আস্ত সংসারটাই চলে আপনার দৌলতে। স্বামী-সন্তানের ভাল থাকা থেকে বাড়ির যাবতীয় খুঁটিনাটি আপনার নখদর্পণে। স্বামীর যথেষ্ট উপার্জনে আপনার বেশ আরামে-বিলাসেই জীবন কাটছে। তা বলে কি নিজের পায়ের তলার জমি এতটুকুও শক্ত করবেন না? ভবিষ্যতের কথা কে-ই বা বলতে পারে! সে ভাবনাটা যদি এখন থেকে নিজেই একটু ভাবেন, ক্ষতি কী! সংসারখরচ বা স্বামীর দেওয়া হাত খরচ থেকে বাঁচিয়ে রাখা টাকা ঠিকমতো পরিকল্পনা করে সঞ্চয় বা বিনিয়োগ করলে সেটাই কিন্তু হতে পারে আপনার আগামীদিনের পুঁজি কিংবা সন্তানদের জন্য রেখে যাওয়া আপনারও কিছুটা আর্থিক অবদান। আর তা ছাড়া, নিজের যে কোনও প্রয়োজন বা শখ-আহ্লাদ মেটাতে সব সময়ে হাত পাততেও হবে না কারও কাছে। সেটা কম নাকি? 
ভাবছেন তো, কীভাবে কী করবেন, কী কী মাথায় রাখবেন? তারই হদিশ রইল এই প্রতিবেদনে। শুরু থেকেই শুরু করা যাক বরং। 

সঞ্চয় বা বিনিয়োগ করবেন কেন?

গৃহবধূ হিসেবে সঠিক সেভিংসের কথা ভাবার কারণ মূলত দুটো। প্রথমত, নিজের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং ভবিষ্যতের পুঁজি। দ্বিতীয়ত, বিপদে কাজে লাগানোর মতো একটা ফান্ড তৈরি করে রাখা। নিজের সঞ্চয়ের টাকায় নিজেই যদি নিজের, স্বামীর বা সন্তানের শখের কোনও জিনিস কিনতে পারেন, তার স্বাদই আলাদা। কাউকে কাউকে তো তার জন্য বা রোজগার না থাকার জন্য নানা সময়ে খোঁটা বা তাচ্ছিল্যও পেতে হয়। তা ছাড়া, ভবিষ্যৎ সব সময়েই অনিশ্চিত। কোনও রকম বিপদ আসতে পারে, আগামীতে স্বামীর অবর্তমানে বা অনুপস্থিতিতে নিজের খরচ চালানোর প্রয়োজন পড়তে পারে অথবা এমন কোনও কিছু না ঘটলেও একটা নিজস্ব পুঁজি থাকা মানে পায়ের তলার জমি শক্ত হয়ে থাকা। 

যা যা মাথায় রাখবেন

এতকাল অর্থকরীর দিকটা আপনার স্বামীই সব সময়ে মাথায় রেখেছেন। আপনি কখনও মাথাও ঘামাননি। এবার যখন নিজেই সে পথে হাঁটছেন, তখন কিছু জিনিস মাথায় রাখলে আপনার কাজটাই সহজ হয়ে যাবে। সঠিক সঞ্চয়ের পথ খুঁজে নিতে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবেন তো অবশ্যই, হয়তো আপনার স্বামীও পাশে থাকবেন। তবু নিজেও একটু জেনে রাখা ভাল। সেভিংস বা ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান বেছে নেওয়ার আগে দেখে নিন—
•    সবার আগে একটা আর্থিক রূপরেখা তৈরি করে নিন। মানে, যে টাকাটা জমাবেন, সেটার উদ্দেশ্য বা সেই পুঁজি দিয়ে আপনি ঠিক কী কী করতে চান। সেই অনুযায়ী প্ল্যান বেছে নিতে হবে। যদি আপনার উদ্দেশ্য হয় স্বামীর অবর্তমানে বা তাঁর অবসরের পরের পুঁজি নিশ্চিত করা, সে ক্ষেত্রে এক রকম প্ল্যান কাজে লাগবে। আবার সন্তানের পড়াশোনার জন্য টাকা রাখতে চাইলে আর এক রকম। 
•    প্ল্যান যেন অনলাইন এবং সহজে ম্যানেজ করার উপযোগী হয়। যাতে আপনার কোথাও যেতে না হয় বা সঞ্চয় করার কাজ চালাতে অন্য কারও উপর নির্ভর করতে না হয়। তা ছাড়া, অটোমেটেড প্ল্যান বেছে নিলে আপনার কাজটা সহজ হতে পারে। মানে, যে প্ল্যানগুলোতে নির্দিষ্ট কিস্তির টাকা সোজাসুজি আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকেই কেটে নেবে। এতে আপনিও নির্ঝঞ্ঝাট থাকবেন। মাসিক বা বাৎসরিক কিস্তির তারিখ ভুলে গেলেও সমস্যা হবে না।   
•    এমন প্ল্যান বেছে নিন, যাতে মাসিক কিস্তিতে সামান্য টাকা দিলেই চলে। এতে প্রয়োজনে আপনি হাতখরচ থেকে বাঁচানো টাকা থেকেই সেভিংস চালিয়ে যেতে পারবেন। 
•    এমন প্ল্যানে টাকা রাখুন যা থেকে আয় বাজারের ওঠাপড়ার উপর যদি নির্ভরশীল হয়ও, তবু আপনার মূল লগ্নি অর্থাৎ প্রিন্সিপালের অঙ্ক যেন সুরক্ষিত থাকে। এতে লোকসানের আশঙ্কা কমে যায় অনেকটাই। তা ছাড়া, বাজারের দোলাচলের উপর নির্ভর করে না, এমন অনেক পথেও সঞ্চয়ের সুযোগ রয়েছে। 
•    প্ল্যানে করছাড়ের বিষয়টা বুঝে নেবেন। তার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে যে টাকাটা হাতে আসবে, তা করমুক্ত কিনা দেখে নিন। ইনক্যাম ট্যাক্সের পুরনো নিয়মে বিমা বা বেশ কিছু প্ল্যানে কিস্তি হিসেবে দেওয়া টাকাতেও করছাড় মিলত। নতুন নিয়মে সেই সুযোগ নেই আর।
•    ইন্টারনেটে, সোশ্যাল মিডিয়ায়, খবরের কাগজে কিংবা টিভিতে হরেক রকম সেভিংস বা ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যানের বিজ্ঞাপন চোখে পড়বে। না বুঝে, না জেনে প্রলোভনের ফাঁদে পা দেবেন না। ঠকে যেতে পারেন। এ বিষয়ে সম্যক জ্ঞান রয়েছে, এমন কোনও কাছের মানুষ কিংবা পেশাদার বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিতে ভুলবেন না। 

যে সব পথে সঞ্চয় করতে পারেন

বাজারে নানা ধরনের সঞ্চয়ের প্ল্যান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা আপনার উদ্দেশ্য এবং প্রয়োজন মতো সঠিক প্ল্যান বেছে দেওয়া কিংবা আপনার সেভিংস এবং ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজ করার দায়িত্ব নিতে পারেন। তা ছাড়া, পরামর্শ নিতে পারেন বাড়ির লোক বা কাছের মানুষদের কাছ থেকেও। 
•    সবার আগে একটা জীবনবিমা এবং চিকিৎসা বিমা করিয়ে নিন। জীবনবিমা সাধারণ ভাবে আপনার মৃত্যুর পরে প্রতিশ্রুত বিরাট অঙ্কের টাকা দিলেও অনেক প্ল্যানই আপনার জীবনকালে ম্যাচিওরিটি অর্থাৎ মেয়াদ শেষের পরে একটা বড় অঙ্কের থোক টাকা ফেরত দেয়। এটা আপনার ভবিষ্যতের পুঁজি হিসেবে কিংবা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য রাখতে পারবেন। অন্যদিকে, সঠিক চিকিৎসা বিমা করা থাকলে আপনার অসুস্থতা বা দুর্ঘটনায় চিকিৎসার প্রয়োজন হলে বাড়ির লোককে খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তে হবে না। 
•    পুঁজি গড়ার জন্য জমানো টাকা দিয়ে ব্যাঙ্কে ফিক্সড ডিপোজিট করতে পারেন। এতে নির্দিষ্ট সময়ের পরে সুদ সমেত একটা বড় অঙ্কের টাকা হাতে পাবেন। 
•    নিজস্ব শখ আহ্লাদ মেটানো, স্বামী-সন্তানদের জন্য পছন্দের জিনিস কেনা বা বাড়ির আসবাবপত্র কেনার মতো কাজে ব্যবহারের অল্প টাকার মাসিক কিস্তিতে ব্যাঙ্কে রেকারিং ডিপোজিটে টাকা রাখতে পারেন। চক্রবৃদ্ধি হারে সেই টাকা বেড়ে মেয়াদ ফুরোনোর পরে একটা বড় অঙ্কের টাকা হাতে পাবেন। 
•    বাজারে লগ্নি করে টাকা খাটানোর ইচ্ছে রয়েছে অথচ নিজের রোজগার না থাকায় সামর্থ্য নেই? কুছ পরোয়া নেই। মাসিক কিস্তিতে একটা ছোট্ট টাকার সিস্টেমেটিক ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান (এসআইপি) করে নিন। এগুলো মোটামুটি নিরাপদ প্ল্যান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে সেই টাকা বেড়ে মূলের সঙ্গে লাভের কড়িও হাতে আসবে। 
•    বিমা, ফিক্সড ডিপোজিট কিংবা রেকারিং ম্যাচিওর করার পরে হাতে আসা থোক টাকা আবার কোনও সেভিংস বা বিনিয়োগের প্ল্যানে লাগিয়ে দিতে পারেন। এতে আপনার পুঁজির পরিমাণ বাড়তে থাকবে। 

সরকারি এবং বেসরকারি— হরেক রকম সেভিংস বা ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান রয়েছে বাজারে। সরকারি বা বেসরকারি ব্যাঙ্কে, বিমা সংস্থা বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে, মিউচুয়াল ফান্ডে, পোস্ট অফিসে। রয়েছে নানা রকম সরকারি প্ল্যানও। আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনুযায়ী সঞ্চয়ের জন্য বেছে নিন উপযুক্ত প্ল্যান। গৃহবধূ বলে টাকার জোর নেই, এ ভাবনাটা আপনার জীবন থেকে চিরতরে মুছে যাক!