ব্যবসা শুরু করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন কমবেশি সব যুবকের চোখেই থাকে। কিন্তু সঠিক আর্থিক পরিকল্পনা না থাকলে এবং আগ্রাসীভাবে ব্যবসা বাড়াতে গিয়ে চড়া সুদে ঋণ নিলে সেই স্বপ্ন কীভাবে এক লহমায় দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে পারে— তারই এক জলজ্যান্ত ও মর্মান্তিক উদাহরণ সামনে এল।
মাত্র ২৫ বছর বয়সে ব্যবসা ডুবিয়ে পিঠে ৭০ লক্ষ টাকার দেনা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম রেডিট -এ এক ভারতীয় যুবকের করা আকুল আর্তি এখন নেটপাড়ায় তুমুল চর্চার বিষয়। মা ও বোনের মিলিত আয়ের চেয়েও যেখানে ব্যাঙ্কের ইএমআই অনেক বেশি, সেখানে দাঁড়িয়ে ঋণের ফাঁদ থেকে বেরোনোর জন্য তিনি চাকরি করবেন নাকি ফের লোন নিয়ে নতুন ব্যবসা শুরু করবেন— তা নিয়ে চরম দোলাচলে পড়েছেন ওই তরুণ।
রেডিটে নিজের পরিচয় গোপন রেখে ওই যুবক জানান, তিনি আগে একটি বিপিওতে চাকরি করতেন। ২০২৩ সালে চাকরি ছেড়ে আত্মীয়দের থেকে ২ লক্ষ টাকা ধার নিয়ে একটি ছোট ‘ক্লাউড কিচেন’ শুরু করেন। প্রথম দিকে ব্যবসা বেশ ভাল-ই চলছিল। আর সেই সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়েই তিনি দ্রুত ব্যবসার ডানা মেলার সিদ্ধান্ত নেন। আর সেখানেই ঘটে মস্ত বড় ভুল।বেপরোয়াভাবে ব্যবসা বাড়াতে গিয়ে তিনি একের পর এক লোন নিতে শুরু করেন। পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছায় যে ওঁর মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ কোটি টাকা! যার মধ্যে ৪৫ লক্ষ টাকার মর্টগেজ লোন এবং বাকি ৪০-৪৫ লক্ষ টাকা ছিল চড়া সুদে বাজার থেকে নেওয়া ব্যক্তিগত ঋণ। এই ঋণের মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে মাত্র কয়েক দিনে ওই যুবক ২৫ কেজিরও বেশি ওজন হারিয়ে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন! পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ওঁর পরিবার এগিয়ে আসে এবং ওঁর জমানো বা অন্যান্য উৎস থেকে ৩০ লক্ষ টাকা শোধ করে দেয়। কিন্তু তাও এখনও ওঁর ঘাড়ে ৭০ লক্ষ টাকার বিশাল দেনা রয়ে গিয়েছে।
ওই যুবক রেডিট পোস্টে ওঁর বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতির যে খতিয়ান দিয়েছেন, তা সত্যিই হাড়হিম করা -
বর্তমান আর্থিক বিবরণী টাকার পরিমাণ (মাসিক)
মর্টগেজ লোন ইএমআই ৬৭,০০০ টাকা / মাস
মায়ের মাসিক আয় ১৫,০০০ টাকা / মাস
বোনের মাসিক আয় ৩৬,০০০ টাকা / মাস
পরিবারের মোট আয় ৫১,০০০ টাকা / মাস
অর্থাৎ, মা ও বোনের মোট রোজগার (৫১ হাজার টাকা) মিলিয়েও ব্যাঙ্কের মাসিক ইএমআই-এর ৬৭ হাজার টাকাই উঠছে না! তার ওপর দেনার দায়ে যুবকের সিবিল স্কোর (CIBIL Score) মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে কোনও ব্যাঙ্ক থেকে ওঁর নতুন করে লোন পাওয়ার রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ। ওঁর কাছে এখন স্রেফ আগের রেস্তরাঁর কিছু অবিক্রীত রান্নাঘরের সরঞ্জাম পড়ে রয়েছে।
এই চরম দেউলিয়া পরিস্থিতির মধ্যেও ওই যুবক চাইছেন আবার একটি ছোট ফাস্ট-ফুড আউটলেট বা থ্রিফ্ট স্টোর ক্যাফে খুলতে, যার জন্য ওঁর প্রায় ২ লক্ষ টাকার পুঁজি প্রয়োজন। সমাজমাধ্যমে তিনি জানতে চান, ওঁর কি আবার ধারদেনা করে ব্যবসা করা উচিত নাকি চাকরি খোঁজা উচিত? যুবকটির যুক্তি— “আমি যদি এখন নতুন করে চাকরি খুঁজি, তবে বড়জোর ১৫-২০ হাজার টাকার চাকরি পাব। সেই টাকা দিয়ে এই বিশাল ইএমআই বা দেনার কিছুই শোধ হবে না। যেহেতু আমার কাছে রান্নাঘরের দামি সরঞ্জামগুলো রয়েছে, তাই চেনা ফুড বিজনেস শুরু করাই একমাত্র রাস্তা বলে মনে হচ্ছে।”
দেরযুবকের এই পোস্টের নিচে মন্তব্যের বন্যা বয়ে গেছে। ওঁর এই ‘আবার লোন নিয়ে ব্যবসা’ করার আত্মঘাতী চিন্তাভাবনাকে তীব্র ভাষায় কটাক্ষ করেছেন সমাজমাধ্যম ব্যবহারকারীরা।একজন ব্যবহারকারী কড়া ভাষায় লিখেছেন, “আমি অত্যন্ত সোজাসুজি বলছি। আপনার এই আর্থিক পরিকল্পনা চরম বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়। দয়া করে আর কোনও ক্যাফে বা রেস্তোরাঁ খুলবেন না, কারণ এই বাজারে প্রতিযোগিতা মারাত্মক।” দ্বিতীয় একজন পরামর্শ দিয়ে লিখেছেন, “একটু থামুন ভাই! আপনি আপনার পুরো পরিবারকে এক অন্তহীন ঋণের চক্রে ঠেলে দিচ্ছেন। আপনার মা-বোনের আর্থিক নিরাপত্তা আপনি ইতিমধ্যেই ধ্বংস করে দিয়েছেন। এবার একটু বাস্তববাদী হন। নিজের ইগো সরিয়ে রেখে যেকোনও চাকরিতে যোগ দিন, নিজের দক্ষতা প্রমাণ করে কেরিয়ার নতুন করে গড়ুন। ধীরে ধীরে দেনা শোধ করুন। জীবনে থাম্ব রুল বানিয়ে নিন— ১০%-এর বেশি সুদে কখনো কোনো লোন নেবেন না।”
আবার অন্য একজন মনে করিয়ে দেন, “একটা প্রবাদ আছে— একই ভুল দ্বিতীয়বার করতে নেই। আপনি আপনার পূর্ববর্তী ভুল থেকে শিক্ষা নিন।”২৫ বছরের এই যুবকের কাহিনি প্রমাণ করে যে, ব্যবসার আইডিয়া যতই ভাল হোক না কেন, ব্যাক-আপ প্ল্যান এবং প্রপার ফিইনান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট ছাড়া অন্ধের মতো এগোলে তা শুধু নিজের জীবন নয়, পুরো পরিবারকে পথে বসিয়ে দিতে পারে।
(সতর্কীকরণ: এই প্রতিবেদনটি সোশ্যাল মিডিয়ার ইউজার-জেনারেটেড কনটেন্টের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। আজকাল ডট ইন এর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করেনি এবং এর বিষয়বস্তুকে সমর্থন করে না।)















