আজকাল ওয়েবডেস্ক: মুম্বাইতে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে রাজমিস্ত্রির কাজ করতে গিয়ে খুন হলেন মুর্শিদাবাদের এক যুবক। মৃত যুবকের নাম রিন্টু শেখ (৩০)। তাঁর বাড়ি মুর্শিদাবাদের রানিতলা থানার অন্তর্গত আমডহরা গ্রাম পঞ্চায়েতের হাজিগঞ্জে।
মৃতের পরিবারের তরফ থেকে অভিযোগ তোলা হয়েছে বাংলায় কথা বলার জন্য রিন্টুর সঙ্গে কর্মরত অন্য রাজ্যের কয়েকজন পরিযায়ী শ্রমিক তাঁকে পিটিয়ে খুন করেছে।
মৃতের পরিবারের তরফ থেকে ইতিমধ্যেই গোটা ঘটনাটি রানিতলা থানার পুলিশকে জানানো হয়েছে। যদিও রানিতলা থানায় মৃতের পরিবারের তরফ থেকে লিখিত কোনও অভিযোগ এখনও দায়ের করা হয়নি বলে জানা গিয়েছে। এই ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগে মহারাষ্ট্র পুলিশ একজনকে গ্রেপ্তার করেছে বলে রিন্টুর পরিবার জানতে পেরেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, হাজিগঞ্জ গ্রামের বাসিন্দা রিন্টু শেখ গত বেশ কয়েক বছর ধরে মুম্বাইয়ের বিভিন্ন এলাকায় পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। বছরের বেশ কয়েক মাস মুম্বাইতে পরিযায়ী শ্রমিকের কাজ করার পর তিনি মাঝেমধ্যেই গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসতেন।
গত ৭ মাস আগে রিন্টু শেষ বার মুর্শিদাবাদে এসেছিলেন। তারপর থেকে নভি মুম্বাইয়ের উলবে (Ulwe) থানা এলাকার সেক্টর ২৪-এর কাছে একটি বহুতল নির্মাণের কাজে জড়িত ছিলেন। সেখানেই শুক্রবার গভীর রাতে রিন্টুকে ওই বহুতল নির্মাণের সঙ্গে জড়িত অন্য কয়েকজন পরিযায়ী শ্রমিক পিটিয়ে খুন করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রসঙ্গত গতবছর ডিসেম্বর মাসে ওড়িশার সম্বলপুরে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে গিয়ে বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য স্থানীয় জনগণের 'রোষের' শিকার হয়ে গণপ্রহারে মৃত্যু হয় মুর্শিদাবাদের সুতি থানার চক বাহাদুরপুর গ্রামের বাসিন্দা জুয়েল রানা নামে বছর একুশের এক যুবকের। সেই ঘটনার রেশ মেলানোর আগেই মুর্শিদাবাদের আরও এক যুবককে বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য পিটিয়ে মারার অভিযোগ উঠল মহারাষ্ট্রে।
মৃত যুবকের এক দাদা জুম্মাত আলি বলেন,"গত বেশ কয়েক বছর ধরে রিন্টু মহারাষ্ট্রে বিভিন্ন এলাকায় পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে রাজমিস্ত্রির কাজ করে। গত সাত মাস আগে নভি মুম্বাইতে একটি নির্মাণস্থলে রাজমিস্ত্রি হিসেবে কাজ করার জন্য গিয়েছিল। যে বহুতল নির্মাণের সঙ্গে রিন্টু জড়িত ছিল সেখানেই আরও কয়েকজন পরিযায়ী শ্রমিকের সঙ্গে রাতে ঘুমাত। "
জুম্মাত বলেন,"কয়েক বছর আগে রিন্টুর বাবা মারা গিয়েছেন। বাড়িতে রয়েছেন মা, দুই ছোট ভাই, স্ত্রী এবং এক নাবালক সন্তান। সকলের জন্য অন্ন সংস্থানের ব্যবস্থা করতেই তাঁকে ভিন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে যেতে হয়েছে।"
তিনি অভিযোগ করেন,"বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য ওই নির্মাণস্থলে কর্মরত অন্য কয়েকজন পরিযায়ী শ্রমিকের সঙ্গে গতকাল রিন্টুর ঝামেলা হয় বলে আমরা জানতে পেরেছি। যাদের সঙ্গে রিন্টুর ঝামেলা হয়েছিল তারা মূলত উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। এরপর রাতের বেলায় তারাই রিন্টুক নির্মাণস্থলের বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত যন্ত্র দিয়ে পিটিয়ে খুন করেছে। "
তাঁর কথায়,"শনিবার সকালে আমরা রিন্টুর মৃত্যুর খবর জানতে পেরেছি। এই খুনের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ইতিমধ্যেই মুম্বাই পুলিশ এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে বলে আমাদেরকে জানানো হয়েছে। রিন্টু যে কোম্পানির হয়ে কাজ করত তারাই দেহ ময়নাতদন্ত করে গ্রামে পাঠানোর ব্যবস্থা করছে।"
মৃতের স্ত্রী বেবি খাতুন কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান,"আমার দেড় বছরের সন্তানকে নিয়ে কীভাবে এবার সংসার চালাবো আমি জানি না। "
গোটা ঘটনার নিন্দা করে তৃণমূল কংগ্রেসের বহরমপুর মুর্শিদাবাদ সাংগঠনিক জেলা সভাপতি অপূর্ব সরকার বলেন,"বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য বিজেপি শাসিত রাজ্যে বারেবারে পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকরা অত্যাচারিত হচ্ছেন। কখনও তাঁদেরকে মারধর করা হচ্ছে, কখনও তাদের জল-বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।"
তিনি জানান," আমাদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী এখনও পর্যন্ত প্রায় ১১০০ পরিযায়ী শ্রমিকের উপর বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাংলা ভাষায় কথা বলার জন্য অত্যাচার করা হয়েছে। গত কয়েকটি নির্বাচনে বিজেপি এই রাজ্যে বারে বারে মানুষের কাছে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার জন্য বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সঙ্গে প্রতিশোধমূলক আচরণ করছে।"
