স্রেফ ৩৭০ টাকার এক প্লেট চিকেন বিরিয়ানি খাইয়ে ডেটে যাওয়া তরুণীর ওপর অধিকার খাটানো এবং ওঁর অসম্মতি সত্ত্বেও জোর করে অন্ধকার পার্কে নিয়ে যাওয়ার গল্প শোনানো— তাও আবার লাইভ কমেডি শো-এর মঞ্চে! আধুনিক ডেটিং কালচারে নারীর সম্মান, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং নারীর ‘সম্মতি’-কে বুড়ো আঙুল দেখানোর এই মারাত্মক ভিডিও ভাইরাল হতেই দেশজুড়ে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। আর এই প্রতিবাদ, নিন্দার জেরেই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিজের তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার চাকরি খোয়ালেন গুরুগ্রাম (গুরগাঁও)-এর ২৩ বছর বয়সী এক ওয়েব ডেভেলপার।
যুবকের নাম হিমাংশু জাংরা । তিনি ‘স্টারভিক ডিজাইন’ নামের একটি সংস্থায় কর্মরত ছিলেন। স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান প্রনীত মোরে -র একটি শো-এর দর্শকের সঙ্গে কথোপকথনের ভিডিও ক্লিপ ভাইরাল হতেই এই চরম সিদ্ধান্ত নেয় কোম্পানি।
ঠিক কী বলেছিলেন হিমাংশু? সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ক্লিপটিতে দেখা যাচ্ছে, কমেডিয়ান প্রণীত মোরের সঙ্গে কথা বলার সময় হিমাংশু ওঁর একটি ডেটিংয়ের অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন। তিনি অত্যন্ত গর্বের সাথে বলেন যে, তিনি একটি মেয়ের পেছনে ৩৭০ টাকা খরচ করে চিকেন বিরিয়ানি কিনে দিয়েছিলেন। এর পরেই তিনি যোগ করেন— “নিজেকে বললাম, ৩৭০ টাকা যখন খরচ হয়েছে, আমি তো সেটা উশুল করবই!”।
‘উশুল’ করার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে হিমাংশু আরও জানান, ডেটে আসা তরুণীটি অনিচ্ছা প্রকাশ করা এবং বারবার ইতস্তত করা সত্ত্বেও তিনি ওঁকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে একটি অন্ধকার পার্কে নিয়ে যান। এই পুরো কথোপকথন চলাকালীন কমেডিয়ান প্রণীত মোরে বিষয়টিকে সিরিয়াসলি না নিয়ে হেসে ওঠেন এবং মন্তব্য করেন— “ যাকে বলে, একেবারে খাঁটি গুরগাঁওয়ের গল্প”।
ভিডিওটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়াতেই হাজার হাজার ইউজার হিমাংশুর এই পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যবাদী মানসিকতা এবং নারীর সম্মতিকে গুরুত্ব না দেওয়ার চরম সমালোচনা করেন। তীব্র জনরোষের মুখে পড়ে ‘স্টারভিক ডিজাইন’-এর প্রতিষ্ঠাতা বিবেক বিশ্বকর্মা ইনস্টাগ্রামে একটি অফিশিয়াল বিবৃতি জারি করে হিমাংশুকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার কথা ঘোষণা করেন।
বিবেক বিশ্বকর্মা বলেন, “ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর আমাদের কোম্পানিতে শত শত ই-মেল এবং ফোন আসতে শুরু করে। আমি পরিষ্কার করে দিতে চাই, ওই ক্লিপে যা বলা হয়েছে তা অত্যন্ত আপত্তিকর। আমাদের সংস্থা বা আমি ব্যক্তিগতভাবে এই ধরণের মানসিকতা মোটেও সমর্থন করি না। ওই যুবক অফিসের বাইরে কী করেছেন, তা এখন অফিসের সুনাম এবং কাজের পরিবেশ নষ্ট করছে। আমাদের টিম, ক্লায়েন্ট এবং নারী কর্মচারীদের প্রতি আমার একটা দায়বদ্ধতা আছে। তাই আমাদের সংস্থার সঙ্গে ওঁর চুক্তি বাতিল করা হল।”
সংস্থার অভ্যন্তরীণ তদন্তে অবশ্য জানা গেছে যে, অফিসে হিমাংশুর বিরুদ্ধে কোনও নারী সহকর্মীর অভিযোগ ছিল না এবং তিনি কর্মক্ষেত্রে যথেষ্ট পেশাদার ও ভদ্র আচরণই করতেন। কিন্তু অফিসের বাইরে ওঁর এই মারাত্মক নোংরা চিন্তাভাবনা কোনওভাবেই মেনে নেয়নি অফিসের মাথার ।
এই ঘটনায় স্রেফ হিমাংশু নন, নেটিজেনদের ক্ষোভের মুখে পড়েছেন কমেডিয়ান প্রণীত মোরে-ও। একজন নারী নিজের অনিচ্ছার কথা জানানোর পরও ওঁকে জোর করে অন্ধকার জায়গায় নিয়ে যাওয়া এবং বিরিয়ানির টাকা ‘উশুল’ করার মতো একটি সম্ভাব্য অপরাধমূলক মানসিকতাকে মঞ্চে দাঁড়িয়ে ‘রসিকতা’ হিসেবে তুলে ধরা এবং তাতে হাততালি দেওয়াকে চরম ধিক্কার জানিয়েছেন সমাজকর্মীরা।
নেটিজেনদের একাংশ লিখেছেন, “৩৭০ টাকার বিরিয়ানি খাইয়ে এরা মেয়েদের নিজেদের সম্পত্তি মনে করে! এদের শিক্ষা হওয়া উচিত ছিল।”
কেউ বা লিখেছেন, “সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হল, কমেডিয়ান এই বিষয়টিকে রসিকতা হিসেবে নরম্যালাইজ করছেন। একজন মেয়ে ‘না’ বলা সত্ত্বেও ওঁকে অন্ধকার পার্কে নিয়ে যাওয়া কোনও মজা নয়, এটা হেনস্থা।” একজন তো গর্জে উঠে লিখেছেন, “চাকরিটা গিয়ে একদম ঠিক হয়েছে। এই ধরণের মানসিকতার যুবকদের সমাজে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাওয়া উচিত।”
এই ঘটনাটি আধুনিক ডেটিং সংস্কৃতিতে পুরুষদের একাংশের অপরিপক্কতা এবং নারীদের স্রেফ একটি ‘বস্তু’ হিসেবে দেখার মানসিকতার ওপর আরও একবার বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন খাড়া করে দিল।















