নাম নেই, সেই কারণেই শুনানির নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনাকে ঘিরে এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। একই সঙ্গে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। 

তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে তীব্র সুর চড়ানো হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি মহিদুল মোল্লা অভিযোগ করেন, কমিশনের গাফিলতির কারণেই সাধারণ মানুষকে এমন অমানবিক হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, আশির ঊর্ধ্ব এই বৃদ্ধার কাছে যে সমস্ত নথি রয়েছে, সেই নথি নাকি নির্বাচন কমিশনের কাছেই নেই। মহিদুল মোল্লার আরও দাবি, হাচিনা শেখ ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ১৯৫৬ সালের ভোটার তালিকাতেও তাঁর নাম রয়েছে। তাঁর মতে, এই ঘটনা সম্পূর্ণভাবে বিজেপির চক্রান্ত এবং পরিকল্পিতভাবে ভোটারদের হয়রানি করা হচ্ছে।

আরেকটি ঘটনা ঘটেছে মুর্শিদাবাদের কান্দিতে। সেখানেও অ্যাম্বুল্যান্সে করে শুনানি কেন্দ্রে পৌঁছলেন দুই বৃদ্ধা। তাঁদের একজনের বয়স ৮০ আর অন্যজনের বয়স ৭২ বছর। দুই পরিবারের তরফেই কমিশনের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ জানানো হয়েছে। 

২০০২-এর ভোটার তালিকায় নাম থাকলেও সেখানে কিছু ভুল থাকায় শুক্রবার কান্দি ব্লকে শুনানির জন্য সশরীরে হাজির হতে বলা হয়েছিল মহলন্দী গ্রামের এমন কয়েকজন বাসিন্দাদের, যাঁদের বিছানা থেকে ওঠার ক্ষমতা নেই। কান্দির তৃণমূল বিধায়ক তথা তৃণমূল কংগ্রেসের বহরমপুর-মুর্শিদাবাদ সাংগঠনিক জেলা সভাপতি অপূর্ব সরকারের উদ্যোগে শুনানি প্রক্রিয়ায় হাজিরা দিতে তৃণমূল দলের উদ্যোগে অ্যাম্বুল্যান্স করে কান্দি ব্লক অফিসে যান মাকসুদা বেওয়া, আসিয়া বিবি সহ আরও এমন কিছু বয়স্ক মানুষ যাঁদের অন্য কারও সাহায্য ছাড়া চলাফেরা করার ক্ষমতাই নেই। 

এর পাশাপাশি শুনানিতে হাজির হয়ে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে কান্দি ব্লক অফিসে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েন কোহিনুর বিবি নামের সন্তান সম্ভাবনা এক মহিলা। পরে অসুস্থ কোহিনুর বিবিকে তৃণমূল কংগ্রেসের তরফ থেকেই কান্দি মহকুমা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করানো হয়। 

অপূর্ব সরকার বলেন, "কান্দির মহালন্দি গ্রামে বংশপরম্পরায় বহু পরিবার দীর্ঘদিন ধরে বাস করছেন। কিন্তু সেখানকার বেশ কিছু মানুষকে শুক্রবার এসআইআর-এর শুনানির জন্য ডাকা হয়েছিল। আসিয়া বিবি, মাকসুদা বেওয়ার মতো বেশ কয়েকজন মহিলার  চলাফেরা করার কোনও ক্ষমতাই নেই। নির্বাচন কমিশন সেসব না দেখেই মানুষকে এসআইআর-এর নামে হয়রানি করছে। তাঁদেরকে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড় করিয়ে রাখছে। এসআইআর-এর কারণে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে।"
 
অন্যদিকে অ্যাম্বুল্যান্সে শুয়ে এসআইআর-এর শুনানিতে হাজির হওয়া আসিয়া বিবি বলেন, "ভোটার তালিকায় আমার নামের বানানের ছোট্ট একটু ভুল রয়েছে। আমি হাঁটতেও পারি না। সোজা হয়ে দাঁড়ালে মাথা ঘুরে পড়ে যাই। তাও আমাকে ডেকে পাঠিয়েছে। এখানে আসতে খুব কষ্ট হয়েছে। তৃণমূলের নেতারা সাহায্য করেছিল বলে অ্যাম্বুল্যান্স করে আসতে পেরেছি।"
 
অসুস্থ মাকসুদা বেওয়া বলেন, "আমি বিছানা থেকেই উঠতে পারি না, খুবই অসুস্থ। তাও এসআইআর-এর শুনানির জন্য এখানে আমাকে আসতে হয়েছে। অনেকেই বলেছে ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে দেশ থেকে চলে যেতে হবে , তাই শুনানিতে এসেছি।"

দিন দুই আগেই অক্সিজেনের নল গুঁজে শুনানিতে গিয়েছিলেন এক বৃদ্ধ। ঘটনাটি ঘটেছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগরে। মৃত বৃদ্ধের নাম, নাজিতুল মোল্লার। ৬৮ বছরের ওই বৃদ্ধ জয়নগর দুই নম্বর ব্লকের গড়দেওয়ানি গ্রাম পঞ্চায়েতের উত্তর ঠাকুরেরচক এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। পরিবারের অভিযোগ, শুনানি থেকে ফেরার পর আতঙ্কে অসুস্থ হয়েই বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। 

বৃদ্ধের পরিবার আরও জানিয়েছে, এসআইআর আতঙ্কে অসুস্থ হওয়ার পরেই হাসপাতালে ভর্তি করতে হয় তাঁকে। এরই মধ্যে এসআইআর-এর শুনানির ডাক আসে তাঁর। হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে তাঁকে শুনানির জন্য নিয়ে যাওয়া হয়। অক্সিজেনের নল গুঁজে শুনানিতে হাজিরা দিয়েছিলেন। 

শুনানি শেষে ফের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মৃত্যু হয় তাঁর। এসআইআর নিয়ে দুশ্চিন্তায় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তিনি। ২০০২-এর ভোটার তালিকায় নাম না দেখে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। এর পাশাপাশি শুনানির ধকল সহ্য করতে পারেননি বৃদ্ধ।