চলতি ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের ধামাকায় কাঁপছে গোটা বিশ্ব। ৩৯ বছর বয়সে লিওনেল মেসির অতিমানবীয় হ্যাটট্রিক হোক বা মরোক্কো-ব্রাজিলের হাই-ভোল্টেজ টক্কর— রাত জেগে টেলিভিশনের পর্দা বা ওটিটি স্ক্রিনে চোখ রাখা এখন কোটি কোটি ক্রীড়াপ্রেমীর রোজকার রুটিন। কিন্তু প্রিয় দলের খেলা দেখার এই টানটান উত্তেজনার আড়ালে আপনার শরীরী দেওয়াল যে নিঃশব্দে ভেঙে পড়ছে, সে খেয়াল রাখছেন কি?
খেলা দেখা অবশ্যই নিখাদ বিনোদন এবং এটি শরীরে ‘হ্যাপি হরমোন’-এর ক্ষরণ বাড়ায়। কিন্তু তা যদি আপনার দৈনিক ঘুমের কোটা কেড়ে নেয়, তবে আখেরে ক্ষতি আপনারই। চিকিৎসা বিজ্ঞান কী বলছে? রাত জেগে খেলা দেখার আনন্দ বজায় রেখেও কীভাবে শরীর সুস্থ রাখবেন? জেনে নিন এই।
বয়স অনুযায়ী কার কতটা ঘুম দরকার, তার একটি নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক মাপকাঠি রয়েছে। বিশেষ করে বাড়ির শিশু-কিশোরদের খেলা দেখার উৎসাহ বেশি থাকলেও, ওদের ঘুমের দিকে কড়া নজর রাখা প্রয়োজন:
৩ থেকে ৫ বছর ১০ - ১৩ ঘণ্টা
৬ থেকে ১২ বছর ৯ - ১২ ঘণ্টা
কৈশোর (১৩-১৯ বছর) ৮ - ১০ ঘণ্টা
প্রাপ্তবয়স্ক (২০+ বছর) ৭ - ৯ ঘণ্টা
দিনের পর দিন প্রয়োজনের চেয়ে কম ঘুমালে কেবল যে পরের দিন ক্লান্ত লাগবে বা হাই উঠবে, তা নয়। এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী:
দুর্ঘটনার ঝুঁকি: ঘুমের অভাবে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা কমে যায়। ফলে রাস্তা পারাপার বা গাড়ি চালানোর সময় মারাত্মক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।
মানসিক অস্থিরতা ও মেজাজ বিগড়ানো: মনোযোগের অভাব ঘটে, সহজ কাজও কঠিন মনে হয়। খিটখিটে মেজাজের কারণে নষ্ট হয় ব্যক্তিগত ও সামাজিক সম্পর্ক।
স্বাস্থ্যঝুঁকি: পরোক্ষভাবে এই অনিয়ম উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও ডায়াবেটিসের মতো মারণ রোগকে ত্বরান্বিত করে।
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: রাত জাগলেই বাড়ে ভাজাভুজি বা প্রসেসড স্ন্যাকস খাওয়ার প্রবণতা, যা মোটা হওয়ার মূল কারণ।
খেলাধুলো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য দারুণ উপকারী। তাই খেলা বন্ধ করার কোনো প্রয়োজন নেই, দরকার শুধু একটু স্মার্ট প্ল্যানিং -
১. ম্যাচ ফিল্টারিং: সব ম্যাচ লাইভ দেখার প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র প্রিয় দল বা ‘হাই-ভোল্টেজ’ ম্যাচগুলো লাইভ দেখুন। বাকিগুলোর জন্য পরের দিন সকালে হাইলাইটস বা রেকর্ডেড টেলিকাস্টের ওপর ভরসা রাখুন।
২. স্লিপ ম্যানেজমেন্ট : কোন দিন কোন খেলা দেখবেন তা আগেভাগে ঠিক করে রাখুন। খেলার আগে বা পরে ছোট ছোট ঘুমের কোটা পূরণ করে নিন।
৩. ঘুম না এলেও বিশ্রাম: অনেক সময় শত চেষ্টা করলেও ঘুম আসে না। সেক্ষেত্রে চোখ বুজে গা এলিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকুন। এটিও শরীরকে স্বস্তি দেয়।
৪. হেলদি স্ন্যাকিং: রাত জেগে খেলা দেখার সময় চিপস বা কোল্ড ড্রিঙ্কসের বদলে ড্রাই ফ্রুটস, ফল বা স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিন।
ম্যাচ শেষ হওয়ার পরেও অনেকের ঘুম আসতে চায় না। এর বৈজ্ঞানিক কারণ হল উত্তেজনার ফলে শরীরে ‘অ্যাড্রেনালিন’ হরমোনের ক্ষরণ বেড়ে যাওয়া। তাই খেলা শেষের সঙ্গে সঙ্গেই মেনে চলুন এই নিয়মগুলো:
ডিজিটাল ডিটক্স: খেলা শেষ হওয়া মাত্রই ফেসবুক বা এক্স -এ পোস্ট বা কমেন্ট করা বন্ধ করুন। সোশ্যাল মিডিয়ার নীল আলো ঘুম আসার প্রক্রিয়াকে আরও বিলম্বিত করে।
হোয়াটসঅ্যাপ আড্ডা বন্ধ: বন্ধুদের সাথে ম্যাচ নিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত চ্যাট বা বিশ্লেষণ জমিয়ে রাখুন পরের দিনের টিফিন টাইম বা অবসরের জন্য।
পরিবেশ পরিবর্তন: খেলা শেষ হতেই ঘরের আলো নিভিয়ে দিন। এসি বা ফ্যানের তাপমাত্রা আরামদায়ক স্তরে আনুন, যা শরীরকে জানান দেবে যে এবার বিশ্রামের সময় হয়েছে।
মনে রাখবেন, মাঠের লড়াই শেষ পর্যন্ত একটা খেলাই। কিন্তু আপনার শরীর আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় যুদ্ধক্ষেত্র। তাই খেলাও হোক, আর ঘুমও হোক ষোলো আনা!















