আর্জেন্টিনা - ২ (মেসি)

অস্ট্রিয়া - ০

আজকাল ওয়েবডেস্ক: ডালাস মেসিময়, থুরি বিশ্বকাপ মেসিময়। হ্যাটট্রিকের পর জোড়া গোল। ফুটবল জীবনের শেষ বিশ্বকাপে সেরা পারফরম্যান্স। দুই ম্যাচে পাঁচ গোল মেসির। আর্জেন্টিনার গোল সংখ্যাও তাই। সোমবার ভারতীয় সময় মধ্যরাতে অস্ট্রিয়াকে ২-০ গোল হারিয়ে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের ছাড়পত্র সংগ্রহ করল আর্জেন্টিনা। মেসি -২, অস্ট্রিয়া - ০। একদিকে আরেক বিশ্বতারকা নিষ্প্রভ। সমালোচনায় বিদ্ধ। অন্যদিকে প্রত্যেক দিন জ্বলে উঠছেন ৪০ ছুঁইছুঁই মেসি। হ্যাটট্রিক করে ২০০তম ম্যাচ স্মরণীয় করে রেখেছেন লিও। ৩৯তম জন্মদিনের দু'দিন আগেও হ্যাটট্রিকের সুযোগ এসেছিল। পেনাল্টি মিস না করলে, দুই ম্যাচে আধ ডজন গোল হয়ে যেত ফুটবলের রাজপুত্রের।

লা আলবিসিলেস্তেদের জয়ের একমাত্র কাণ্ডারি মেসি। বুড়ো হাড়েও একাই টানছেন দলকে। ম্যাচের ৩৮ মিনিটে বিশ্বমঞ্চে ১৭তম গোল করে মিরোস্লাভ ক্লোজেকে টপকে সর্বোচ্চ গোলের মালিক হন। ম্যাচের ৯০+৫ মিনিটে ২-০। তিলেন নেন বিশ্বকাপের ১৮তম গোল। দ্বিতীয় গোল অনবদ্য। আলভারেজকে লক্ষ্য করে বাঁ প্রান্তে বল বাড়ান মেসি। তাঁর শট প্রতিহত হয়। ফিরতি বলে শট মারেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। কিন্তু গোল হয়নি। দ্বিতীয় সুযোগে চারজনের পায়ের ফাঁক দিয়ে বল জালে রাখেন মেসি। দারুণ গোল। প্রাণখোলা উচ্ছ্বাস। অনেকদিন পর মেসির মুখে এমন সাবলীল হাসি দেখা গেল। কেন তিনি বিশ্বফুটবলে সর্বকালের সেরা, সেটা বারবার প্রমাণ করছেন।

মার্কিন মুলুকে পা রেখেই হ্যাটট্রিক। বিশ্বকাপে প্রথমবার। সবচেয়ে কনিষ্ঠ এবং বর্ষীয়ান ফুটবলার হিসেবে বিশ্বমঞ্চে গোলের নজির। দ্বিতীয় ম্যাচে বিশ্বকাপে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা। ১৭তম গোল করে ছাপিয়ে যান মিরোস্লাভ ক্লোজেকে। বিশ্বকাপে গোলের নিরিখে সর্বকালের সেরা। দুই বিশ্বতারকার ভাগ্যের পরিহাস সম্পূর্ণ বিপরীত। একদিকে যখন সমালোচনার তীরে বিদ্ধ ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, সবুজ গালিচার ফুল ফোটাচ্ছেন মেসি। আবার নাম লেখান ইতিহাসে। একইসঙ্গে মেসির জোড়া গোলে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনা। দুই দলের মধ্যে পার্থক্য মেসির ইতিহাস। 

ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল। ওয়ান টাচ খেলে ম্যাচের তিন মিনিটের মধ্যে বিপক্ষের বক্সে ঢুকে পড়ে আর্জেন্টিনার স্ট্রাইকাররা। লাওতারো মার্টিনেজকে ফাউল করেন অস্ট্রিয়ার ডিফেন্ডাররা। পেনাল্টির দাবি করেন আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা। প্রথমে দেননি রেফারি। তারপর VAR এ পরীক্ষা করে পেনাল্টি দেন। ২০০তম ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেন মেসি। ৩৯তম জন্মদিনের দু'দিন আগে আরও একটি মাইলস্টোন ছোঁয়ার প্রহর গুনছিল গোটা বিশ্ব। কিন্তু অবিশ্বাস্য মিস। মাত্র চারদিন আগে হ্যাটট্রিক করা মেসি, মিস করেন পেনাল্টি। ম্যাচের ৯ মিনিটে বাঁ পায়ের গড়ানো শট তেকাঠিতে রাখতে পারেননি মেসি। বল বাইরে যায়। দু'হাত দিয়ে মুখ ঢাকেন। নিজেও বিশ্বাস করতে পারেননি। পেনাল্টি মারার সময় মেসির শরীরীভাষা কিছুটা ক্যাজুয়াল ছিল। থমকে গিয়ে শট নেন। 

রেকর্ডের চাপ মেসির ওপরও! বিশ্বকাপে পেনাল্টি মিসের হ্যাটট্রিক। এর আগে দু'বার মিস করেন। চার বছর আগে পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে শেষবার পেনাল্টি মিস করেন আর্জেন্টাইন তারকা। ম্যাচের ১৯ মিনিটে আবার রেকর্ডের সুযোগ। এবারও মিস। বাঁ দিক থেকে একটি লুজ বল পান মেসি। ঘাড়ে দু'জন ডিফেন্ডারকে নিয়ে বক্সে ঢুকে পড়েন। কিন্তু গোলে শট নেওয়ার আগেই অস্ট্রিয়ার গোলকিপার স্কালাগারের পায়ে লেগে বিপদমুক্ত হয়। শুরুটা ভাল করেছিল আর্জেন্টিনা। ৪-৪-২ ফরমেশনে দল সাজান লিওনেল স্কালোনি। সামনে লাওতারো মার্টিনেজ এবং লিওনেল মেসি। প্রথম থেকেই অস্ট্রিয়ার রক্ষণকে চাপের মুখে ফেলে। কিন্তু মেসির পেনাল্টি মিসের পর গোটা দলের ছন্দপতন হয়। তাল কেটে যায়। সুযোগ কাজে লাগিয়ে ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করে রালফ রাগ্নিকের দল। কয়েকবার কাউন্টার অ্যাটাক থেকে বিপদ সৃষ্টি করার চেষ্টাও করে। কিন্তু বেশিক্ষণ বল পায়ে রাখতে ব্যর্থ অস্ট্রিয়ার ফুটবলাররা। পজেশনাল ফুটবল খেলে আবার খেলা নিজেদের দখলে নিয়ে নেয় আর্জেন্টিনা। 

ম্যাচের ৩২ মিনিটের মাথায় আবার গোলের সুযোগ নষ্ট। এনজোর শট বাঁচান অস্ট্রিয়ার গোলকিপার। ফিরতি বলে মেসির শট ব্লক করে দেয় বিপক্ষের রক্ষণ। প্রথমার্ধের মাঝামাঝি মনে হয়েছিল, দিনটা হয়ত মেসির নয়। কিন্তু অদৃশ্যে হেসেছিলেন ফুটবল ঈশ্বর। পেনাল্টি মিসের ২৯ মিনিটের মধ্যেই শাপমুক্তি। ম্যাচের ৩৮ মিনিটে মেসির গোলে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। কাউন্টার অ্যাটাক থেকে আক্রমণে ওঠে আর্জেন্টিনা। হুগো আলমাডার থেকে বল পান মেডিনা। এবার আর ভাগ্য আটকাতে পারেনি এলএমটেনকে। বল চলে যায় গোলে। রেকর্ড স্পর্শ করেই শুরু সেলিব্রেশন। পুরো দল ঘিরে ধরে মেসিকে। উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে স্টেডিয়াম। 

ম্যাচের স্টপেজ টাইমে তিন পয়েন্ট নিশ্চিত করেন মেসিই। আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে অনায়াসে জিতেছিল আর্জেন্টিনা। কিন্তু এদিন যথেষ্ট কসরত করতে হয়। পুরোপুরি একপেশে ম্যাচ হয়নি। বার তিনেক গোলের নিচে সতর্ক থাকতে হয় বিশ্বকাপজয়ী গোলকিপারকে। ম্যাচের ৫৫ মিনিটে দুর্গ রক্ষা করেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ। এছাড়াও বেশ কয়েকবার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝি বল ধরে খেলার চেষ্টা করে অস্ট্রিয়া। কিন্তু আর্জেন্টিনার রক্ষণ ভেঙে গোলমুখ খুলতে পারেনি রাগ্নিকের দল। আর্জেন্টিনা জিতলেও, দলের খেলা বেশ কিছু প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ফিনিশিংয়ের অভাব। একাধিক গোল মিস। কোনও ম্যাচে মেসি আটকে গেলে, গোল করার লোকের অভাব। এখনও পর্যন্ত এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়নি। কিন্তু নকআউট পর্বে কঠিন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। মেসি না পারলে, গোল করবেন কে? এছাড়াও নড়বড়ে রক্ষণ খেতাব ধরে রাখার লড়াইয়ে স্কালোনির বড় চিন্তা হতে পারে।