গোপাল সাহা: দীর্ঘ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ভারতে অবশেষে ডেঙ্গুর টিকাকরণে কেন্দ্রীয় সরকারের সবুজ সংকেত মিলল। ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে ‘কিউডেঙ্গা’ নামের একটি নতুন ভ্যাকসিনকে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই পদক্ষেপকে দেশে ডেঙ্গু মোকাবিলার ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী অধ্যায় বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

তবে নতুন এই টিকা বাজারে আসতেই সাধারণ মানুষের মনে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন ও কৌতুহল। এর আগে বিদেশে বহুল প্রচলিত ‘ডেংভ্যাক্সিয়া’ টিকা নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কই এই উদ্বেগের মূল কারণ।

ফরাসি ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থা সানোফি-র তৈরি ‘ডেংভ্যাক্সিয়া’ মেক্সিকো, ব্রাজিল, ফিলিপাইনস কিংবা আমেরিকার পুয়ের্তো রিকোর মতো ডেঙ্গু-প্রবণ দেশে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। তবে গবেষণায় দেখা যায়, এই টিকার ক্ষেত্রে একটি বড় ঝুঁকিপূর্ণ দিক ছিল। যাঁদের জীবনে আগে কখনও ডেঙ্গু হয়নি (সেরোনেগেটিভ ব্যক্তি), তাঁরা যদি এই টিকা নেন, তবে ভবিষ্যতে তাঁদের মারাত্মক বা জটিল ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যেত। একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় 'অ্যান্টিবডি-ডিপেনডেন্ট এনহান্সমেন্ট'।

এই ঝুঁকির কারণে টিকা দেওয়ার আগে রক্ত পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হতো যে ব্যক্তির আগে ডেঙ্গু হয়েছিল কি না। জটিলতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা মাথায় রেখে শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি স্থানে এই টিকার ব্যবহার তুলে নেওয়া হয়।

জাপানের ‘টাকেডা’ কোম্পানির তৈরি ‘কিউডেঙ্গা’ ভ্যাকসিনটি পুরোনো টিকার সমস্যাগুলোকে মাথায় রেখেই প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত করে তৈরি করা হয়েছে।

কিউডেঙ্গার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এর জন্য রক্ত পরীক্ষা করে আগে ডেঙ্গু হয়েছে কি না তা জানার প্রয়োজন নেই। যিনি আগে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন বা যিনি হননি- উভয়েই এই টিকা নিতে পারেন।

ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধে এই টিকার কার্যকারিতা প্রায় ৮০ শতাংশ। আর ডেঙ্গুর জটিল রূপ রুখে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ঠেকাতে এটি প্রায় ৯৫ শতাংশ কার্যকর। উপসর্গহীন ডেঙ্গুর জটিলতা কমাতেও এটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ।

৪ থেকে ৬০ বছর বয়সী যে কেউ এই টিকা নিতে পারেন। তিন মাসের ব্যবধানে (০ এবং ৩ মাস) ত্বকের নিচে এর মোট দুটি ডোজ নিতে হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদনপ্রাপ্ত এই টিকার ২ কোটি ৪০ লক্ষেরও বেশি ডোজ ইতিমধ্যে বিশ্বজুড়ে দেওয়া হয়েছে এবং এর নিরাপত্তাজনিত রেকর্ড অত্যন্ত সন্তোষজনক।

সব টিকার মতোই কিউডেঙ্গার ক্ষেত্রেও কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। গর্ভবতী নারী, স্তন্যদানকারী মা এবং মারাত্মকভাবে অনাক্রম্যতাহীন (ইমিউনো-কমপ্রোমাইজড) ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই টিকা দেওয়া নিষেধ। এ ছাড়া তীব্র জ্বর চলাকালীন টিকা নেওয়া স্থগিত রাখা উচিত। ইনজেকশনের জায়গায় সামান্য ব্যথা, হালকা জ্বর বা মাথাব্যথার মতো স্বাভাবিক কিছু উপসর্গ দেখা যেতে পারে, যা দু-এক দিনেই সেরে যায়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কিউডেঙ্গা একটি অত্যন্ত কার্যকরী অস্ত্র হলেও এটি শতভাগ সুরক্ষা নিশ্চিত করে না। তাছাড়া এই টিকা এখনও দেশের ‘জাতীয় টিকাকরণ কর্মসূচি’র অন্তর্ভুক্ত হয়নি, তাই এটি নিতে হলে নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যিক।

স্বাস্থ্য দপ্তরের মতে, শুধু টিকার ওপর ভরসা করলেই চলবে না। 'এল নিনো' বা আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে থেমে থেমে বৃষ্টি হলে জমা জলে ডেঙ্গুর মশা দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। তাই বাড়ির চারপাশে জল জমতে না দেওয়া, সপ্তাহে একদিন জল জমানোর পাত্র পরিষ্কার করা, মশারি ও মশা তাড়ানোর মলম ব্যবহার করার মতো প্রাথমিক সচেতনতাগুলি মেনে চলা এখনও সমান গুরুত্বপূর্ণ।