আজকাল ওয়েবডেস্ক: রাজ্যে প্রথমবারের জন্য ক্ষমতায় এসেই মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরবাসীর জন্য সুখবর শোনালেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেট পেশ করতে গিয়ে সোমবার রাজ্যের অর্থমন্ত্রী মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরকে পৃথক জেলা হিসেবে যেমন ঘোষণা করেছেন তার পাশাপাশি জঙ্গিপুরে গঙ্গা ভাঙন রোধের জন্য রাজ্য বাজেটে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। বাজেট পেশের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, মুর্শিদাবাদ জেলার ফরাক্কা, সামশেরগঞ্জ এবং সংলগ্ন মালদার বৈষ্ণবনগর এলাকায় গঙ্গার ভাঙন প্রতিরোধের জন্য বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। এই প্রকল্পে ৫০ শতাংশ অর্থ কেন্দ্রীয় সরকার দেবে এবং বাকি অর্থ রাজ্য সরকার বরাদ্দ করবে।
প্রসঙ্গত, গত কয়েক বছরে মুর্শিদাবাদ জেলার সামশেরগঞ্জ ব্লকে গঙ্গা নদীর ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গঙ্গা নদীর ভাঙনে সামশেরগঞ্জের শিবপুর, চাচন্ড, প্রতাপগঞ্জ, ধানঘড়া-সহ বহু এলাকার কয়েক হাজার বাড়ি গঙ্গা নদীর গর্ভে তলিয়ে গিয়েছে। নদীতে বিলীন হয়ে গিয়েছে কয়েক হাজার একর জমি।
রাজ্যের প্রাক্তন তৃণমূল সরকার মুর্শিদাবাদে ভাঙন প্রতিরোধের জন্য কয়েকশো কোটি টাকা বরাদ্দ করলেও সেই টাকার বেশিরভাগ অংশই নেতা-নেত্রীদের পকেটে গিয়েছে বলে বারে বারে অভিযোগ উঠেছে। তার ফলে সামশেরগঞ্জের মানুষের দুর্ভোগ বিন্দুমাত্র কমেনি। ফের বর্ষাকাল চলে আসায় সামশেরগঞ্জে নতুন করে গঙ্গা নদীর ভাঙন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। কিন্তু তারই মধ্যে রাজ্য সরকার ভাঙন প্রতিরোধে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করায় কিছুটা আশার আলো দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সামশেরগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক নুর আলম বলেন, “সম্প্রতি মালদা জেলায় মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে প্রশাসনিক বৈঠকে আমরা মুর্শিদাবাদে নদী ভাঙনের সমস্যা তাঁকে লিখিতভাবে জানিয়েছিলাম। এখানে নদী ভাঙন সমস্যা এতটাই বড় যে এর মোকাবিলা করতে হলে কেন্দ্রীয় সেচ মন্ত্রকের সাহায্য দরকার। কেবলমাত্র বালির বস্তা ফেলে সামশেরগঞ্জের গঙ্গা নদীর ভাঙন আটকানো সম্ভব নয়।”
তিনি বলেন, “রাজ্যে বিজেপি সরকার রয়েছে। আমরা আশা করব কেন্দ্রের সঙ্গে সমন্বয় রেখে রাজ্য সরকার মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরের বিভিন্ন এলাকায় গঙ্গা নদীর ভাঙন ঠেকানোর জন্য স্থায়ী কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সামশেরগঞ্জের কয়েকটি জায়গায় জাতীয় সড়ক থেকে গঙ্গা নদীর দূরত্ব এখন দেড় কিলোমিটারের কম হয়ে গিয়েছে। যে হারে গঙ্গা নদীর ভাঙন চলছে তাতে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে জাতীয় সড়ক নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে দক্ষিণবঙ্গের সঙ্গে উত্তরবঙ্গের যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। তবে রাজ্য সরকার উদ্যোগে নিয়ে ভাঙন প্রতিরোধে নতুন করে অর্থ বরাদ্দ করায় আমরা খুশি।”
জঙ্গিপুরকে পৃথক জেলা ঘোষণা করার জন্য বিজেপি সরকারকে সাধুবাদ জানান তৃণমূল বিধায়ক। তিনি বলেন, “জঙ্গিপুরের বহু মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল ‘জঙ্গিপুর জেলা’। ফরাক্কার মানুষকে প্রশাসনিক কাজের জন্য এখনও বহরমপুর যেতে হয়। কিন্তু নতুন জেলা তৈরি হলে সাধারণ মানুষ প্রশাসনিক কাজ জঙ্গিপুর থেকেই করতে পারবেন।”
‘উত্তর মুর্শিদাবাদ জেলা সংগ্রাম সমিতি’র সভাপতি হাসানুজ্জামান বাপ্পা বলেন, “২০১৭ সাল থেকে আমরা মুর্শিদাবাদ জেলা ভাগের জন্য আন্দোলন করছি। ফরাক্কা থেকে শুরু করে সাগরদিঘি হয়ে নবগ্রাম, লালগোলা পর্যন্ত ব্লকগুলিকে নিয়ে নতুন জঙ্গিপুর জেলা তৈরি হওয়া দরকার ছিল। আমরা খুশি বিজেপি রাজ্য সরকারের ক্ষমতায় এসে আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে নিয়েছে। জঙ্গিপুর নতুন জেলা হাওয়ায় এখানে জেলা হাসপাতাল এবং মেডিকেল কলেজ তৈরি হবে।” তিনি বলেন, “জঙ্গিপুর শহরের নতুন প্রশাসনিক ভবন তৈরি হওয়ায় সেখানে প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থানও হবে।”
জঙ্গিপুরের বিজেপি বিধায়ক চিত্ত মুখার্জি বলেন, “আমার সরকারের কাছে একাধিক দাবি ছিল। তার মধ্যে আপাতত তিনটে দাবি এই বাজেটে পূরণ হয়েছে। রঘুনাথগঞ্জ শহরে মেয়েদের জন্য গার্লস কলেজ তৈরির দাবি সরকার মেনে নিয়েছে এই বাজেটে।” তিনি বলেন, “জঙ্গিপুরে গঙ্গা ভাঙন প্রতিরোধের রাজ্য সরকার আপাতত ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে, পরে আরও টাকা বরাদ্দ হবে। গঙ্গা নদীর ভাঙনে জঙ্গিপুর শহরের কয়টি জায়গায় নদীর দুই পাড়ের বেশ কিছুটা অংশ নদী গর্ভে তলিয়ে যাচ্ছিল।”
বিজেপি বিধায়ক আরও বলেন, “জঙ্গিপুর জেলা হিসেবে ভাগ হয়ে যাওয়ায় প্রশাসনিক কাজ গতি পাবে। তবে আমরা রাজ্য সরকারের কাছে দাবি রাখব মুর্শিদাবাদ ভেঙে নতুন জেলা তৈরি হচ্ছে, তাই জেলা দু’টির নাম উত্তর এবং দক্ষিণ মুর্শিদাবাদ জেলা রাখা হোক। আমরা অনুমান করছি বর্তমানে জঙ্গিপুর পুলিশ জেলার অন্তর্গত যে থানা বা ব্লকগুলো রয়েছে সেগুলো নিয়েই নতুন জঙ্গিপুর জেলা তৈরি হবে।”
ফরাক্কার প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক মনিরুল ইসলাম বলেন, “মুর্শিদাবাদ জেলায় প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষের বাস। জঙ্গিপুরকে নতুন জেলা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ায় সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এখানকার মানুষের নিরাপত্তা এবং সুরক্ষা নিয়ে প্রশাসন আরও ভাল পদক্ষেপ করতে পারবে বলে আমরা আশাবাদী। জঙ্গিপুরে গঙ্গা ভাঙন নিয়ে অর্থ বরাদ্দ হওয়ায় সেখানকার মানুষের সমস্যা কিছুটা মিটতে চলেছে। তবে এই খাতে আরও কিছু অর্থ বরাদ্দ হলে আমরা খুশি হতাম।” তিনি বলেন, “রাজ্যে বিজেপি সরকার প্রথমবার ক্ষমতায় এসে যেভাবে জনমুখী বাজেট করেছে তাতে আমি খুব খুশি।”
















