মিল্টন সেন, হুগলি: তৃণমূল কংগ্রেস থেকে বিতাড়িতকে যুব মোর্চার সভাপতি! মেনে নেওয়া যাবে না। এই নিয়ে দফায় দফায় গোলমাল-গণ্ডগোল হুগলি জেলা বিজেপির অন্দরে। নবনিযুক্ত যুব মোর্চার সভাপতিকে মানতে নারাজ অধিকাংশ বিজেপি কর্মী। সভাপতি নিয়োগ ঘিরে কার্যত দু’ভাগে বিভক্ত জেলা বিজেপি। দলীয় কার্যালয়ের অন্দরে কোন্দলের ভিডিও ভাইরাল সমাজমাধ্যমে। ভাইরাল ভিডিওতে দলের কর্মীদের বলতে শোনা গেল, “আমরা কেন মানব? মার খেয়েছি। সব সেটিং হয়ে গেল। এসব চলবে না।” পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, সামাল দিতে দলের নেতৃত্বকে নামতে হয়।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজ্য বিজেপির তরফে প্রকাশ করা হয় বিজেপি যুব মোর্চার সভাপতিদের নামের তালিকা। তালিকা অনুযায়ী হুগলি সাংগঠনিক জেলা বিজেপির যুব মোর্চার সভাপতি করা হয় চন্দননগরের সোমবুদ্ধ দত্তকে। সোমবুদ্ধ আগে তৃণমূল ছাত্র নেতা ছিলেন। ২০২১ সালে বিধানসভা নির্বানের আগে নানা অনৈতিক কাজের অভিযোগে ওঠায় মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের নির্দেশে তাঁকে চন্দননগর বিধানসভা এলাকায় থেকে বিতাড়িত করে দল। তারপর কিছু দিন সিঙ্গুরের বিধায়ক তথা কৃষি বিপনন মন্ত্রী বেচারাম মান্নার সান্নিধ্য পেলেও নিষ্ক্রিয় ছিলেন। তারপর ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের আগে লকেট চ্যাটার্জির হাত ধরে বিজেপিতে যোগ দেন। সেই সোমবুদ্ধকে রাজ্য বিজেপি দলের যুব সংগঠনের দায়িত্ব দেওয়াতেই গোলমালের সূত্রপাত।
বিজেপি সূত্রে জানা গিয়েছে, চন্দননগরের এক নেত্রী নতুন সভাপতির পক্ষ নেওয়ায় তাঁকে হেনস্থা হতে হয়। জেলার অন্যান্য মণ্ডল থেকে আসা কর্মীদের অভিযোগ, তৃণমূল কংগ্রেস থাকাকালীন বিজেপি কর্মীদের উপর অত্যাচার করেছে সোমবুদ্ধ। এবার তাঁর নেতৃত্বে দল করতে হবে। সেটা তাঁরা পারবেন না।
এ প্রসঙ্গে দলের হুগলি জেলা সাধারণ সম্পাদক সন্দীপ সাধুখাঁ বলেন, “যদি এরকম কিছু হয়ে থাকে সেটা আমাদের সাংগঠনিক বিষয়। আমাদের জেলা সভাপতি, রাজ্য সভাপতি আছেন ওনারা বিষয়টি দেখবেন। বাড়িতে পাঁচটা ভাই থাকলে এক জনকে কিছু বেশি দিলে অন্য ভাইরা বলে কেন কম দিলে। আমাদের এত কর্মী আছে কাউকে কম, কাউকে বেশি দিলে এটা হতেই পারে। এটা আমরা বুঝব।। আমাদের মধ্যে কোনও ক্ষোভ নেই।”
এই প্রসঙ্গে সোমবুদ্ধ বলেছেন, “যে সময় ছাত্র রাজনীতি করেছি সেটা অতীত। এখন বিজেপি আমার দল। দল যে দায়িত্ব দিয়েছে তা করব। নতুন ছেলে তুলে আনব।”
যদিও বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে নবনিযুক্ত যুব সভাপতিদের নাম প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু হুগলি সংগঠনিক জেলার বিজেপি সভাপতি নাকি তা জানেন না। হুগলি জেলা বিজেপি সভাপতি গৌতম চ্যাটার্জী বলেন, “আমার কাছে এখনও পর্যন্ত দলের কোনও রকম নির্দেশ আসেনি। আমি জানি না কে সভাপতি হয়েছে। নির্দেশ এলে তখন দেখা যাবে।”
জেলা সভাপতি যতই কোন্দল ঢাকার চেষ্টা করুন কেনও, হুগলি বিজেপির কোন্দল কিছুতেই থামছে না। নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে ততই বাড়ছে দলীয় কোন্দল। সম্প্রতি বিজেপি নেতা স্বপন পালকে জেলা বিজেপি অফিসে মারধর করার অভিযোগ ওঠে। তার আগে চুঁচুড়া ঘড়ির মোড়ে প্রকাশ্য বিজেপির সভা চলাকালীন মহিলা কর্মীরা তাঁদের অসন্মান করার অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ দেখায়। গত ২৯ জানুয়ারি রাজ্য নেতৃত্ত্বের উপস্থিতিতে দলীয় কর্মীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। ঘটনায় গুরুতর আহত মণ্ডল সভাপতি এবং আরও কয়েকজন বিজেপি কর্মী। বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষের সভার পরেই গোষ্ঠী সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে উত্তরপাড়া মাখলা মণ্ডল। দলীয় কর্মীদের হাতেই আক্রান্ত হন মণ্ডল সভাপতি। অভিযোগ, দিলীপ ঘোষের সভা থেকে বেরিয়েই মাখলা মণ্ডল অফিসের ভিতরই মণ্ডল সভাপতি গৌতম মাঝির ওপর চড়াও হন বিজেপির হুগলী শ্রীরামপুর সাংগঠনিক জেলা সভাপতি সুমন ঘোষের অনুগামী বেশ কয়েকজন। অভিযোগ, রিভলবারের বাঁট, ইট, বাঁশ দিয়ে মারধর করা হয় গৌতম-সহ অরূপ দে, তাপস দে, রাজীব দেবনাথদের। মারধরে আহত বিজেপি নেতাকর্মীরা, উত্তর পাড়া স্টেট জেনারেল হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা করান। এভাবেই চলছে জেলা বিজেপি। আর পরিস্থিতি সামাল দিতে নাকাল বিজেপি রাজ্য নেতৃত্ব।
