আজকাল ওয়েবডেস্ক: রেস্তোরাঁগুলোর কাছ থেকে ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলোর চড়া হারে কমিশন আদায়ের বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক এখন বেঙ্গালুরুর থেকে কলকাতায় পৌঁছে গেল। রেস্তোরাঁ মালিকদের অভিযোগ, ক্রশ বাড়তে থাকা চার্জ, বিজ্ঞাপনের খরচ এবং অস্পষ্ট বা কারণ-না-জানান ছাড়ের ফলে তাদের লাভ এমনিতেই কম থাকে। এবার লাভের অংশ আরও কমছে।
বর্তমানে অনেকেই নিজেদের ডেলিভারি ব্যবস্থা জোরদার করছেন, আবার কেউ কেউ ইতিমধ্যে এক বা একাধিক অনলাইন এগ্রিগেটর (মধ্যস্থতাকারী প্ল্যাটফর্ম) থেকে সরে এসেছেন। অধিকাংশেরই মতে, বর্তমান ব্যবসায়িক মডেলটি আর টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।
'সিক্স বালিগঞ্জ প্লেস' -এর প্রতিষ্ঠাতা-পরিচালক শেফ সুশান্ত সেনগুপ্ত জানিয়েছেন যে, গত কয়েক বছরে তিনি কমিশন প্রায় দ্বিগুণ হতে দেখেছেন। তিনি বলেন, "শুরুতে প্রতি অর্ডারে কমিশনের হার ছিল প্রায় ১২ থেকে ১৫ শতাংশ। কোভিডের পর আমাদের মতো পুরনো রেস্তোরাঁগুলোর ক্ষেত্রে তা বেড়ে ১৯ থেকে ২৩ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে নতুন রেস্তোরাঁগুলোকে নাকি ২৮ থেকে ৩২ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিতে হচ্ছে। এর ওপর আবার তাদের পরিষেবার জন্য ১৮ শতাংশ জিএসটি এবং নানা ধরনের গোপন বা বাড়তি খরচ তো আছেই। এসব কারণে অনেক রেস্তোরাঁর পক্ষেই ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ছে।"
এমন এক সময়ে এই উদ্বেগের কথা সামনে এল, যখন বেঙ্গালুরুর রেস্তোরাঁ মালিকদের সংগঠনও ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে।
'সাঁঝা চুলহা'-র মালিক আসিফ আহমেদ জানান, এই অর্থ কেটে নেওয়ার বিষয়টি ব্যবসার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং অনেকেই এখন নিজেদের ডেলিভারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার দিকে ঝুঁকছেন। তিনি বলেন, "গড় ছাড়ের হার ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে, এমনকি কখনও কখনও তা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশেও পৌঁছায়। যা রেস্তোরাঁ শিল্পকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। গ্রাহকরা সুবিধার জন্য বেশি দাম দিচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু সেই খরচের বোঝা বইতে হচ্ছে রেস্তোরাঁগুলোকেই।" আসিফের আরও জানান যে, ২০০২ সালে চালুর পর থেকেই 'সাঁঝা চুলহা' তাদের নিজস্ব ডেলিভারি ব্যবস্থার ওপরই নির্ভর করেছে। তাঁর মতে, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে শীঘ্রই আরও অনেক ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ এই এগ্রিগেটরগুলোর পরিষেবা নেওয়া বন্ধ করে দিতে পারে।
গোলপার্ক ও বাগুইআটিতে শাখা থাকা 'দ্য ইয়েলো টার্টল' গত ছয় থেকে আট মাস ধরে সুইগি-কে বয়কট করেছে। রেস্তোরাঁ মালিক অপেক্ষা লাহিড়ী অভিযোগ করেছেন যে, কমিশন, ছাড় (ডিসকাউন্ট), প্যাকেজিং এবং প্ল্যাটফর্ম চার্জ বাবদ খরচের পর অর্ডারের মোট মূল্যের ৭০ শতাংশেরও বেশি অর্থ রেস্তোরাঁগুলোর হাতছাড়া হয়ে যায়। তিনি আরও দাবি করেন যে, কোনওরকম সম্মতি ছাড়াই বিভিন্ন বিজ্ঞাপন প্রচার বা ক্যাম্পেইন চালু করা হয়, যার ফলে এমন সব খাতে অর্থ কেটে নেওয়া হয় যার কোনও যৌক্তিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না এবং বারবার অভিযোগ করা সত্ত্বেও সেই অর্থ খুব কমই ফেরত পাওয়া যায়।
লাহিড়ী বলেন, “সবচেয়ে বড় সমস্যা হল স্বচ্ছতার অভাব। টাকা কেটে নেওয়ার বিষয়ে আমরা নিয়মিত খোঁজখবর নিলেও সঠিক কোনও ব্যাখ্যা পাই না। প্ল্যাটফর্মের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করাও অত্যন্ত কঠিন, কারণ তারা ঘন ঘন পরিবর্তিত হতে থাকেন।”
বিরিয়ানি চেন ‘আমিনিয়া’-ও গ্রাহকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ব্যবস্থা জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং ডিরেক্টর আজরা গোলাম জানান, ক্রমবর্ধমান কমিশনের কারণে তাদের ব্যবসার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং মুনাফা কমে যাচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা কেবল অনলাইন পোর্টালের ওপর নির্ভর না করে গ্রাহকদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার এবং ব্যবসার অতিরিক্ত বা বিকল্প মাধ্যম গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছি।”
তবে সবাই যে কমিশনকে অযৌক্তিক মনে করেন, তা নয়। ‘নানিঘর’— যারা মূলত বাড়িতে রান্না করা খাবার নিয়ে কাজ করে তার প্রতিষ্ঠাতা দেবজানি মুখার্জি জানান, ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলোর পরিচালন ব্যয় বা অপারেশনাল খরচ অনেক বেশি। এর মধ্যে রাইডারদের বেতন, লজিস্টিকস এবং প্রযুক্তির খরচ অন্তর্ভুক্ত। তিনি বলেন, “সুইগি এবং জোম্যাটো প্রায় ৩৩ শতাংশ কমিশন নেয়। তারা যে পরিকাঠামোয় কাজ করে, তা বিবেচনা করলে আমার মনে হয় এই হার যৌক্তিক। তবে বড় উদ্বেগের বিষয় হল, প্ল্যাটফর্মে খাবারের ‘ভিজিবিলিটি’ মূলত পেইড অ্যাডভারটাইজমেন্ট বা অর্থের বিনিময়ে চালান বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর করে। এই ব্যবস্থাটি আরও নমনীয় বা সহজ করা যেতে পারে।”
গ্রাহকরাও জানিয়েছেন যে, ফুড ডেলিভারি অ্যাপে খাবারের দাম প্রায়শই সরাসরি রেস্তোরাঁ বা অফলাইন দোকানের তুলনায় বেশি থাকে। এছাড়া অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াটিও বেশ ধীরগতির।
‘মাই কলকাতা’ ন্যাশনাল রেস্তোরাঁ অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া-র প্রেসিডেন্ট সাগর দরিয়ানির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি। কলকাতার এনআরএআই-এর আরেক সদস্য বলেন, “সংগঠনটি বিষয়টি আমলে নিয়েছে এবং সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে আলোচনা চলছে।”
তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে অবশ্য কোনও মন্তব্য করতে রাজি হয়নি সুইগি।
তথ্যসূত্র- দ্য টেলিগ্রাফ
















