গল্পের চেয়েও বুঝি সত্যি, সিনেমার চেয়েও বেশি রোমাঞ্চকর! রূপকথার সেই গল্প মনে আছে, যেখানে রাক্ষস গিলে ফেলেছিল জ্যান্ত রাজপুত্রকে, আর তারপর সেই রাক্ষসের পেট কেটে অক্ষত উদ্ধার করা হয়েছিল সেই রাজপুত্রকে? না রূপকথা নয়, এবার ঠিক এমনই এক হাড়হিম করা বাস্তব ঘটনার সাক্ষী থাকল গোটা বিশ্ব। আফ্রিকার দেশ উগান্ডায় এক দু'বছরের দুধের শিশু জলহস্তীর মুখে চলে যাওয়ার পরও অলৌকিকভাবে ফিরে এল মৃত্যুর ওপার থেকে। আফ্রিকার সবচেয়ে বিপজ্জনক পশুর দাঁতের কামড় ও গ্রাস থেকে বেঁচে ফেরার এই ঘটনা বন্যপ্রাণের ইতিহাসে এক অবিশ্বাস্য মিরাকল।

২০২২ সালের ডিসেম্বরের এক পড়ন্ত বিকেল। উগান্ডার পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত এডওয়ার্ড হ্রদের তীরবর্তী এক শান্ত গ্রাম। গ্রামের অন্য পাঁচটা দিনের মতোই দু বছরের একরত্তি শিশু পল ইগা ওর বাড়ির উঠোনে আপনমনে খেলছিল। হ্রদের শান্ত জল যে ওঁর জন্য ওত পেতে থাকা এক জীবন্ত যমদূত, তা টের পায়নি কেউই। হঠাৎ করেই হ্রদের জল তোলপাড় করে ডাঙায় উঠে আসে এক বিশালকায় জলহস্তী। কিছু বুঝে ওঠার আগেই দানবীয় পশুটি ঝাঁপিয়ে পড়ে ছোট্ট পলের ওপর। ওঁর তীক্ষ্ণ আর অতিকায় দাঁত দিয়ে পলকে কামড়ে ধরে জলহস্তীটি ওঁর আধখানা শরীর আস্ত গিলে নেওয়া (Partially Swallowing) শুরু করে!

 

 

চোখের সামনে একটা ফুটফুটে শিশুকে জীবন্ত চিবিয়ে খাচ্ছে এক নরখাদক জলহস্তী— এই নৃশংস দৃশ্য দেখে উপস্থিত প্রতিবেশীদের রক্ত হিম হয়ে গিয়েছিল। চিৎকার আর কান্নায় ফেটে পড়েছিলেন সবাই, কিন্তু সেই তিন হাজার কেজি ওজনের দানবের সামনে যাওয়ার সাহস ছিল না কারও। যখন মনে হচ্ছিল সব শেষ, ঠিক তখনই রূপোলি পর্দার ক্লাইম্যাক্সের মতোই এন্ট্রি নিলেন ক্রিসপাস বাগনজা নামের এক স্থানীয় যুবক।

পলকে বাঁচাতে নিজের জীবন বাজি রেখে একাই যুদ্ধ ঘোষণা করলেন ক্রিসপাস। আশেপাশে পড়ে থাকা বড় বড় পাথর কুড়িয়ে তিনি পূর্ণ শক্তিতে ছুঁড়তে লাগলেন জলহস্তীটির মাথা আর চোখ লক্ষ্য করে। পাথরের অবিরাম আঘাতে আর আকস্মিক এই পাল্টা আক্রমণে চরম হকচকিয়ে যায় শান্ত স্বভাবের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ওই হিংস্র জানোয়ারটি। বেগতিক বুঝে ওঁর মুখের ভেতর আটকে থাকা পলের আধখানা শরীর উগরে দিয়ে ঝড়ের গতিতে হ্রদের জলের দিকে পালিয়ে যায় জলহস্তীটি। আর এই এক লহমার সিদ্ধান্তই অবসান ঘটায় এক চরম মরণ-যন্ত্রণার।

রক্তাক্ত ও অর্ধচেতন অবস্থায় পলকে উদ্ধার করে তখনই নিয়ে যাওয়া হয় নিকটবর্তী হাসপাতালে। চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত যমের দুয়ার থেকে ফিরে আসে এই একরত্তি শিশু!  কিন্তু এই গল্পটা কেন এতটা অবিশ্বাস্য?

বাস্তব এটাই যে, আফ্রিকায় জলহস্তীর আক্রমণ কোনও নতুন ঘটনা নয়। কিন্তু ওঁর চোয়ালের নিচে গিয়ে কোনও মানুষের জ্যান্ত ফিরে আসার নজির সচরাচর মেলে না। পরিসংখ্যান বলছে—আফ্রিকার সবচেয়ে বিপজ্জনক পশু: দূর থেকে জলহস্তীকে অলস আর শান্ত মনে হলেও, ওরাই আফ্রিকার সবচেয়ে খুনে স্তন্যপায়ী প্রাণী। দানবীয় ওজন ও কামড়: এক একটি পূর্ণবয়স্ক জলহস্তীর ওজন প্রায় ১,৫০০- ৩, ২০০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। জলহস্তীর কামড়ের শক্তি পশুরাজ্যের মধ্যে অন্যতম সেরা। এবং প্রতি বছর ওরাই আফ্রিকায় কয়েকশো মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়!

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ছোট্ট পলের শরীরের ছোট্ট আকার ওঁর জীবন বাঁচাতে সাহায্য করেছে। জলহস্তী সাধারণত মানুষকে খাদ্য হিসেবে শিকার করে না, বরং নিজের সীমানা রক্ষা করার জন্যই আক্রমণ করে। ক্রিসপাস যখন পাথর ছুঁড়ে মনোযোগ ঘুরিয়ে দেয়, তখন পলকে মুখ থেকে ফেলে দেওয়া জলহস্তীটির পক্ষে সহজ হয়েছিল। জানোয়ারটি যদি পলকে গভীর জলের নীচে টেনে নিয়ে যেত, তবে হয়তো আজ এক করুণ খবর দিয়ে মনখারাপ দিয়েই শেষ হত এই প্রতিবেদন।