শ্যামলী ভট্টাচার্য: সাহিত্য সম্রাট ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নৈহাটির কাঁঠালপাড়ার বাড়ির রথ, মফস্বল শহরের রথযাত্রাগুলোর মধ্যে একটা ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য নিয়ে আজও ইতিহাসের এক যুগ সন্ধিক্ষণে সাক্ষ্য দেয়। কবে, কখন, কীভাবে বঙ্কিমের পরিবারে এই রথযাত্রা শুরু হয়েছিল, তাঁদের কুল দেবতা রাধাবল্লব, তাঁদের পরিবারে এসেছিলেন কবে, সেই সব নিয়ে বহু রকমের কাহিনি প্রচলিত আছে।

 

বন্ধু চন্দ্রনাথ বসুকে বঙ্কিম একবার বলেছিলেন; ‘রাধাবল্লভ আমাদের বংশের সর্বপ্রকার মঙ্গল বিধান করেন, সমস্ত দুর্গতি নাশ করেন, আমাদের সকলের কথা শোনেন, সব আবদার রক্ষা করেন। রোগে-শোকে বিপদে আমরা তাঁহারই মুখ চাহিয়া কি। উঁহাকেই ধরি, উনি আমাদের বড় ভালবাসেন’। 

 

সেই রাধাবল্লভকে ঘিরে রথযাত্রা আজও উনিশ শতকের ক্ষয়িষ্ণু-জাঁকজমকের এক অসাধারণ ছবি এঁকে চলে। বঙ্কিমের গৃহদেবতা রাধাবল্লভ, যাকে ঘিরে আজও রথের মেলা বসে, তার সম্পর্কে বঙ্কিমের বড় দাদা শ্যামাচরণের পুত্র সতীশচন্দ্র লিখছেন; “রাধাবল্লভ সম্বন্ধে একটা গল্প আছে। সে আজ বহু দিনের কথা। আমি দেড় শতবর্ষের আগেকার কথা বলিতেছি। তখন বাংলার সিংহাসনে আলিবর্দি খাঁ অধিষ্ঠান করিতেছেন। ইংরেজ কলিকাতায় কুঠি নির্মাণ করিয়া ভারতব্যাপী রাজ্যে সূচনা করিতেছেন। মীরজাফর তখন সামান্য সেনানী। সিরাজউদ্দৌলা বালক মাত্র। সে সময় আমাদের পূর্বপুরুষরা রামজীবনের শ্বশুর রঘুদেব ঘোষাল কাঁটালপাড়ার মধ্যে জনৈক সঙ্গতি সম্পন্ন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। 

কিন্তু তাঁহার গৃহ তখন ক্ষুদ্র, আড়ম্বরশূন্য, বর্তমান চট্টোপাধ্যায় গৃহ হইতে পূর্বদিকে কিঞ্চিৎ দূরে পূর্বদিকে অবস্থিত ছিল। তাঁহার ঠাকুর মন্দির বা অতিথিশালা ছিল বলিয়া শুনি নাই। কিন্তু বাগান ও পুষ্করিণী যথেষ্ট ছিল। বহুকালের অর্জুনা দিঘী তখন ঘোষাল মহাশয়ের সম্পত্তি। এমনিই দিনে ১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে, একদা অপরাহ্নে জনৈক জটাজুটধারী সন্ন্যাসী বাধ্য হইয়া পুষ্করিণী তটে তরুচ্ছায়াতলে বিশ্রামার্থ উপবেশন করিলেন। তাঁহার কাঁধের উপর একটি দীর্ঘবিলম্বিত ঝুলি। ঝুলির ভিতরে রাধাবল্লভজিউ ছিলেন। সন্ন্যাসী ঝুলিটি নামাইয়া তরুচ্ছায়ায় উপবেশন করিলেন। নারায়ণ ব্রহ্মচারী নামক কোনও সন্ন্যাসী রাধাবল্লভ বিগ্রহকে আপন ঝুলিতে রাখিয়া দেশ-বিদেশ ঘুরিয়া বেড়াইতেন। তাঁহার মৃত্যুর পর তাঁহার ভ্রাতা বলরাম ব্রহ্মচারী উক্ত বিগ্রহ প্রাপ্ত হন। তিনিও তাঁহার সহোদদের ন্যায় ঠাকুরকে ঝুলিতে লইয়া দেশভ্রমণ করিয়া বেড়াইতেন। একদা তিনি ঘুরিতে ঘুরিতে কাঁটালপাড়ায় আসিয়া উপস্থিত হন। তথায় সাহার পুকুর নামে একটি জলাশয় ছিল। সেই জলাশয়ের পাড়ের উপর মাধবী বৃক্ষতলে ঠাকুর নামাইয়া ব্রহ্মচারী স্থানান্তর গমন করেন। প্রত্যাগত দেখলেন, যে ঠাকুর পশ্চিমমুখী ছিলেন, সে ঠাকুর পূর্বমুখী হইয়া দাঁড়াইয়া আছেন। তদ্দৃষ্টে তিনি চিন্তামগ্ন হইলেন। বুঝিলেন, ঠাকুরের তথায় অবস্থান করিতে বাসনা হইয়াছে। তিনি ঠাকুরকে তথায় রঘুনাথ ঘোষালের তত্ত্বাবধানে রাখিয়া মুর্শিদাবাদে চলিয়া গেলেন। জানি না, নবাবের নিকট তিনি কী প্রার্থনা করিলেন। কিন্তু নবাব তাঁহাকে কারারুদ্ধ করিলেন। নবাব কয়েক দিবস পরে ব্রহ্মচারীকে ছাড়িয়া কৃষ্ণনগরাধিপতিকে অনুজ্ঞা করেন, এই ব্রহ্মচারী যাহা প্রার্থনা করিবে তাহা গ্রাহ্য করিবে। রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের আজ্ঞা পাইয়া কাঁটালপাড়া গ্রামে দশ বিঘা ব্রহ্মোত্তর, দশ বিঘা দেবোত্তর, দশ বিঘা জমাই জমি দান করেন। এই জমি পাইয়া ব্রহ্মচারী কাঁটালপাড়ায় ঘর বাঁধিলেন ও বাস করিতে লাগিলেন। পরে পাট্টাদার দুর্গাপ্রসাদ চৌধুরীর পূর্বপুরুষের নিকট যাইয়া লক্ষণপুর এবং দোগাছা দেবোত্তর লয়েন। কিছুকাল পরে রঘুনাথ ঘোষালকে মন্ত্র প্রদান করেন; এবং দেহান্তরের অনতিপূর্বে তাঁহাকে ঠাকুর ও জমিজমা দান করেন।" 

 

বঙ্কিমের পূর্বপুরুষ সম্পর্কে তাঁর বংশধরদের স্মৃতিচারণা থেকে কিন্তু কিছুটা ভিন্ন মত পোষণ করেছিলেন মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। তিনি লিখছেন; প্রায় তিনশত বছর পূর্বে কাঁটালপাড়া গ্রামে এক দরিদ্র ঘোষাল ব্রাহ্মণের গৃহে একজন সন্ন্যাসী আসিয়া উপস্থিত হন। ঘোষালের স্ত্রী ও দুইটি কন্যা। তিনি অতি দরিদ্র, তাঁহার দিনপাত হওয়া কঠিন ছিল। তথাপি তিনি সপরিবারে সন্ন্যাসীর যথেষ্ট অতিথি-সৎকার করিলেন। দৈবক্রমে সন্ন্যাসী তাঁহার বাড়িতে পীড়িত হইয়া পড়িলেন। ঘোষাল মহাশয় বহুদিন যাবৎ প্রাণনাত করিয়া তাঁহার সেবা করিলেন। সন্ন্যাসী আরোগ্য লাভ করিয়া বলিলেন, "আমি তোমার সেবায় বড়ই সন্তুষ্ট হইলাম। আমার আর কিছুই নাই, এই রাধাবল্লভ বিগ্রহটি তোমায় দিয়া গেলাম, তুমি ইহার সেবা করিবে।" ঘোষাল মহাশয় কহিলেন, "আমার দিনই চলে না, কী করিয়া বিগ্রহের সেবা করিব।"

তিনি কহিলেন, "আমি আসা পর্যন্ত যেরূপ পারো চালাও, আমি আসিয়া তাহার ব্যবস্থা করিব।" কিছুদিন পরে সন্ন্যাসী ফিরিয়া আসিয়া রাধাবল্লভের নামে একখানি তালুক লিখিয়া দিয়া গেলেন। ঘোষাল মহাশয় বেশ সম্পন্ন লোক হইয়া উঠিলেন। ফুলেও বল্লভীমেলে দুই জন ভঙ্গ কুলীনের সঙ্গে দুইটি কন্যার বিবাহ দিলেন এবং জামাই দিগকে রাধাবল্লভের সেবার ভার দিয়া পরলোক গমন করিলেন। এই ফুলে মেলে যে জামাই হইল তাঁহারাই বংশে বঙ্কিমবাবুর জন্ম।   

 

(হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রচনাসংগ্রহ, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা-২৫১- ২৫২): বঙ্কিমের পরিবারের একটি প্রাচীন দলিল ( ১৭০১ খ্রিস্টাব্দে রচিত) থেকে জানতে পারা যাচ্ছে যে, বন্দরপুর গ্রাম থেকে নারায়ণ ব্রহ্মচারী ও তাঁর শিষ্য শম্ভু ঘোষাল নৈহাটি কাঁটালপাড়া গ্রামে এসে মন্দির নির্মাণ করে রাধাবল্লভের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কয়েকবছর তাঁরাই সেই বিগ্রহের সেবার কাজ করেছিলেন। কিছুদিন পরে নারায়ণ ব্রহ্মচারী প্রয়াত হন। তখন শম্ভু ঘোষালের পক্ষে একা রাধাবল্লভের নিত্য সেবা করা বেশ কষ্টকর হয়ে ওঠে। ওই অবস্থায় নারায়ণ ব্রহ্মচারী দুই ভাই লক্ষণ ও বলরাম ব্রহ্মচারী কাঁটালপাড়াতে এসে শম্ভু ঘোষালের ছোট ভাই রঘুদেব ঘোষালকে মন্ত্র দীক্ষা দেন এবং তার উপরেই রাধাবল্লভের সেবা ইত্যাদির দায়িত্ব অর্পণ করেন। এই লক্ষণ ঠাকুরকে বলরাম আবার চলে যান রায়পুরে। দশ বছর পরে লক্ষণ প্রয়াত হন এবং বলরাম ঠাকুর এসে কাঁটালপাড়া তে বসবাস করতে থাকেন। তিনি মৃত্যুকালে রঘুদেব ঘোষালকে সব দায়িত্ব দিয়ে যান। 

 

রাধাবল্লভের নতুন মন্দির নির্মাণ করেছিলেন রঘুদেব ঘোষাল পলাশী যুদ্ধের আগে ১৭৫৩ খ্রিস্টাব্দে। রঘুদেবের মৃত্যুর পর তাঁর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন তাঁর দৌহিত্র রামহরি চট্টোপাধ্যায়। বঙ্কিমচন্দ্রের বর্তমান নিবাসের অদূরে রাধাবল্লভের যে মন্দির আমরা দেখতে পাই, সেটিকে নির্মাণ করেছিলেন বঙ্কিমের পিতা যাদবচন্দ্র ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে।

 

রাধাবল্লভকে ঘিরে যে মেলা আজও নৈহাটি কাঁটালপাড়ায় হয় তার বয়স সার্ধশতবর্ষ অতিক্রান্ত। ১৮৬২ সালের রথযাত্রার দিন বঙ্কিমের জ্যেষ্ঠাগ্রজ শ্যামাচরণের উদ্যোগে কাঁটালপাড়ায় প্রথম রথ বার হয়েছিল। শ্যামাচরণ তখন ছিলেন মেদিনীপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি একটি কাঠের রথ তৈরি করেছিলেন। প্রথম রথটি সম্পূর্ণত কি কাষ্ঠ নির্মিত ছিল? তা নিয়ে কিন্তু সামান্য বিতর্ক আছে। কারণ হরপ্রসাদ শাস্ত্রী লিখেছেন; ‘রথখানি পিতলের, বেশ বড়’। 

 

বঙ্কিমের প্রথম জীবনীকার হেমেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত লিখেছেন; ‘রথখানি আগাগোড়া পিতলের তৈয়ারি নয়, প্রকৃতপক্ষে উহা কাষ্ঠনির্মিত। কাঠের রথ হিসেবে লোকে প্রথমে ইহাকে জানিত। পরে পিতলের পাত মোড়াই করা হয়। রথখানি প্রস্তুত হইয়াছিল তমলুকে। বঙ্কিমের জ্যেষ্ঠ সহোদর শ্যামাচরণ তখন তমলুকের ভারপ্রাপ্ত ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, তখন তিনি রথটি তৈয়ারী করাইয়া নৌকাযোগে রূপনারায়ণ ও গঙ্গা বাহিয়া কাঁটালপাড়া পাঠাইয়া দেন’। 

 

১২৬৯ বঙ্গাব্দের রথযাত্রার দিন বঙ্কিমের পরিবারে এই রথটির সূচনা হয়েছিল। আর সেইদিনই বঙ্কিমের পিতা যাদবচন্দ্রের নামাঙ্কিত যাদবেশ্বর শিব মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ওইদিনই প্রথম ইবি রেলওয়ে নৈহাটিতে ট্রেন চালিয়েছিল। 

 

 নৈহাটি রথের মেলা সম্পর্কে হরপ্রসাদ লিখছেন; ‘রথে খুব জাঁক হয়। বার মাস রথখানি গোল পাতার ছাউনিতে ঢাকা থাকে। রথের সময় বাহির করিয়া ঘষেমেজে চক চকে করিয়া নেওয়া হয়। রথের সময় বঙ্কিম বাবুদের বাড়ির দক্ষিণে একটা খোলা জায়গায় বেশ একটা মেলা হয়; প্রচুর পাকা কাঁঠাল ও পাকা আনারস বিক্রি হয়। তেলে ভাজা পাপড়, ফুলুরির গাঁদি লাগিয়া যায়। আট দশ খানা বড় বড় ময়রার দোকান বসে, গজা, জিলিপি, লুচি, কচুরি, মিঠাই, মিহিদানা, মুড়ি মুড়কি, মটর ভাজা, চিঁড়ে, চিঁড়ে ভাজা যথেষ্ট থাকে। আগে ঘিয়েরও খাজা থাকিত; এখন আর সেগুলি দেখিতে পাওয়া যায় না। মেলায় মনিহারি দোকান অনেকগুলি থাকে। তাহামতে নানা রকম বাঁশি, কাগজের পুতুল, কাঠের উপর লাফ দেওয়া হনুমান, কটকটে ব্যাঙ কিনিতে পাওয়া যায়। এসব তো গেল ছেলেদের। বুড়োদের একটি বড় দরকারী জিনিস এই মেলায় বিক্রি হয় - নানা রকম গাছের চারা ও কলম। আমাদের দেশে যাহারা বাগান করিতে চায়, তাহাদের চারা কিনিবার এই প্রধান সুযোগ। অনেক নারিকেলের চারা, আমের কলম, নেবুর কলম, সুপারির চারা, লকেট ফলের গাছ, গোলাপ জামের গাছ, পিচের গাছ, সবেদার গাছ, ফলসার গাছ এবং গোলাপ, জুঁই, জাতি বেল, নবমালিকা, কামিনী, গন্ধরাজ, মুচকুন্দ, বক, কুরচি, কাঞ্চন, টগর, শিউলি, প্রভৃতি নানা ফুলের চারা কলম পাওয়া যায়। মেলা আট দিন হয়। প্রথম প্রথম বলিয়া দিলে মালিরা যে কোন গাছের চারা পাওয়া যায় আনিয়া দিতে পারে’। 

 

হরপ্রসাদের এই বর্ণনার গাছের দোকান এখন আর নেই। হরপ্রসাদ যে গাছের দোকানের কথা উল্লেখ করেছেন সেই গাছের দোকানের গায়ে ছিল রেল লাইনের লোহার বেড়া। পাশ দিয়ে রেলগাড়ি যায়। প্রায় বছর কুড়ি আগেই নৈহাটি পৌরসভা বঙ্কিমবাবুর রথের মেলার ঐতিহ্যপূর্ণ ফল, ফুলের গাছের দোকানের ওই অংশটিতেই জলের পাম্পের ঘর তৈরি করে সেই সব দোকান বসবার ব্যবস্থাটি চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে। ভাবতে খারাপ লাগে মফস্বলের নাট্যজগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব রবীন ভট্টাচার্য সেই সময় নৈহাটি পুরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। নৈহাটির ঐতিহ্য ঘিরে বহু গালভরা কথা সেই সময় পুরসভার পক্ষ থেকে বলা হলেও বঙ্কিমচন্দ্রের সময়কাল থেকে তাঁর পরিবারের গৃহদেবতাকে কেন্দ্র করে যে রথের মেলা, সেখানে যে গাছের দোকান বসত, সেই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখবার জন্য তৎকালীন পুরসভা ন্যূনতম কোনও উদ্যোগ নেয়নি।