সাধারণত আমরা ধরে নিই যে, ভৌগোলিক সীমানার নিরিখে ভারতের মানচিত্রের ভেতরে থাকা প্রতিটা ইঞ্চি জমিই ভারতের অংশ। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার বুকে এমন একটি এলাকা রয়েছে, যা এই চেনা ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। চারপাশ থেকে ভারতীয় ভূখণ্ড দিয়ে ঘেরা হওয়া সত্ত্বেও এই জনপদটি আদতে বাংলাদেশের অংশ এবং এখানকার বাসিন্দারা ভারতের নয়, বরং বাংলাদেশ সরকারের আইনকানুন মেনে চলেন!
অদ্ভুত ও রোমাঞ্চকর এই জায়গার নাম ‘দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা’। এটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার অভ্যন্তরে অবস্থিত একটি বাংলাদেশী ছিটমহল। চারপাশে ভারতের কাঁটাতারের বেষ্টনী থাকলেও, প্রায় ১৮.৫ বর্গ কিলোমিটারের এই ভূখণ্ডে বাস করেন ২০,০০০-এরও বেশি বাংলাদেশী নাগরিক। কঠোর নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রিত প্রবেশদ্বারের কারণে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের এই এলাকাটি পুরো বিশ্বের অন্যতম এক অনন্য ভৌগোলিক বিস্ময়।
দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার ভৌগোলিক অবস্থান ভারতের ভেতরে হলেও, এখানকার দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও প্রশাসন সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের ওপর নির্ভরশীল।
টাকা ও পতাকা: এই ছিটমহলে ভারতের ‘রুপি’ চলে না, এখানকার মানুষ কেনাকাটা করেন বাংলাদেশি ‘টাকা’ দিয়ে। জাতীয় দিবসগুলোতে এখানে ওড়ে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা।
মোবাইল নেটওয়ার্ক: এখানে ভারতীয় কোনও সিম কার্ড বা মোবাইল নেটওয়ার্ক কাজ করে না। বাসিন্দারা কথা বলা বা ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশি মোবাইল অপারেটরদের নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করেন।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য: এখানকার স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল থেকে শুরু করে সমস্ত সরকারি সুযোগ-সুবিধা এবং প্রশাসনিক কাজকর্ম পরিচালিত হয় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে।
১৯৯২ সালের আগে এই ছিটমহলের জীবন ছিল চরম যন্ত্রণাদায়ক। মূল বাংলাদেশ ভূখণ্ড থেকে এই এলাকার দূরত্ব ছিল মাত্র ১৭৮ মিটার। কিন্তু মাঝখানের এই সামান্য পথটি ভারতের অংশ হওয়ায় দহগ্রাম-আঙ্গরপোতার মানুষ নিজেদের দেশে যাওয়ার জন্য সরাসরি কোনও রাস্তা পেতেন না।
এলাকা থেকে বের হওয়া বা ঢোকার জন্য প্রতিবার ভারতীয় প্রশাসনের অনুমতির প্রয়োজন হতো। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পাওয়া, উচ্চশিক্ষার অভাব এবং মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকার কারণে তৎকালীন সময়ে এই ছিটমহলের জীবনকে অনেকেই একটি ‘মুক্ত কারাগার’ বা ওপেন-এয়ার প্রিজনের সঙ্গে তুলনা করতেন।
এই মানবিক ও ভৌগোলিক সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য ১৯৭৪ সালে ভারত ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির অধীনে ভারত সরকার বাংলাদেশকে একটি নির্দিষ্ট জমি লিজ বা ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, যা আজ বিশ্বজুড়ে ‘তিন বিঘা করিডোর’ নামে পরিচিত।
১৭৮ মিটার দীর্ঘ এবং ৮াস মিটার চওড়া এই ছোট্ট করিডোরটি দহগ্রাম-আঙ্গরপোকা ছিটমহলকে সরাসরি মূল বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সাথে যুক্ত করেছে।
শুরুর দিকে এই করিডোরের গেটটি চব্বিশ ঘণ্টার জন্য খোলা থাকত না। দিনে মাত্র ১২ ঘণ্টার জন্য ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী এটি খুলে দিত। কোনও বাসিন্দা যদি গেট বন্ধ হওয়ার আগে পার হতে না পারতেন, তবে ওঁরদের সারারাত অপেক্ষা করতে হতো। পরবর্তীতে, ২০১১ সালে এক দ্বিপাক্ষিক সিদ্ধান্তের পর ভারত এই তিন বিঘা করিডোরটি ২৪ ঘণ্টার জন্যই উন্মুক্ত করে দেয়। ফলে বর্তমানে ছিটমহলের বাসিন্দাদের যাতায়াত ও জীবনযাত্রা অনেকটাই সহজ ও স্বাভাবিক হয়েছে।
ভৌগোলিক জটিলতা এবং দু'টি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সদিচ্ছার এক অনন্য ও জীবন্ত প্রতীক হিসেবে আজও ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ও তিন বিঘা করিডোর।















