টেলিভিশনের জনপ্রিয় অভিনেত্রী জেসমিন ভাসিন সম্প্রতি টার্মিনাল আইলাইটিসে-এ আক্রান্ত হয়েছেন। দুবাইয়ে জন্মদিন উদযাপন করতে গিয়ে আচমকাই তাঁর তীব্র পেটব্যথা শুরু হয়। পরে হাসপাতালে ভর্তি করলে চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর ক্ষুদ্রান্ত্রের শেষ অংশে গুরুতর প্রদাহ ও সংক্রমণ হয়েছে। বর্তমানে তিনি চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। এই ঘটনার পর অনেকের মনেই টার্মিনাল আইলাইটিস রোগটি নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
টার্মিনাল আইলাইটিস কী? আমাদের ক্ষুদ্রান্ত্রের একেবারে শেষ অংশকে বলা হয় টার্মিনাল আইলিয়াম। এই অংশে প্রদাহ বা ফোলা দেখা দিলে তাকে টার্মিনাল আইলাইটিস বলা হয়। এই অংশটি শরীরের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখান থেকেই ভিটামিন বি১২, কিছু প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান এবং পিত্ত অ্যাসিড শরীরে শোষিত হয়। তাই এই অংশে সমস্যা হলে হজমের পাশাপাশি শরীরে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে।
অনেকেই মনে করেন, টার্মিনাল আইলাইটিস মানেই ক্রোনস ডিজিজ। কিন্তু বিষয়টি সবসময় তা নয়। বিভিন্ন কারণে এই রোগ হতে পারে এবং সঠিক কারণ জানা গেলে সেই অনুযায়ী চিকিৎসাও করা সম্ভব।
কেন হয় এই রোগ? চিকিৎসকদের মতে, টার্মিনাল আইলাইটিসের পিছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। যেমন- ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা পরজীবীর সংক্রমণ, ক্রোনস ডিজিজের মতো প্রদাহজনিত অন্ত্রের রোগ, অন্ত্রে যক্ষ্মা, দীর্ঘদিন ব্যথার ওষুধ খাওয়া, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া (অটোইমিউন সমস্যা) খুব কম ক্ষেত্রে অন্ত্রে রক্ত চলাচলে সমস্যা বা অন্য কোনও রোগ। তাই শুধু লক্ষণ দেখে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন হলে রক্ত পরীক্ষা, মল পরীক্ষা, সিটি স্ক্যান, কোলোনোস্কোপি বা বায়োপসি করাতে হতে পারে।
কী কী লক্ষণ দেখা দেয়? এই রোগের লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ পেটের সমস্যার মতোই হয়। তাই অনেকেই গুরুত্ব দেন না। তবে কয়েকটি লক্ষণ দীর্ঘদিন থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত। যা হল- পেটের ডান দিকের নিচে তীব্র বা বারবার ব্যথা, দীর্ঘদিন ডায়রিয়া হওয়া, জ্বর বা শরীর গরম লাগা, বমি বমি ভাব বা বমি, খেতে ইচ্ছে না করা, দ্রুত ওজন কমে যাওয়া, দুর্বলতা ও অতিরিক্ত ক্লান্তি, মলের সঙ্গে রক্ত বা শ্লেষ্মা বের হওয়া। কখনও কখনও এই লক্ষণগুলো কয়েকদিন ভাল থাকে, আবার হঠাৎ বেড়ে যায়। তাই রোগ ধরা পড়তে দেরিও হতে পারে।
এই রোগের চিকিৎসা নির্ভর করে মূল কারণের ওপর। যদি সংক্রমণের জন্য প্রদাহ হয়ে থাকে, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক বা প্রয়োজনীয় ওষুধ দেওয়া হয়। আবার ক্রোনস ডিজিজ বা অটোইমিউন সমস্যার কারণে হলে প্রদাহ কমানোর ওষুধ, স্টেরয়েড বা অন্য বিশেষ ওষুধ ব্যবহার করা হতে পারে।
একইসঙ্গে রোগীকে পর্যাপ্ত জল পান করতে, সহজপাচ্য খাবার খেতে এবং শরীরে পুষ্টির ঘাটতি হলে তা পূরণ করারও পরামর্শ দেওয়া হয়। গুরুতর ক্ষেত্রে যদি অন্ত্রে ক্ষত, বাধা বা অন্য জটিলতা তৈরি হয়, তাহলে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনও হতে পারে। তবে সব রোগীর ক্ষেত্রে অপারেশন লাগে না।
কীভাবে ঝুঁকি কমাবেন? এই রোগ সবসময় প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও কিছু নিয়ম মেনে চললে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো যায়। সবসময় পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যকর খাবার খান। বাইরের অস্বাস্থ্যকর খাবার এড়িয়ে চলুন। পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করুন।চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ব্যথার ওষুধ খাবেন না। ধূমপান ও মদ্যপান এড়িয়ে চলুন। দীর্ঘদিন পেটব্যথা, ডায়রিয়া বা ওজন কমতে থাকলে দেরি না করে গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টের পরামর্শ নিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টার্মিনাল আইলাইটিসকে অবহেলা করা ঠিক নয়। সময়মতো রোগ ধরা পড়লে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব এবং রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।














