অংশুমান কর: আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী বাঙালিদের নিয়ে গর্ব করার খুব বেশি সুযোগ আমাদের ঘটে না। মুষ্টিমেয় ক-টি নামকে নিয়েই আমরা বুক বাজিয়ে কলার তুলে বলতে পারি এঁরা আমাদের লোক। তালিকা সংক্ষিপ্তই থাকে। এই তালিকা থেকে এবার একটি নাম খসে গেল। চলে গেলেন প্রবাল দাশগুপ্ত। ঘটনাটি এতই আকস্মিক যে, বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না প্রথমে। কারণ ফেসবুকে নিয়ত সচল থাকতেন প্রবালদা। এমনকি যেদিন পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছেন সেদিনও ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। তাই ওঁর পুত্র যখন ফেসবুকে প্রথম জানালেন এ খবর, বিশ্বাসই হয়নি। এখনও বিশ্বাস করা কঠিন।
প্রবাল দাশগুপ্তর লেখা পড়ছি অনেক ছোটো থেকেই। কিন্তু ওঁর সঙ্গে সামনাসামনি আলাপ হল অনেক পরে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের একটি বোর্ডে আমি এবং প্রবালদা দু-জনেই বহিরাগত বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছিলাম। ওই বিভাগেরই স্যমন্তকদা (পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য হয়েছিল ধীমান এই অধ্যাপক; সেও আর নেই!) যখন প্রথম আমাকে ফোন করে জানিয়েছিল যে, বোর্ডে আমার সঙ্গে থাকবেন প্রবাল দাশগুপ্ত তখন আমি খুবই উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম। প্রবাল দাশগুপ্তর সঙ্গে একই বোর্ডে থাকব। এ যে অভাবনীয় ব্যাপার। একটু ভয়ও লাগছিল। এত বড় মাপের একজন মানুষের সঙ্গে কাজ করা সহজ নয় এটাই ভাবছিলাম বারবার। ভাবছিলাম উনি নিশ্চয়ই অন্য পণ্ডিতদের মতো অন্তর্মুখী হবেন, হবেন গম্ভীর। কিন্তু আলাপ হতে দেখলাম মানুষটা ঠিক উল্টো। এত সহজ, এত সাধারণ, ভাবাই যায় না! আমি ওকে বলব কী যে, আপনার আমি এক গুণমুগ্ধ ভক্ত। উনিই আগে আমাকে বলে বসলেন, আপনার কবিতা পড়েছি। খুব ভাল লাগে। এরপর আরেকটা কাজ করেছিলেন যেটা ওই মাপের একজন মানুষের মন খুব বড় না হলে করা যায় না। উনি নিজের থেকে ফেসবুকে আমাকে রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। বয়সে ছোটো কাউকে এখনও রিকোয়েস্ট পাঠাতে আমার নিজেরই কেমন কিন্তু-কিন্তু লাগে। এসব তুচ্ছ অহমিকা কিংবা সংশয় কোনওটাই ওঁর ছিল না।
ধীরে ধীরে আমার সঙ্গে একটা সহজ আন্তরিক বন্ধুত্বের সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল প্রবালদার। নানা লেখা পড়ে জানাতেন। আমার পোস্ট শেয়ার করতেন। পোস্টে এসে মন্তব্যও করতেন। বিরুদ্ধ মতও রাখতেন। নিজেও মাঝে মাঝেই পৃথিবীতে ঘটে চলা নানা বিষয় নিয়েই ফেসবুকেই ওঁর মতামত রাখতেন। কখনও-কখনও প্রতিবাদও করতেন। তবে উনি যখন ফেসবুকে প্রতিবাদীও হতেন তখনও সেই প্রতিবাদের মধ্যে থাকত এমন এক নম্র দৃঢ়তা যে, অবাক হতে হত। যাদবপুরের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের বোর্ডে একসঙ্গে কাজ করতে গিয়েও দেখেছি বাকবিতণ্ডা একেবারেই পছন্দ করতেন না প্রবালদা। কোনও বিষয়ে মতানৈক্য হলে আমরা অধ্যাপকরা ভালই ঝগড়াঝাঁটি করে থাকি। ওঁকে কোনওদিন ঝগড়া করতে দেখিনি। গলা উঁচু করে কথা বলতেও দেখিনি।
ব্যক্তিগত পরিচয়ের বাইরে দাঁড়িয়ে যদি প্রবাল দাশগুপ্তর দিকে তাকাই তাহলে মনে হয় ভাষাতত্ত্ব, ভাষাদর্শন, অনুবাদ, এসপেরান্তো আন্দোলন এবং মানবমুক্তির স্বপ্ন— এই সমস্ত কিছুকে এক সূত্রে জুড়লে যে-ছবিটি আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেটিই প্রবাল দাশগুপ্তর ছবি। মাত্র আঠারো বছর বয়সে তিনি Linguistic Society of India-র জার্নালে ভারতীয় ভাষাতত্ত্ব নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখে বিদ্বৎসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে ভাষা, ভাষার গঠন, ভাষার সামাজিক ভূমিকা এবং ভাষার রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে তাঁর গবেষণা ও চিন্তা দেশ-বিদেশে সমাদৃত হয়। ১৯৮০ সালে নিউ ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাতত্ত্বে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন প্রবাল দাশগুপ্ত। গবেষণার পাশাপাশি শিক্ষক হিসেবেও তিনি ছিলেন সমানভাবে সক্রিয়। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত তিনি পুনের ডেকান কলেজে অধ্যাপনা করেন। পরে ১৯৮৯ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ২০০৬ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতা করেন।
ভাষা নিয়ে প্রবাল দাশগুপ্তর চিন্তা কখনও কেবল শ্রেণিকক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং সে-চিন্তা ছড়িয়ে পড়েছিল সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতার নানা পরিসরে। ভাষা সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল গভীর এবং মৌলিক। তিনি বিশ্বাস করতেন, ভাষা শুধুমাত্র ভাব বিনিময়ের মাধ্যম নয়। ভাষা মানুষের স্বাধীনতা, আত্মপরিচয় এবং সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। ভাষার মধ্যেই মানুষ নিজের জগৎ নির্মাণ করে, আবার ভাষার মাধ্যমেই সেই জগৎকে প্রশ্ন করে। ভাষাকে ঘিরে তাঁর এই নিরন্তর অনুসন্ধিৎসাই তাঁকে আর কেবল একজন ভাষাতাত্ত্বিক করে রাখেনি; চিন্তকের মর্যাদা দিয়েছে।
বাংলা ভাষায় তাঁর বইয়ের সংখ্যা খুব বেশি নয়। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে নানা সাময়িকী ও পত্রিকায় অসংখ্য প্রবন্ধ লিখলেও বই মাত্র গোটা ছয়েক। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত কথার ক্রিয়াকর্ম ছিল তাঁর প্রথম বাংলা বই। ভাষা ও অর্থের সম্পর্ক নিয়ে সেই বই আজও গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্য। এরপর প্রকাশিত হয় ছিন্ন কথায় সাজিয়ে তরণী (২০১০), ভাষার বিন্দুবিসর্গ (২০১২), মেরুর প্রার্থনা: বিষুবের উত্তর (২০১৫), ভাষার আকৃত চেহারা (২০২৫) এবং সম্বোধনের সন্ধানে (২০২৬)।
এই বইগুলির বিশেষত্ব কেবল লেখকের বিপুল পাণ্ডিত্য নয় বরং ছত্রে ছত্রে ফুটে ওঠা এক অদম্য কৌতূহল। তিনি ভাষাকে স্থির কোনও কাঠামো হিসেবে দেখেননি; দেখেছেন জীবন্ত, পরিবর্তনশীল এবং বহুমাত্রিক এক মানবিক ক্রিয়াকলাপ হিসেবে। তাঁর লেখার পাঠক খুব দ্রুতই বুঝতে পারেন যে, লেখক নিজে যেমন ভাবছেন, তেমনই পাঠককেও ভাবতে বাধ্য করছেন। তিনি প্রশ্ন উত্থাপন করেন, নিজে উত্তর দেন, আবার উত্তর খোঁজার দায় পাঠকের ওপরও ছেড়ে দেন। ফলে তাঁর বই পড়তে পড়তে পাঠক একই সঙ্গে ছাত্র, গবেষক এবং সহযাত্রী হয়ে ওঠেন। বাংলা গদ্যে ভাষাতত্ত্বের মতো আপাত জটিল বিষয়কে সহজ অথচ গভীরভাবে ব্যাখ্যা করার বিরল ক্ষমতা ছিল ওঁর। কোনও বিষয়কে তিনি কখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জায়গা থেকে দেখেননি। বরং আলোচনার মধ্যে রেখেছেন সংশয়, বিতর্ক ও অনুসন্ধানের সম্ভাবনা। এই কারণেই তাঁর বইগুলি নিছক তথ্যগৃহ নয়, সেগুলি চিন্তার আধার।
প্রবাল দাশগুপ্তর পরিচয়ের আর-একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আন্তর্জাতিক এসপেরান্তো আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পৃক্ততা। নিরপেক্ষ ও পরিকল্পিত আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে এসপেরান্তোর প্রসারে তাঁর ভূমিকা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। তিনি ইউনিভার্সাল এসপেরান্তো অ্যাসোসিয়েশন (UEA)-এর সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, ভাষাগত বৈষম্য পৃথিবীর নানা অসাম্য ও ক্ষমতার সম্পর্ককে আরও জটিল করে তোলে। একটি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক ভাষা মানুষের মধ্যে সমতার বোধ ও পারস্পরিক বোঝাপড়াকে শক্তিশালী করতে পারে। সেই স্বপ্ন থেকেই তিনি এসপেরান্তো আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে তাঁর আন্তর্জাতিকতা কখনও তাঁকে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির শেকড় থেকে চ্যুত করতে পারেনি।
প্রবাল দাশগুপ্ত চলে গেলেন। কিন্তু ভাষার ভেতরের সেই অন্তর্লোক, প্রশ্ন-প্রতিপ্রশ্নের সেই অনন্ত যাত্রা এবং চিন্তার সেই মুক্ত পরিসর, যা তাঁর নানা লেখায় তিনি নির্মাণ করে গিয়েছেন, তা আমাদের সঙ্গেই থাকবে। তাঁর অনুপস্থিতি অনুভূত হবে বারবার। বিশেষ করে এমন একটা সময়ে যখন আমাদের রাজ্যে দক্ষিণপন্থী শক্তির বিকাশ ঘটছে আর মানুষকে পরিচিতি সত্তার নানা ছোটো ছোটো খোপে পুরে ফেলার চেষ্টা চলছে বিশ্ব জুড়ে। এই সময়েই প্রবাল দাশগুপ্তর মতো একজন মানুষের বড় প্রয়োজন ছিল আমাদের বাংলায়। কেন? মৌসুমী ভৌমিকের একটি লেখার কাছে আশ্রয় নিলেই বোঝা যাবে কারণ। মৌসুমী ভৌমিক প্রবাল দাশগুপ্তর প্রয়াণের পরে লিখেছেন যে, উনি ২০২২ এর ১৫ আগস্ট ভারতভাগ্যবিধাতার তুলনামূলকভাবে অগীত স্তবকগুচ্ছ নিজের মতো করে সাজিয়ে পোস্ট করেছিলেন ইউটিউবে। উনি কলকাতায় বসে গেয়েছিলেন আর ওঁর লন্ডনের বন্ধুরা–অলি উইক্স, বেন হার্টল্যান্ড, ফ্লোরা কার্জন–অন্য দেশে বসে অর্কেস্ট্রেশন করেছিল। প্রবাল দাশগুপ্ত সেই গানের নীচে এসে লিখে গিয়েছিলেন মৌসুমী ভৌমিকের হয়তো জানা নেই যে, প্রায় এক দশক আগে তিনি একটি শব্দ তৈরি করেছিলেন; সে শব্দটি ‘দেশাধিক’। ইংরেজিতে যাকে বলে ট্রান্স-নেশন সেই ধারণাটিকে বোঝাতেই প্রবাল দাশগুপ্ত তৈরি করেছিলেন এই শব্দ। তিনি মৌসুমী ভৌমিককে জানিয়েছিলেন যে, ইচ্ছে হলে মৌসুমী এই শব্দটি ব্যবহার করতে পারেন। প্রবাল দাশগুপ্তর আজীবনের সাধনা ছিল এই ‘দেশাধিক'-এর সাধনা। তাঁর প্রয়াণে আমরা সত্যিই একজন দেশাধিক চিন্তককে হারালাম।















