সৌরভ গোস্বামী: মক্সিকোর সোনোরা প্রদেশ থেকে উঠে এসেছে এক অনন্য লড়াইয়ের গল্প। সাধারণত ফুটবল বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে ঝাঁ-চকচকে স্টেডিয়াম, তারকা খেলোয়াড় আর কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য। কিন্তু ফিফার এই চেনা কর্পোরেট মডেলকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সম্পূর্ণ এক ভিন্ন যুদ্ধের ডাক দিয়েছেন মেক্সিকোর আদিবাসী ফুটবলাররা। নিজেদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং বিশ্বমঞ্চে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিতে তাঁরা গড়ে তুলেছেন এক নিজস্ব ‘আদিবাসী জাতীয় ফুটবল দল’। তাঁদের এই উদ্যোগ কোনও ব্যবসার জন্য নয়, বরং এর মূল ভিত্তি হলো নিজস্ব গোষ্ঠীস্বার্থ ও সামাজিক প্রতিরোধ।

এই দলের সংগঠকদের লক্ষ্য অত্যন্ত স্পষ্ট। তাঁরা চান মেক্সিকোর স্বীকৃত ৬৮টি আদিবাসী গোষ্ঠীকে একত্রিত করে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ‘আদিবাসী জাতীয় কাপ’ আয়োজন করতে। বর্তমানে সোনোরা অঞ্চলের মায়ো, সেরি এবং ইয়াকি সম্প্রদায়ের যুবকদের নিয়ে এই দলটির যাত্রা শুরু হয়েছে। এই ফুটবলারদের কাছে খেলার মাঠ কেবল গোল করার জায়গা নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। যে সোনোরা অঞ্চল দশকের পর দশক ধরে তীব্র খরা আর অবহেলার শিকার, সেখানকার মানুষের কাছে ফুটবল হল এক প্রকার বাঁচার লড়াই। এই খেলার মাধ্যমে তাঁরা তরুণ প্রজন্মকে অপরাধ জগৎ, মাদকাসক্তি এবং অ্যালকোহলের অন্ধকার থেকে দূরে সরিয়ে এনে এক সুস্থ জীবনের আলো দেখাতে চান।

আদিবাসী ফুটবলারদের এই লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা এসেছিল ব্রাজিলের আদিবাসী ফুটবল দলের পক্ষ থেকে পাওয়া একটি আমন্ত্রণকে কেন্দ্র করে। মেক্সিকোর এই দলটির এখন স্বপ্ন, ব্রাজিলে গিয়ে তাদের মুখোমুখি হওয়া এবং বিশ্ববিখ্যাত ফুটবল তারকা রোনালদিনহোকে এই মহৎ উদ্যোগের অভিভাবক হিসেবে পাশে পাওয়া। আন্তর্জাতিক স্তরে মেক্সিকোর নাম উজ্জ্বল করার পাশাপাশি নিজেদের অধিকার বুঝে নেওয়াই তাঁদের মূল লক্ষ্য। তবে এই স্বপ্নযাত্রার পথটি একেবারেই মসৃণ নয়। এই বড় প্রজেক্টটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন প্রচুর আর্থিক সহযোগিতা ও পরিকাঠামো, যা তাঁদের কাছে নেই। এর মধ্যেই তাঁরা দেশের খোদ রাষ্ট্রপতির দরবার পর্যন্ত কড়া নেড়েছেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এখনো পর্যন্ত কোনও  সরকারি সাহায্য বা সদুত্তর মেলেনি।

তবুও এক বুক জেদ আর ফুটবলকে বুকে আঁকড়ে ধরে মাঠ কামড়ে পড়ে আছেন এই যুবকেরা। বহুজাতিক পুঁজির বাজারে যেখানে খেলাধুলা কেবলই এক পণ্য, সেখানে মেক্সিকোর এই আদিবাসী দল প্রমাণ করে দিচ্ছে যে ফুটবল এখনো মানুষের আত্মপরিচয় ও প্রতিরোধের ভাষা হতে পারে। কর্পোরেট ফুটবলের জমকালো দুনিয়া হয়তো তাঁদের দিকে এখনো নজর দেয়নি, কিন্তু নিজেদের শিকড়কে আঁকড়ে ধরে তাঁদের এই নিঃশব্দ বিপ্লব আগামী দিনে বিশ্ব ফুটবলের চেনা সমীকরণকে বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।