আজকাল ওয়েবডেস্কঃ টানা তিন দিনের অতিভারী বৃষ্টিতে কার্যত বিপর্যস্ত দক্ষিণ ২৪ পরগনার নামখানার ফ্রেজারগঞ্জের অমরাবতী গ্রাম। একটানা বর্ষণ এবং দীর্ঘদিনের বেহাল নিকাশি ব্যবস্থার জেরে গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন জলমগ্ন। অন্তত ৫০টি বাড়িতে হাঁটু সমান জল ঢুকে পড়েছে। বহু পরিবার ঘর ছেড়ে স্থানীয় স্কুল, হোটেল ও আত্মীয়দের বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। যাঁরা এখনও বাড়ি ছাড়তে পারেননি, তাঁরা জলবন্দি অবস্থায় চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। শুধু অমরাবতী নয়, পাশের লক্ষ্মীপুর ও বিজয়পাটি গ্রামেরও একাধিক বাড়িতে জল ঢুকেছে। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে অমরাবতী গ্রামেই।


গ্রামবাসীদের অভিযোগ, গত তিন দিনের টানা বৃষ্টিতে গ্রামের একমাত্র নিকাশি খাল উপচে পড়েছে। বহুদিন ধরে সেই খাল সংস্কার না হওয়ায় বৃষ্টির জল বের হওয়ার কোনও পথ নেই। ফলে গোটা গ্রাম কার্যত জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। বাড়ির ভিতরে হাঁটু সমান জল জমে যাওয়ায় রান্নাবান্না, খাওয়াদাওয়া থেকে শুরু করে দৈনন্দিন সমস্ত কাজকর্মই ব্যাহত হয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, জল আরও বাড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।


সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষজন। প্রায় ১০টি পরিবার প্রয়োজনীয় রান্নার সরঞ্জাম, পোশাক, শুকনো খাবার এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নিয়ে কোনও রকমে জল পেরিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গিয়েছেন। অনেকেই স্থানীয় স্কুল ও হোটেলে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়েছেন। তবে এখনও বহু পরিবার নিজেদের শেষ সম্বলটুকু রক্ষা করার আশায় জলমগ্ন বাড়িতেই বসবাস করছেন। চারপাশে জল জমে থাকায় পানীয় জল, খাবার এবং ওষুধের সংকটও দেখা দিতে শুরু করেছে।


অতিবৃষ্টির জেরে গ্রামের কয়েকশো বিঘা কৃষিজমি সম্পূর্ণ জলের তলায় চলে গিয়েছে। ধানের বীজতলা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় চাষিরা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। শুধু কৃষিকাজ নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মৎস্যচাষও। এলাকার একাধিক পুকুর ভেসে যাওয়ায় মাছ বেরিয়ে গিয়েছে, ফলে বহু মৎস্যজীবী ও মাছচাষির জীবিকাও বিপদের মুখে পড়েছে। কৃষক ও মৎস্যজীবীদের দাবি, দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন করে সরকারি সাহায্যের ব্যবস্থা করতে হবে।


জল জমে থাকায় এখন নতুন করে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে সাপ ও ব্যাঙের উপদ্রব। জলমগ্ন ঘরবাড়িতে প্রায়ই বিষধর সাপ ঢুকে পড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ছোট শিশুদের নিয়ে চরম আতঙ্কে রয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। পাশাপাশি দীর্ঘদিন জল জমে থাকলে জলবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। তাই দ্রুত জল নামানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্য শিবির ও বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থারও দাবি উঠেছে।


গ্রামবাসীদের অভিযোগ, বহুবার প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের কাছে নিকাশি খাল সংস্কারের দাবি জানানো হলেও কার্যকর কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সেই অবহেলার ফলই আজ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, নিকাশি খাল দ্রুত সংস্কার না হলে আগামী দিনেও সামান্য বৃষ্টিতেই গোটা এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়বে। তাঁদের মতে, বর্তমানে জমে থাকা জল বের হতে অন্তত দশ দিনেরও বেশি সময় লাগতে পারে।


স্থানীয় বাসিন্দা মধুমিতা দাস বলেন, "প্রতি বছরই বর্ষায় আমাদের এই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হয়। এ বছর পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ। ঘরের সব জিনিসপত্র জলে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটছে। প্রশাসনের কাছে আমাদের আবেদন, দ্রুত জল নামানোর ব্যবস্থা করা হোক।"

এ বিষয়ে সুন্দরবন উন্নয়ন মন্ত্রী দীপঙ্কর জানা বলেন, "টানা ভারী বৃষ্টির কারণে কয়েকটি এলাকায় জল জমেছে। প্রশাসন পুরো পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে। কোথাও নিকাশির সমস্যা থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দুর্গত মানুষদের পাশে সরকার রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সবরকম সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।"


স্থানীয়দের এখন একটাই দাবি—অবিলম্বে অমরাবতী ও সংলগ্ন এলাকার নিকাশি ব্যবস্থা সংস্কার করে জমে থাকা জল দ্রুত বের করার উদ্যোগ নিতে হবে। না হলে ভবিষ্যতে প্রতি বর্ষাতেই এই গ্রামের মানুষকে একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হবে।