মিল্টন সেন, হুগলি, ১৪ জানুয়ারি: হুগলিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সভা ঘিরে আবারও রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে নানান জল্পনা। ডানলপ শ্রমিকদের স্পষ্ট বক্তব্য এটা রাজনৈতিক ‘‌গিমিক’‌ ছাড়া কিছু নয়। শ্রমিক মহলের প্রশ্ন, আগেও তো ডানলপ ময়দানে সভা করে গেছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী। কারখানা খুলবে। তাঁরা স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাই সভায় যোগ দিয়েছিলেন। শুনেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘ বক্তব্য। মোদির ভাষণে নানান সময় তাঁদের কানে এসেছে রাজ্যের নানান খামতির অভিযোগ। কিন্তু বক্তব্যে কোথাও বন্ধ ডানলপ কারখানা প্রসঙ্গে একটাও শব্দ খরচ করতে দেখা যায়নি প্রধানমন্ত্রীকে। হতাশ হয়েছিল শ্রমিক মহল। তাই বর্তমানে শ্রমিক মহলের বদ্ধমূল ধারণা, শিল্প করার সদিচ্ছা নরেন্দ্র মোদির নেই। 

আগামী ১৮ জানুয়ারি সিঙ্গুরে সভা করবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সভাকে ঘিরে ক্রমশ রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে। সভার প্রস্তুতি খতিয়ে দেখা এবং সিঙ্গুরের মানুষকে আমন্ত্রণ জানাতে ঘনঘন সিঙ্গুরে আসছেন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার সহ বিজেপি নেতৃত্ব। তবে এই সফর ও বিজেপির ‘আশার বার্তা’ নিয়ে কড়া সমালোচনায় মুখর হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। প্রধানমন্ত্রীর সভা প্রসঙ্গে হুগলি–শ্রীরামপুর সাংগঠনিক জেলা সভাপতি তৃণমূল কংগ্রেস সভাপতি অরিন্দম গুইন বলেছেন, ‘‌মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি কখনওই শিল্পের বিরোধিতা করেননি। বরং তিনি বলেছেন, যারা স্বেচ্ছায় জমি দিতে চান, তাদের জমিতে শিল্প হোক। কিন্তু যাদের জমিই জীবিকার একমাত্র অবলম্বন, তাদের জমি অবশ্যই ফেরত দিতে হবে। তিন ফসলি জমিতে টাটা কারখানা গড়ার পরিকল্পনাকে সুপ্রিম কোর্ট খারিজ করেছিল। দেশের সর্বোচ্চ আদালত টাটা গোষ্ঠীর আবেদন খারিজ করে আন্দোলনের পক্ষেই রায় দিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী যদি সেই রায়কে ভুল বলে ঘোষণা করেন, তবেই মানুষ বিশ্বাস করবে তিনি কৃষকদের পাশে আছেন। তাই, সেই আন্দোলন যে সঠিক ছিল–এ কথা প্রধানমন্ত্রীকে সিঙ্গুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে স্বীকার করতে হবে।’‌ তিনি আরও বলেছেন, সিঙ্গুরে আমন্ত্রণপত্র বিলি করার বদলে বিজেপির উচিত এসআইআর করে কতজন বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাকে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেই তালিকা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাতে তুলে দেওয়া। তাঁর দাবি, প্রধানমন্ত্রী সভামঞ্চ থেকেই সেই তালিকা জনসমক্ষে প্রকাশ করুক। নির্বাচন কমিশন ও বিজেপির ব্যর্থতার কারণে সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়ছেন। তৃণমূল কংগ্রেস সাধারণ মানুষের এই হয়রানি নিয়ে আন্দোলনে নামবে। 

এদিকে ২৬ এর বিধানসভা নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে ততই চড়ছে রাজনৈতিক পারদ। বিধানসভা ভোটের আগে প্রধানমন্ত্রীর সিঙ্গুরের সভা ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে জোর জল্পনা। পাঁচ বছর আগে ২০২১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি হুগলির সাহাগঞ্জের ডানলপ মাঠে সভা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তখন সেই সভা ডানলপ শ্রমিকদের কাছে ছিল যথেষ্টই তাৎপর্যপূর্ণ। দেশের প্রথম টায়ার উৎপাদক সংস্থার গেটে সাসপেনশন অফ ওয়ার্ক এর নোটিশ ঝুলেছিল ২০১১ সালের ৮ অক্টোবর। ভেঙে গেছিল হাজার হাজার শ্রমিকের স্বপ্ন। তাঁর দশ বছর পর ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ডানলপের মাঠে সভা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সভা ঘিরে আশার আলো দেখেছিল শ্রমিক মহল। স্বপ্ন দেখেছিলেন ডানলপ কারখানা হয়ত আবার চালু হবে। কিন্তু শ্রমিকদের সেই আশা বাস্তবায়িত হয়নি। হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছিল সকলকে। আজও তাঁরা বলেন, সেদিন ডানলপ কারখানা নিয়ে একটি বাক্যও উচ্চারণ করেননি প্রধানমন্ত্রী মোদি। পরে শ্রমিকমহল বুঝেছিল, সেই সভা ছিল শুধুমাত্র নির্বাচনী গিমিক।


এবার ফের কড়া নাড়ছে ২৬ এর বিধানসভা নির্বাচন। ডানলপ থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে সিঙ্গুরে টাটা প্রোজেক্টের জমিতে সভা করবেন প্রধানমন্ত্রী। সিঙ্গুর ছেড়ে টাটা চলে যাওয়ার ১৮ বছর পর ১৮ জানুয়ারি বিধানসভা ভোটের ঠিক আগে সিঙ্গুরে আসছেন প্রধানমন্ত্রী। রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল বিজেপির গলায় শোনা যাচ্ছে বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় এলে সিঙ্গুরে শিল্প ফিরিয়ে আনবে। প্রধানমন্ত্রীর এই সিঙ্গুর আসাকে উলু বনে মুক্ত ছড়ানো ছাড়া আর কিছুই মনে করছেন না ডানলপের শ্রমিকরা। ডানলপ কারখানার কর্মচারী অসীম বসু, নির্মল সিং, সমরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলিরা বলেন, ২০২১ সালে ডানলপ মাঠে মোদি সভা করেছিলেন। কিন্তু সেখানে তিনি শুধুমাত্র রাজনৈতিক বক্তব্য রেখে গেছেন। ডানলপের শ্রমিকদের জন্য কিছুই বলেননি। তাঁরা সকলেই হতাশ হয়েছিলেন। কারখানার দিকে ফিরেও তাকাননি। আজও অন্ধকারে ডুবে রয়েছে কারখানা। আবার ভোটের আগে সিঙ্গুরে সভা করতে আসছেন প্রধানমন্ত্রী। এই সভাও উলু বনে মুক্ত ছড়ানো ছাড়া আর কিছু নয়। আসলে ভোটের আগে তিনি আসছেন রাজনীতি করার জন্য। 


ডানলপ ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন সিআইটিইউ সম্পাদক সার্বিক ঘোষ বলেছেন, ২০১৪ সালে মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরেই তৎকালীন রাজ্যসভার সাংসদ প্রয়াত চন্দন মিত্রের নেতৃত্বে পার্লামেন্টের স্ট্যান্ডিং কমিটিকে ডানলপে পাঠানো হয়েছিল। তারা ডানলপ কারখানা পুনর্জন্মের পরিকল্পনা কেন্দ্রে জমা দেবেন বলেছিলেন। কিন্তু কোথাও কিছু হয়নি। ২০২১ সালে তিনি ডানলপ মাঠে এসে সভা করে গিয়েছিলেন। আবার এখন ২৬ এর নির্বাচন। আবার আসছেন সিঙ্গুরে। বিজেপির নেতারা বলছেন তারা নাকি সেখানে শিল্প করবে। সিঙ্গুরে আদৌ শিল্প হবে কিনা সে নিয়ে যথেষ্টই সন্দেহ রয়েছে। 


প্রধানমন্ত্রীর আসাকে নির্বাচনের চমক বলেই মনে করছে তৃণমূল। বিধায়ক অসিত মজুমদার বলেন, বাংলার মানুষ জানে তিনি যে কথা বলেন সে কাজ করেন না। তিনি ২০১৪ থেকে যা বলেছেন সবই মিথ্যে বলেছেন। কোনও কাজ করেননি। ডানলপে যা ছিল সব তার লোকেরা খেয়ে নিয়েছে। ডানলপে আর কিছু নেই। ডানলপের শ্রমিকরা যা পেনশন পাচ্ছেন, সেটা দিচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস সরকার। এবার তিনি সিঙ্গুরে আসছেন। কোনও লাভ হবে না। তিনি মিথ্যাবাদী। মমতা ব্যানার্জি যে আন্দোলন করেছিলেন সেটাকে ভারতবর্ষের সুপ্রিম কোর্ট ঠিক বলে বিবেচনা করেছিল। তাই আমরা যে আন্দোলন করেছিলাম সেটা ঠিক করেছিলাম। জোর করে দু’‌ফসলি, তিন ফসলি জমি অধিগ্রহণ করা ঠিক হয়নি। মানুষ যদি তাদের জমি দেয় তাহলে শিল্প হবে। শিল্প করার মানসিকতা নরেন্দ্র মোদির নেই। তবে সিঙ্গুরে শিল্প হবে কিনা তার উত্তর দেবে সময়।