ডাঃ চন্দ্রকান্ত চক্রবর্তী: এই যে এখন জ্যৈষ্ঠ মাস, প্রচন্ড গরম চলছে, প্রায়শই আর্দ্রতার পরিমাণ অত্যন্ত বেশি জায়গায় চলে যাচ্ছে। তাপমাত্রাও ঊর্ধ্বমুখী। জীবনধারণ সংশয়পূর্ণ হয়ে উঠছে মানুষ ও প্রাণীকুল, সকলেরই! এমতাবস্থায় শরীরের যত্ন নেওয়াটা প্রত্যেকেরই দরকার। যাঁরা বাড়িতে প্রাণীকুলের মধ্যে কুকুর, বেড়াল, পাখি, খরগোশ ইত্যাদি রাখছেন বা পুষছেন, তাঁদের পরিবারে এরা একরকম সদস্য হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রেই সন্তানের জায়গা নিয়ে নেয়। এখন এই গরমে, গ্রীষ্মের দাবদাহের মধ্যে এদের শরীরের বিশেষ যত্ন নেওয়া খুব জরুরি। কী কী করবেন, কোন কোন জায়গা থেকে সতর্ক থাকা দরকার, খাদ্য তালিকায় কী কী থাকা দরকার বা কী থাকবে না তাতে, জল কতটা খাওয়াবেন ইত্যাদি ইত্যাদি। এই সমস্ত বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা না থাকলে এই সমস্ত পোষ্যগুলি অসুস্থ হয়ে যেতে পারে খুব সহজেই। যে ধরনের অসুস্থতাগুলো খুব বেশি ভাবে ভাবায় আমাদের, তার মধ্যে হিটস্ট্রোক একটি বড় ব্যাপার। তবে এ নিয়ে আলোচনায় যাওয়ার আগে আগে বরং আমরা জেনে নিই উচ্চ তাপমাত্রা বা বেশি তাপ প্রাণীর শরীরে কীভাবে আর কেন খারাপ প্রভাব বিস্তার করে।
কুকুর, বিড়াল, খরগোশ, পাখি, এদের শরীর লোমে এবং পালকে ঢাকা হওয়ায়, শরীরে আমাদের মতো ঘাম হয় না। একমাত্র নাক, মুখ এবং পায়ের থাবা দিয়ে কুকুর বা বিড়াল তাপ বিকিরণ করতে পারে। পাখির ক্ষেত্রেও নিয়মিত স্নান করানোর প্রয়োজন হয়। ওরা স্নান করতে ভালওবাসে শরীর ঠান্ডা রাখার তাগিদে। তাছাড়া এদের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রাও আমাদের থেকে অনেকটা বেশি, যেমন কুকুর ও বেড়ালের ক্ষেত্রে ১০২. ৫° ফারেনহাইট পর্যন্ত। ফলত প্রচণ্ড গরমে অল্প উত্তাপ শরীরের ঢুকলেই এদের তাপমাত্রা আরও বেড়ে যায় কিন্তু সর্বোচ্চ তাপমাত্রা একশো পাঁচ বা ছয় ডিগ্রি ফারেনহাইট পার করলেই শরীর বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং জীবনহানির সম্ভাবনা দেখা দেয়। অধিকাংশ পাখির ক্ষেত্রে নরমাল তাপমাত্রা প্রায় একশো তিন থেকে একশো পাঁচ ডিগ্রি ফারেনহিট বা তার আশেপাশে। সুতরাং পাখির ক্ষেত্রেও শরীরে অধিক পরিমাণে উত্তাপ সঞ্চিত হয়ে গেলে হিটস্ট্রোক হয়ে যাবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। খরগোশ শুকনো ও ঠান্ডা জায়গায় থাকে। গরমে এদেরও ওই একইভাবে কষ্ট হয়। তাই বাড়িতে পোষ্য থাকলে তাদের শরীর ঠান্ডা যাতে থাকে সেই ব্যবস্থা করতে হবে। কুকুরকে ঘনঘন অর্থাৎ প্রয়োজন অনুযায়ী স্নান করানো যেতে পারে। পাখির ক্ষেত্রেও স্নান চলে। বিড়াল জল খুব একটা পছন্দ করেনা। স্নান বড় একটা বিড়ালের জন্য প্রযোজ্য নয়। খরগোশও তাই। স্নান অনেক সময়ই এরা নিতে পারে না। হঠাৎ করে শরীরের তাপমাত্রা নেমে গিয়েও বিপদ আসতে পারে। তাই শীতল পরিবেশে রাখাটাই শ্রেয়। কুকুরকে স্নান করালে সবসময় পরীক্ষিত ভাল শ্যাম্পু ও ঠান্ডা জলে স্নান করাতে হবে। গা শুকনো করে মুছিয়ে দিতে হবে। নিয়মিত তাপমাত্রা পরীক্ষা করতে হবে, যেন তা নরমালের থেকে বেড়ে না যায়। এর সঙ্গে পোষ্যদের বাড়িতে এসি রুমে রাখাটাই শ্রেয়। তাপমাত্রা ২৪-২৬°ফারেনহাইট এর মধ্যে। তাতে এরা অনেক আরামে থাকতে পারে। আমরা বলি এয়ার কন্ডিশনড রুম মানুষের জন্য না হলেও আমাদের পোষ্যদের জন্য এক বাধ্যবাধ্যকতা। অন্তত আজকের দিনে দাঁড়িয়ে।
তাহলে এক, দুই, তিন, চার করে বললে এটাই বলতে হয় যে প্রচণ্ড গরমে কুকুর, বেড়াল, খরগোশ, পাখি-- এদের সবাইকেই ছায়াযুক্ত স্থানে ঠান্ডা জায়গায় দরকার হলে এসি রুমে রাখতে হবে।
কুকুরকে নিয়মিত স্নান করাতে হবে। উপযুক্ত শ্যাম্পু ব্যবহার করতে হবে ভেটের পরামর্শক্রমে।
প্রচন্ড গরমে বাইরে বের না করাই ভাল। হাঁটতে বেরোলে একদম সকালে এবং রাতের দিকে নিয়ে বেরোনো ভাল যখন রাস্তাঘাট তাপ বিকিরণ সম্পূর্ণ করে ঠান্ডা হয়ে আসে।
দিনের বেলা গাড়িতে নিয়ে বেরোলে কখনোই গাড়ি স্টার্ট বন্ধ অবস্থায় এদেরকে গরমের মধ্যে গাড়ির ভেতরে রাখা যাবে না। তাতে সমূহ বিপদ।
জল প্রচুর পরিমাণে খাওয়াতে হবে কতটা জল খাওয়ানো দরকার সেটা তার অ্যাক্টিভিটি মানে হাঁটাচলা দৌড়ঝাঁপ-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। একটা থাম্বরুল হল পরিষ্কার ইউরিন হওয়া, ইউরিন পরিমাণে অনেকটা এবং বারে বারে করলে বুঝতে হবে শরীরের জলের অভাব সেই অর্থে নেই, যদি না কুকুর বা বিড়ালটির শরীরে ডায়াবেটিস, হার্ট বা কিডনি সংক্রান্ত অন্য কোন সমস্যা থাকে।
এই গরমে আর একটা বড় সমস্যা হল কুকুর ও বিড়ালের গায়ে পোকা হওয়া। একটোপ্যারাসাইটস, মানে টিক্স, ফ্লি, লাইস-- এইসব। বাড়ির পশুদের ক্ষেত্রে সাধারণত এগুলো পরিবেশ থেকেই আসে মানে পরিবেশে যে সমস্ত স্ট্রে-অ্যানিম্যালস আছে, তাদের শরীর থেকে চলে আসতে পারে কারণ এদের খাদ্য হলো পশুদের শরীরটি। সেজন্য যদি বাড়ির কুকুরকে রাস্তায় হাঁটাতে বার করা হয়, তাহলে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যেন তার শরীরে কোনওভাবেই পোকা চলে না আসতে আসতে পারে। এই পোকার কামড় থেকে হিমোপ্রোটোজোয়ান ইনফেকশন হচ্ছে এবং তা বর্তমানে এক সাংঘাতিক অবস্থা তৈরি করেছে। আকছার অকাল মৃত্যু ঘটছে আমাদের পোষ্যদের। এবং চিকিৎসা পদ্ধতিও ব্যয়বহুল। সুতরাং যদি কুকুরকে বাইরে নিয়ে বেরোতেই হয়, পোকা যাতে না হয়, সেজন্য উপযুক্ত প্রতিরোধকের ব্যবস্থা করে তবেই নিয়ে যেতে হবে।
প্রচন্ড গরমে খাওয়া দাওয়াও কমে যায় সকলেরই। জলীয় খাবার যা সহজপাচ্য এবং সুস্বাদু তাই খেতে দিতে হবে।
পরিবেশের বিরূপ প্রতিক্রিয়া স্বরূপ কুকুর, বেড়াল, পাখি, খরগোশের শরীর এই গরমে অসুস্থ হলে ফেলে না রেখে এবং নিজের মতো চিকিৎসা না করে, কোয়াক নির্ভরশীল না হয়ে, ভাল ভেট-হসপিটাল বা ক্লিনিকে অভিজ্ঞ ভেটেরিনারি ডাক্তারকে দেখিয়ে সঙ্গে সঙ্গে এদের উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
সুতরাং যেটা বোঝা গেল যে, প্রচন্ড গরমে আমদের মানুষের যখন হাসফাঁস বেগতিক অবস্থা, তখন ভাল নেই ওরাও। একদমই ভাল নেই।
কিন্তু উপযুক্ত সতর্কতাবিধি অনুসরণ করে ওদের বড়ো করে তোলা এবং নিয়ম মাফিক ভ্যাকসিন, কৃমির ওষুধ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় মেডিসিন দেওয়ার মাধ্যমে ওদের ভাল রাখাটা তাই এক্ষেত্রে খুব প্রয়োজনীয়।
যে সমস্ত পশুপ্রাণী ও পাখি বাইরের পরিবেশে এবং রাস্তায় বা আমাদের সমাজে যত্রতত্র থাকে, তারাও আমাদেরই মতো এখানকার বাসিন্দা। তারা যাতে সুস্থ থাকতে পারে, পর্যাপ্ত খাবার ও পানীয় জল পায়, শীতল ছায়াযুক্ত স্থান পায় থাকার জন্য, সেটা দেখাটাও আমাদের নাগরিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। এ জন্য জনসচেতনতা থাকাটা খুব দরকার। আমরা নতুন সরকারের কাছে আবেদন করতে পারি; যাতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আধুনিক শেল্টার হাউস তৈরি করা হয়, যেখানে নিরাপদে থাকা, খাওয়া ও চিকিৎসা পাওয়া অর্থাৎ সুস্থ পরিবেশ পাওয়াটা এদের জন্য সোজা হয়।















