আজকাল ওয়েবডেস্ক: উত্তরবঙ্গ সফরে এসে শিলিগুড়ি পুরনিগমে জনসংযোগ কর্মসূচিতে অংশ নিলেন রাজ্যের নগর উন্নয়ন ও পৌর বিষয়ক মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। রবিবার কলকাতা থেকে বিমানে বাগডোগরা বিমানবন্দরে পৌঁছে তিনি সড়কপথে শিলিগুড়ি পুরনিগমে যান। সেখানে তাঁকে স্বাগত জানান পুরনিগমের কমিশনার বীর বিক্রম রাই এবং প্রশাসকমণ্ডলীর সদস্য আর. বিমলা।

পুরনিগমে আয়োজিত জনসংযোগ কর্মসূচিতে ফোনের মাধ্যমে নাগরিকদের কাছ থেকে পৌর পরিষেবা সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা, অভিযোগ ও পরামর্শ শোনেন মন্ত্রী। তিনি সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের দ্রুত সমস্যার সমাধানের নির্দেশ দেন এবং নাগরিকদের উন্নত পরিষেবা দেওয়ার ওপর জোর দেন। এরপর উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন পুরসভার আধিকারিকদের নিয়ে একটি পর্যালোচনা বৈঠক করেন।

প্রথম পর্যায়ের জনসংযোগ কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর একটি অভ্যন্তরীণ বৈঠক করেন মন্ত্রী। পরে সাংবাদিক বৈঠকে উত্তরবঙ্গের উন্নয়ন নিয়ে একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন।

মন্ত্রী জানান, ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ীকে আলাদা পুরসভা করার প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু হচ্ছে। তিনি বলেন, স্থানীয় বিধায়ক শিখা চ্যাটার্জির বিধানসভায় উত্থাপিত দাবির ভিত্তিতে এই বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং খুব শীঘ্রই নতুন পুরসভা গঠনের কাজ শুরু হবে।

শিলিগুড়িকে ‘হিমালয়ান সিটি’ তথা আধুনিক স্মার্ট নগর হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। তাঁর দাবি, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শিলিগুড়ি উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে আরও বিকশিত হবে।

মন্ত্রী জানান, কোচবিহারের উন্নয়নে প্রায় ৩০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কোচবিহরকে 'স্মার্ট সিটি' হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

দার্জিলিং, কালিম্পং, শিলিগুড়ি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরে যানজট কমাতে মাল্টি-লেভেল পার্কিং নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি শিলিগুড়িতে চালু হবে অ্যাপ-ভিত্তিক ও অনলাইন পার্কিং ব্যবস্থা। ১ সেপ্টেম্বর থেকে এই ব্যবস্থা কার্যকর হবে। সব পার্কিং হবে বৈধ ও নিয়ন্ত্রিত। পার্কিং কর্মীদের নির্দিষ্ট ইউনিফর্ম ও পরিচয়পত্র থাকবে।

শিলিগুড়িতে ওয়ান-সাইড পার্কিং চালুর কথাও ঘোষণা করেন তিনি। এতে শহরের যানজট অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে বলে আশা প্রশাসনের।

শহর পরিচ্ছন্ন রাখতে ১ সেপ্টেম্বর থেকে রাস্তায় ময়লা বা থুতু ফেললে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত আর্থিক জরিমানা করা হবে বলেও জানান মন্ত্রী।

তিনি সাধারণ মানুষকে ‘স্বচ্ছ’ অ্যাপ ডাউনলোড করার আহ্বান জানান। কর্পোরেশন এলাকার কোথাও ময়লা পড়ে থাকতে দেখলে সেই অ্যাপে ছবি আপলোড করলেই পুরনিগমের পক্ষ থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যে তা পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেওয়া হবে, জানিয়েছেন তিনি।

বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় পদক্ষেপ হিসেবে শিলিগুড়ি ও জলপাইগুড়িতে ভারত পেট্রোলিয়ামের সহযোগিতায় আধুনিক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ প্রকল্প গড়ে তোলা হবে।

উত্তরবঙ্গের প্রতিটি শহরে আধুনিক বাসস্টপ নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানান মন্ত্রী। সেখানে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন ব্যবস্থা থাকবে, যার মাধ্যমে আয় হবে। পাশাপাশি থাকবে মোবাইল চার্জিংয়ের সুবিধা, বাসের রিয়েল-টাইম তথ্য, যাত্রীদের বসার ব্যবস্থা এবং বাসস্টপের দু'পাশে হ্যাঙ্গিং গার্ডেন।

এছাড়া, মন্দিরে ব্যবহৃত ফুল পুনর্ব্যবহার করে ধূপকাঠি ও আবির তৈরির প্রকল্প শুরু হতে চলেছে। পাইলট প্রকল্প হিসেবে জলপেশ, মদনমোহন ও ভার্মি দেবী মন্দিরে আসন্ন দুর্গাপুজো থেকেই এই উদ্যোগ শুরু হবে।

মিরিকে পানীয় জল প্রকল্পের তিনটি এসটিপি (STP) চলতি বছরের মধ্যেই শেষ হবে। পাশাপাশি মিরিক লেক সংলগ্ন এলাকাকে আরও আকর্ষণীয় ও আধুনিকভাবে সৌন্দর্যায়নের পরিকল্পনাও রয়েছে।

দার্জিলিং, কার্শিয়াং, কালিম্পং, শিলিগুড়ি ও মিরিককে ‘হিল টাউন সিটি’ হিসেবে বিশেষ উন্নয়নের আওতায় আনা হবে বলে ঘোষণা করেন মন্ত্রী।

পানীয় জল প্রকল্প নিয়ে তিনি জানান, ২০২৭ সালের জুন মাসের মধ্যে উত্তরবঙ্গের প্রতিটি বাড়িতে পানীয় জলের সংযোগ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এই প্রকল্পে মোট ব্যয় হবে প্রায় ১,৬৯৮ কোটি টাকা।

বাজার এলাকায় প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে নতুন উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন তিনি। উত্তরবঙ্গের বড় বড় বাজারে বিশেষ ভেন্ডিং মেশিন বসানো হবে, যেখানে ভুট্টা ও আনারসের তন্তু দিয়ে তৈরি পরিবেশবান্ধব ব্যাগ মাত্র ১ টাকায় পাওয়া যাবে। মাছ-মাংস বহনের জন্যও এই ব্যাগ ব্যবহার করা যাবে। পাশাপাশি প্লাস্টিকের জলের বোতল পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে তৈরি ব্যাগও ৫ থেকে ১০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাবে।

স্বাস্থ্যবিধি ও জনসুবিধার কথা মাথায় রেখে বস্তি এলাকায় কমিউনিটি টয়লেট এবং পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে আধুনিক পাবলিক টয়লেট নির্মাণের কথা ঘোষণা করেন মন্ত্রী।

শহর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে শিলিগুড়িতে প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে ময়লা পরিষ্কারের কাজ শুরু হবে। এছাড়া দুপুর ও সন্ধ্যায় আরও দু'দফা রাস্তা ঝাঁট দেওয়া হবে। এই অতিরিক্ত পরিষেবা দেওয়ার জন্য পরিচ্ছন্নতা কর্মীদেরও অতিরিক্ত পারিশ্রমিক দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

সাংবাদিক বৈঠকে মন্ত্রী বলেন, নাগরিক পরিষেবা আধুনিকীকরণ, পরিচ্ছন্ন শহর, উন্নত অবকাঠামো, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ এবং প্রযুক্তিনির্ভর পরিষেবার মাধ্যমে উত্তরবঙ্গকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়াই রাজ্য সরকারের লক্ষ্য।