আজকাল ওয়েবডেস্ক: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানালেন অজিঙ্কে রাহানে। বিদায়বেলায় অনন্য এক রেকর্ডের মালিক তিনি। 

ভারতের টেস্ট ইতিহাসে তিনি এমন এক বিরল কীর্তির মালিক, যা খুব কম অধিনায়কের ভাগ্যেই জুটেছে।

ভারতের হয়ে ছ'টি টেস্টে অধিনায়কত্ব করে রাহানে কখনও হারেননি। তাঁর নেতৃত্বে ভারত জিতেছে চারটি ম্যাচ এবং দু'টি ম্যাচ ড্র করেছে। ভারতের ৩৮ জন টেস্ট অধিনায়কের মধ্যে মাত্র চারজনই অপরাজিত থেকে নেতৃত্বের অধ্যায় শেষ করেছেন। তবে তাঁদের মধ্যে একমাত্র রাহানেই বিদেশের মাটিতে ঐতিহাসিক টেস্ট সিরিজ জয়ের স্বাদ পেয়েছেন।

ভারতের অপরাজিত টেস্ট অধিনায়কদের তালিকা:

  • অজিঙ্কা রাহানে – ৬ টেস্ট, ৪ জয়, ২ ড্র
  • কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত – ৪ টেস্ট, ৪ ড্র
  • রবি শাস্ত্রী – ১ টেস্ট, ১ জয়
  • হেমু আধিকারী – ১ টেস্ট, ১ ড্র

রাহানের নেতৃত্বের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় ২০২০-২১ সালের বর্ডার-গাভাস্কর ট্রফি। অ্যাডিলেডে মাত্র ৩৬ রানে অলআউট হয়ে বড় পরাজয়ের পর সিরিজে ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। সেই সময় নিয়মিত অধিনায়ক বিরাট কোহলি পিতৃত্বকালীন ছুটিতে দেশে ফিরে গেলে নেতৃত্বের দায়িত্ব এসে পড়ে রাহানের কাঁধে।

দায়িত্ব পেয়েই মেলবোর্ন টেস্টে খেলেন দুর্দান্ত ১১২ রানের ইনিংস। তাঁর সেঞ্চুরির উপর ভর করে ভারত শুধু ম্যাচই জেতেনি, সিরিজেও সমতা ফিরিয়ে আনে। সেই ইনিংস দলের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এরপর একের পর এক চোটে ছিটকে যান ভারতের প্রথম সারির অনেক ক্রিকেটার। সুযোগ পান মহম্মদ সিরাজ, শুভমান গিল, ওয়াশিংটন সুন্দর, শার্দুল ঠাকুর ও টি নটরাজনের মতো তরুণরা। রাহানের শান্ত নেতৃত্ব এবং তরুণদের প্রতি আস্থাই হয়ে ওঠে দলের সবচেয়ে বড় শক্তি।

সিরিজের শেষ টেস্টে গাব্বায় শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জিতে নেয় ভারত। সেই জয়ের মাধ্যমে ব্রিসবেনে অস্ট্রেলিয়ার ৩২ বছরের অপরাজিত থাকার রেকর্ড ভেঙে ইতিহাস গড়ে ভারত। ক্রিকেটবিশ্বে এটি আজও ভারতের অন্যতম সেরা টেস্ট সিরিজ জয় হিসেবে বিবেচিত হয়।

আন্তর্জাতিক কেরিয়ারে বহু স্মরণীয় ইনিংস উপহার দিলেও অজিঙ্কে রাহানের নাম সবচেয়ে বেশি স্মরণ করা হবে তাঁর ধীরস্থির নেতৃত্ব, কঠিন সময়ে দলের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা এবং অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ঐতিহাসিক সেই সিরিজ জয়ের জন্য।  

৮৫টি টেস্ট, ৯০টি ওয়ানডে এবং ২০টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করা রাহানে বলেন, “জীবনের প্রতিটি কিছুরই শুরু ও শেষ আছে। আমি সবসময় ব্যাটিংয়ে সঠিক সময়ের ওপর বিশ্বাস করেছি। আজ মনে হচ্ছে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর এটাই সঠিক সময়।” রাহানের ব্যাটিংয়ের আসল অস্ত্রই হল টাইমিং। ঠিকঠাক ব্যাটে বলে হলে, সেই বল যেত গ্যালারিতে। 

মুম্বাইয়ের ডোম্বিভলি থেকে প্রতিদিন অনুশীলনে যাওয়া এক কিশোরের স্বপ্ন ছিল একদিন ভারতের জার্সি পরে খেলা। সেই স্বপ্নপূরণ হয় ২০১১ সালে টি-টোয়েন্টি অভিষেকের মাধ্যমে। একই বছর ওয়ানডে এবং ২০১৩ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দিল্লিতে টেস্ট অভিষেক হয় তাঁর।

বিদেশের মাটিতে ভারতের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ব্যাটার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন রাহানে। ২০১৪ সালে নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটনে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি করার পর একই বছরে লর্ডসে ১০৩ রানের ইনিংস খেলে ২৮ বছর পর ইংল্যান্ডের ঐতিহাসিক মাঠে ভারতকে টেস্ট জয় এনে দেন। এরপর ২০১৪-১৫ অস্ট্রেলিয়া সফরে মেলবোর্নে ১৪৭ রানের দুর্দান্ত ইনিংস তাঁর কেরিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে ওঠে। ২০১৫ বিশ্বকাপেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তিনি। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৭৯ রানের ইনিংস খেলে ভারতের জয়ে বড় ভূমিকা রাখেন।

তবে রাহানের আন্তর্জাতিক কেরিয়ার কখনওই মসৃণ ছিল না। সীমিত ওভারের দলে বারবার জায়গা হারিয়েছেন, পরে টেস্ট ক্রিকেটেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। কিন্তু সেখানেও বাদ পড়া ও প্রত্যাবর্তনের লড়াই চলেছে বারবার। গত কয়েক বছর ধরে তিনি আর টেস্ট দলে জায়গা পেতেন না। সেই অভিমান নিয়েই একপ্রকার সরে  গেলেন রাহানে। 

অজিঙ্ক রাহানের কেরিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় ২০২০-২১ সালের অস্ট্রেলিয়া সফর। অ্যাডিলেডে মাত্র ৩৬ রানে অল আউট হওয়ার পর অধিনায়ক বিরাট কোহলি দেশে ফিরে যান। নেতৃত্বের দায়িত্ব পান তিনি। মেলবোর্ন টেস্টে দুর্দান্ত সেঞ্চুরি করে দলকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করেন। তাঁর শান্ত ও বিচক্ষণ নেতৃত্বে ইনজুরিতে জর্জরিত ভারতীয় দল ব্রিসবেনে ঐতিহাসিক জয় তুলে নিয়ে ২-১ ব্যবধানে সিরিজ জিতে বর্ডার-গাভাস্কর ট্রফি ধরে রাখে। ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা বিদেশ সফরের সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয় সেই সিরিজ।

অস্ট্রেলিয়া সফরের পর রাহানের ব্যাটে ধার কমতে শুরু করে। ২০২২ সালে টেস্ট দল থেকে বাদ পড়লেও ২০২৩ সালে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে আবারও দলে ফেরেন। ওভালে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম ইনিংসে ৮৯ ও দ্বিতীয় ইনিংসে ৪৬ রান করে ভারতের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হন। এরপর ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে শেষবারের মতো ভারতের জার্সি গায়ে মাঠে নামেন। তারপর আর জাতীয় দলে ফেরা হয়নি তাঁর।

কেরিয়ারে রাহানে ৮৫টি টেস্টে ৫,০৭৭ রান করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে ১২টি শতরান। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর সংগ্রহ ৮ হাজারের বেশি রান। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ডের কঠিন কন্ডিশনে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের জন্য তিনি প্রশংসিত হয়েছিলেন।

ব্যাট-প্যাড তুলে রাখার সময়ে আবেগঘন ভিডিওবার্তায় রাহানে বলেন, “আমি সবসময় সততার সঙ্গে ক্রিকেট খেলেছি। আমার আন্তর্জাতিক অধ্যায় শেষ হলেও ক্রিকেটের সঙ্গে আমার পথচলা শেষ হচ্ছে না। আগামী প্রজন্মকে সাহায্য করতে চাই, তাদের সঙ্গে এই খেলার মূল্যবোধ ভাগ করে নিতে চাই।”

তিনি ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড, মুম্বই ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন, সতীর্থ, কোচ, বিভিন্ন আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি, স্ত্রী রাধিকা, পরিবার, বন্ধু এবং সমর্থকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

ভিডিওর শেষ অংশে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন রাহানে। চোখের জল ধরে রাখতে না পেরে বলেন, “আমার নাম অজিঙ্কা, যার অর্থ অপরাজেয়। কিন্তু ক্রিকেট আমাকে অনেকবার হারতে শিখিয়েছে। ম্যাচ হেরেছি, ভুল করেছি, কিন্তু একটা জায়গায় আমি কখনও হারিনি,সেটা আপনাদের হৃদয়ে আমি চিরকাল জায়গা করে নিয়েছি।”

মারাঠি ভাষায় সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, “আপনারা সবসময়ে আমাকে আপনজনের মতো ভালবেসেছেন। আপনাদের ভালবাসা, বিশ্বাস ও সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ।”

তিনি শেষ করেন তাঁর আন্তর্জাতিক অধ্যায়, “ক্যাপ নম্বর ২৭৮, সাইনিং অফ।”