আজকাল ওয়েবডেস্ক: 'হাট বসেছে শুক্রবারে বক্‌শিগঞ্জে পদ্মাপারে জিনিস-পত্ৰ জুটিয়ে এনে গ্রামের মানুষ বেচে কেনে'। পদ্মা পারের বক্‌শিগঞ্জের মতো শুধুমাত্র শুক্রবার নয়, এখানে হাট বসে ফসল তোলার মরসুমে। আর অভিনব এই হাটের মূল আকর্ষণই হলো বিনিময় প্রথা। দেশবাসী যখন ডিজিটাল ভারতের স্বপ্নে বিভোর, সেইসময় এই হাটে প্রাচীন 'বিনিময়  প্রথা'কে এখনও বাঁচিয়ে রেখেছেন মুর্শিদাবাদের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী কিছু গ্রামের লোকজন। 

এখানকার মানুষদের এই বিকিকিনি প্রথা দেখলে যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে কবিগুরুর  'হাট' কবিতার পংক্তিগুলি। 'জিনিসপত্র জুটিয়ে এনে, গ্রামের মানুষ বেচে কেনে।' তবে এখানে জিনিসপত্র নয়, মাঠের ফসল দিয়েই কেনাবেচা সারেন মুর্শিদাবাদের রাণীনগর, রানিতলা থেকে শুরু করে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জলঙ্গি ব্লকের বিভিন্ন গ্রামের বাসিন্দারা। চির পরিচিত হাটের থেকে এই হাটের ছবি কিন্তু কিছুটা  আলাদা। এখানে পয়সার বিনিময় নয়, বরং বিনিময় প্রথার মাধ্যমে চলে কেনাবেচা। মাঠের কৃষকরা সারাদিনের কাজের মধ্যে প্রচন্ড খিদে পেলেই তাঁরা নিজেদের মাঠের ক্ষেতের ফসলের বিনিময়ে পথের পাশে থাকা দোকানদারদের কাছ থেকে কিনে নেন জিলিপি, সিঙ্গারা, তেলে ভাজা বা অন্যান্য খাদ্য সামগ্রী। মূলত শীতকাল থেকে শুরু করে চৈত্র মাস পর্যন্ত ফসল ওঠার মরসুমে অভিনব এই হাটের রমরমা চোখে পড়ে রানীনগরের নির্মলচর, জলঙ্গির কাঁকরামারি, টলটলি, রানীনগরের মোহনগঞ্জ, ঘোষঘাট, গঙ্গা পুজোর ঘাট-সহ আশেপাশের এলাকায়। 

গ্রামীণ সংস্কৃতি ও জীবন যাত্রার এক অপূর্ব চালচিত্র ধরা পড়ে এখানে। গ্রাম বাংলার এই সহজ সরল মানুষগুলো এখনও পর্যন্ত ডিজিটাল কেনাকাটায় অভ্যস্ত নয়। এমনকি নগদ টাকার বদলে এদের কাছে এখনও এই বিনিময় প্রথাই সহজসাধ্য। তাই মাঠে ফসল কাটতে কাটতে হঠাৎ খিদে পেলে সেই কাটা ফসল নিয়েই হাজির হন দোকানদারের কাছে। আর দোকানদাররাও সেই ফসলের বিনিময়ে ঝুলি থেকে বের করে দেন কৃষকদের জন্য খাদ্যসামগ্রী। বেচাকেনার এই প্রাচীন রীতি শুধুমাত্র যে গ্রামীণ জীবনযাত্রার সরলতাকে ফুটিয়ে তোলে তা নয়, ডিজিটাইজেশনের যুগেও বিনিময় প্রথার মতো একটি প্রাচীন রীতি যে এখনও প্রচলিত তা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন।

মনসুর মিঞাঁ নামে এক দোকানদার বলেন, "অনলাইন লেনদেনের বিষয়টা এখনও আমাদের কাছে অজানা। শুনেছি তাতে অনেক ঝামেলাও রয়েছে। কিন্তু ফসলের বিনিময়ে এইভাবে খাদ্যসামগ্রী দেওয়া খুবই সহজ এবং লাভজনক। তাই আমার মতো বিভিন্ন ছোটখাটো দোকানদাররা ফসল তোলার মরসুমে চলে আসি এখানে। আমাদের খাদ্য সামগ্রীর পরিবর্তে নিয়ে যাই মাঠের ফসল।" 
আখতার আলি নামে এক কৃষক বলেন, "মাঠে ফসল কাটতে কাটতে খিদে পেয়ে গেলে সেই ফসলের কিছু অংশ নিয়েই আমরা হাজির হয়ে যাই দোকানদারের কাছে।  নগদ পয়সা আমাদের দিতে হয় না। বরং আমাদের মাঠের ফসলের বিনিময়ে আমরা পেয়ে যাই রকমারি মুখরোচক খাবার।"

জলঙ্গির তৃণমূল বিধায়ক আব্দুর রাজ্জাক বলেন ,"চাষিদের মাঠে উৎপন্ন ধান বা অন্য ফসল উদ্বৃত্ত হলে অনেক সময় তাঁরা এইভাবে বিনিময় প্রথার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় খাবার সংগ্রহ করে নেন বলে আমি শুনেছি। আজকের আধুনিক যুগে বিষয়টির মধ্যে যথেষ্ট অভিনবত্ব রয়েছে।"