অর্শিতা দাস

চার বছর অন্তর এই একটা মাস সাধারণত রাতে ঘুমোয় না বাঙালি। কলকাতার কোনও পাড়া হয়ে ওঠে ব্রাজিল, কোনও পাড়া আর্জেন্টিনা আবার কোনও পাড়া মেসি কিংবা রোনাল্ডো কিংবা নেইমার। 

এখনও অবশ্য টুকটাক এমবাপ্পে, ভিনিসিয়াস জুনিয়র বা হালান্ডও চোখে পড়তে পারে। এই বছর যেমন পাড়ায় পাড়ায় পতাকা, প্রিয় ফুটবলারের কাট-আউট, পোস্টার, ব্যানার দেখলে মনেই হবে না যে ফুটবল বিশ্বকাপ হচ্ছে সুদূর মার্কিন মুলুকে।

কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা হল, যে ট্রফিটার জন্য ৪৮টা দল জানপ্রাণ দিয়ে লড়ছে সেই ট্রফিটা এখন কলকাতায় রয়েছে। এই লাইনটা পড়ে অনেকেই ঘাবড়ে যেতে পারেন।

খেলা হচ্ছে বিশ্বের এক প্রান্তে আর ট্রফি কিনা বিশ্বের আর এক প্রান্তে! বর্তমানে কলকাতায় থাকা বিশ্বকাপটা দেখলে মনে হবে সেরকমই। উত্তর ২৪ পরগনা জেলার সোদপুরের ছেলে সায়ন বসাকের নিজের হাতে বানানো এই বিশ্বকাপ ট্রফি এতটাই নিখুঁত।

তবে এতটা পারফেকশন তো একদিনে আসে না। আজ প্রায় ১০ বছর হতে চলল এই ধরনের মডেল বানাচ্ছে সায়ন। শুধু ফুটবল বিশ্বকাপ নয়, ইডেন গার্ডেন্স, লর্ডস, টাইটানিক, নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়াম অনেক কিছুই নিজের হাতে বানিয়েছে সে।

এই ভাবনাটা এল কীভাবে?

সায়নের কথায়, ‘২০১৬ সালে প্রথম মডেল বানানো আমার। তখন সেভেন-এইটে পড়ি। ইডেনে প্রথম আমার খেলা দেখতে যাওয়া বাবার সঙ্গে। নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ইন্ডিয়ার ম্যাচ ছিল। বিরাট কোহলি ক্যাপ্টেন, ভুবনেশ্বর কুমার খেলছে, মহম্মদ সামি দুরন্ত ফর্মে। সব মিলিয়ে একটা মেমোরেবল ম্যাচ ছিল আমার কাছে। তারপর বাড়িতে এসে ভেবেছিলাম ইডেন গার্ডেন্সের একটা মডেল বানাব। সেই শুরু।’

এরপর বছর গড়িয়েছে, দু’দুটো ফুটবল বিশ্বকাপ হয়েছে, ভারতের মাটিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ হয়েছে, একদিনের ক্রিকেটের বিশ্বকাপ হয়েছে। বছর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সায়নের দক্ষতা বেড়েছে আরও।

খেলা ছাড়াও বিভিন্ন জিনিসের মডেল তৈরি করেছে সে। সায়নের কথায়, ‘২০১৯ সালে আমি একটা ইউটিউব চ্যানেল খোলার প্ল্যান করি। তার আগে অনেক রকম কন্টেন্ট ভেবেছিলাম করব। তারপরে বন্ধুরাও আমাকে বলে এরকম একটা চ্যানেল খুলে ভিডিও করতে। সেখানে ইডেন গার্ডেন্স নিয়েই ভিডিও আপলোড করেছিলাম। পরে লর্ডস স্টেডিয়াম বানিয়েছিলাম, সেটার ভিডিও করি। AK-47 এর একটা মডেল বানিয়েছিলাম সেটা ভিডিও করি।’

তারপর ২০২০ সালে করোনা অতিমারির সময়ে প্রায় দেড় মাস-আড়াই মাস ধরে টাইটানিকের মডেল তৈরি করেছিল সায়ন। তবে এখনও পর্যন্ত সে যা যা বানিয়েছে তার বেশিরভাগটাই ফেলে দেওয়া জিনিসপত্র ব্যবহার করে। 

তার কথায়, ‘আমি বিভিন্ন ধরনের বোর্ড জমিয়ে রাখতাম মডেলের কাজে ব্যবহারের জন্য। বিভিন্ন ফুড প্যাকেটের বোর্ডগুলো যেরকম, তারপর জামাকাপড়ের ভিতরে যে বোর্ডগুলো থাকে সেই সমস্ত বোর্ড। ডিমের ট্রে, ফুড প্যাকেটের বাক্সগুলো রেখে দিতাম। ওগুলোকে জুড়ে আঠা দিয়ে বানাতাম। এখনও ওয়েস্ট মেটেরিয়ালই বেশি লাগে। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে মার্কেট থেকে কেনা বোর্ডটা বেশি ব্যবহার করি কারণ যাতে জিনিসটা ভাল থাকে। মেটেরিয়ালসটা ভালো হলে প্রেজেন্টেশনটা আরও ভাল হবে।’

বর্তমানে সায়নের সংগ্রহে রয়েছে আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়াম, ইডেন গার্ডেন্স, লর্ডস, মুম্বইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম, গুয়াহাটির বর্ষাপাড়া স্টেডিয়াম, বেঙ্গালুরুর চিন্নাস্বামী সহ একাধিক স্টেডিয়ামের মডেল।

২০২১ সালে প্রথম অর্ডার আসে সায়নের কাছে। সে জানায়, ‘২০২১ সালে আমার বাড়ির কাছেই একজন অর্ডার করেন যে তাঁর ছেলের জন্য একটা ইডেন গার্ডেন্সের মডেল লাগবে। ২ ফুট মতো বেস নিয়ে স্কোয়্যার। তবে কিছু সমস্যার জন্য তিনি আমার থেকে আর মডেলটা নিতে পারেননি। আমাকে ২০০ টাকা অ্যাডভান্স করেছিলন। সেটাই আমার জীবনের প্রথম রোজগার।’

তবে মডেলটা বাড়িতে পড়ে থাকায় ফেসবুকে পোস্ট করেছিল সায়ন। সেটা এতটাই ভাইরাল হয়ে যায়, পরবর্তীকালে সিএবির তরফে যোগাযোগ করা হয় সায়নের সঙ্গে। পরে তৎকালীন সিএবি সভাপতি অভিষেক ডালমিয়ার হাতে মডেলটা তুলে দেয় সে।

ভাইরাল হওয়ার পর ধীরে ধীরে অনলাইনে আরও অর্ডার আসতে শুরু করে। ট্রেনের মডেল, লোকাল ট্রেন, এসি লোকাল, আইসিএফ লোকাল, ট্রেনের ইঞ্জিনের মডেলের অর্ডার এসেছে একাধিক।

বিশ্বকাপ বানাতে কী কী লেগেছে?

সায়নের কথায়, ‘এই যে এই ট্রফিটা বানিয়েছি, এই ট্রফিটার ক্ষেত্রে আমি যে মেটেরিয়ালসগুলো ইউজ করেছিলাম তার মধ্যে রয়েছে প্লাস্টিকের ওয়াটার বটল। সেটা দিয়েই করেছি। তার ওপরেই বেস করে হয়েছে পুরোটা। বাকি খবরের কাগজ, ফয়েল, অ্যালুমিনিয়াম ফয়েল এগুলো ব্যবহার করেছি।’

ভবিষ্যতে কী ভাবনা?

‘আরও প্ল্যানিং আছে, ইন ফিউচারে যেটা আমি এখনও পর্যন্ত কমপ্লিট করতে পারিনি। সেভেন ওয়ান্ডার্স অফ ওয়ার্ল্ড, সেটা কমপ্লিট করা। আরও নতুন নতুন মডেল, ট্রেনের একটা সিরিজ নিয়ে আসার ইচ্ছা আছে। স্টেডিয়ামের সিরিজ নিয়ে আসার ইচ্ছা আছে আরও।’

বর্তমানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তরের ছাত্র সায়ন। বিশ্বকাপে কট্টর ব্রাজিল সমর্থক সে। আবার মেসিরও ভক্ত। ইস্টবেঙ্গল সমর্থক সায়নের ইচ্ছে, ভবিষ্যতে ক্রীড়া সাংবাদিক হবে।