আজকাল ওয়েবডেস্ক: মাটির তলা থেকে উদ্ধার বিপুল পরিমাণ ওষুধ। ঘটনাটি ঘটেছে ডায়মন্ড হারবার বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত ডায়মন্ড হারবার ২ নম্বর ব্লকের সরিষা পঞ্চায়েত এলাকায়। এই এলাকায় হিঙ্গছেবেরিয়া গ্রামে কয়েক কোটি টাকার সেবাশ্রয় ক্যাম্পের ওষুধ মাটির তলা থেকে উদ্ধারের অভিযোগ ঘিরে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। 

 

বিজেপির অভিযোগ, সাধারণ মানুষের চিকিৎসার জন্য আনা কোটি কোটি টাকার ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী গোপনে মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়েছিল। যদিও এই অভিযোগ নিয়ে এখনও পর্যন্ত প্রশাসন বা তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া সামনে আসেনি। 

 

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, গোপন সূত্রে খবর পেয়ে ডায়মন্ড হারবার ২ নম্বর বিজেপি মণ্ডলের সভাপতি উত্তম বাগের নেতৃত্বে বিজেপি কর্মী-সমর্থকেরা সরিষার হিঙ্গছেবেরিয়া এলাকায় অভিযান চালান। অভিযোগ, নির্দিষ্ট একটি জায়গায় মাটি খুঁড়তেই বেরিয়ে আসে বিপুল পরিমাণ ওষুধ, স্বাস্থ্য পরিষেবার বিভিন্ন সামগ্রী, এমনকি অক্সিজেন সিলিন্ডারও। মুহূর্তের মধ্যে ঘটনাস্থলে ভিড় জমাতে শুরু করেন এলাকার মানুষ। বহু মানুষ মোবাইলে সেই দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেন। এলাকাজুড়ে শুরু হয় তুমুল চর্চা। 

 

বিজেপির দাবি, উদ্ধার হওয়া ওষুধ ও সামগ্রীগুলি তথাকথিত “সেবাশ্রয় ক্যাম্প”-এ ব্যবহারের জন্য আনা হয়েছিল। উল্লেখ্য, ডায়মন্ড হারবার, বজবজ এবং ফলতা-সহ বিভিন্ন এলাকায় সম্প্রতি সেবাশ্রয় ক্যাম্প পরিচালনা করা হয়েছিল। বিজেপির অভিযোগ, সেই ক্যাম্পগুলির দায়িত্বে ছিলেন ফলতার প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা জাহাঙ্গীর খান এবং ডায়মন্ড হারবারের পর্যবেক্ষক তথা মগরাহাট পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক শামীম আহমেদের ঘনিষ্ঠ নেতৃত্ব। যদিও এই দাবির স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। 

 

এই ঘটনাকে সামনে এনে বিজেপি সরাসরি তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বড়সড় দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি, সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দ চিকিৎসা সামগ্রী ও ওষুধ গোপনে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, যদি এই ওষুধ মানুষের চিকিৎসার জন্য বরাদ্দ হয়ে থাকে, তাহলে তা মাটির নিচে কীভাবে গেল? কেন তা সংরক্ষণ না করে লুকিয়ে রাখা হল? এই প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক মহলে। 

 

অন্যদিকে, এই ঘটনার জেরে রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকেও কাঠগড়ায় তুলছে বিজেপি। তাদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে সাধারণ মানুষ প্রতিদিন ওষুধের অভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন নিয়ে বাইরে থেকে দামি ওষুধ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন রোগীরা। দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত মানুষের পক্ষে সেই ব্যয়ভার বহন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ছে। সেই পরিস্থিতিতে কয়েক কোটি টাকার ওষুধ মাটির নিচে পড়ে থাকার অভিযোগ সামনে আসায় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। 

 

ডায়মন্ড হারবার ২ নম্বর বিজেপি মণ্ডলের সভাপতি উত্তম বাগ এই ঘটনাকে “তৃণমূল আমলের স্বাস্থ্য দুর্নীতির জ্বলন্ত প্রমাণ” বলে দাবি করেছেন। তাঁর কথায়, “একদিকে মানুষ হাসপাতালে ওষুধ পাচ্ছে না, সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গেলে বলা হচ্ছে ওষুধ নেই। অন্যদিকে কোটি কোটি টাকার ওষুধ মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। এটা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। এর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার।” 

 

উত্তম বাগ আরও দাবি করেন, শুধুমাত্র ওষুধ নয়, উদ্ধার হয়েছে অক্সিজেন সিলিন্ডার-সহ একাধিক স্বাস্থ্য সরঞ্জাম। তাঁর বক্তব্য, “যদি প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে, তাহলে আরও বড় মাথাদের নাম সামনে আসবে। কার নির্দেশে এই ওষুধ মাটির নিচে রাখা হয়েছিল, কারা এর সঙ্গে জড়িত—সব সামনে আসা উচিত। আমরা চাই দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”

 

বিজেপির অভিযোগের জেরে সরিষা এলাকায় রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশও ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি তুলেছেন। তাঁদের প্রশ্ন, এত বিপুল পরিমাণ ওষুধ কীভাবে এখানে এল? সরকারি নথিতে সেই ওষুধের হিসাব রয়েছে কি না? এবং সেগুলি আদৌ সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দ ছিল কিনা—তা প্রশাসনের স্পষ্ট করা উচিত। 

 

যদিও এখনও পর্যন্ত প্রশাসনের তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর পরিমাণ বা প্রকৃতি নিয়ে কিছু জানানো হয়নি। পুলিশ বা স্বাস্থ্য দপ্তরের তরফেও এই বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য মেলেনি। ফলে বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা থেকেই যাচ্ছে। তবে রাজনৈতিক মহলের মতে, অভিযোগ যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে তা ডায়মন্ড হারবার মহকুমার সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় বিতর্কে পরিণত হতে পারে। 

 

ঘটনাকে কেন্দ্র করে ডায়মন্ড হারবারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন মোড় নিতে পারে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ। একদিকে বিজেপি দুর্নীতির অভিযোগ তুলে আন্দোলনের পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে তৃণমূল কী অবস্থান নেয়, সেদিকেও নজর রয়েছে রাজনৈতিক মহলের। এখন দেখার, প্রশাসনিক তদন্ত আদৌ শুরু হয় কি না এবং শুরু হলে সেই তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে।