বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার ওষুধ নষ্ট হয়ে যায়, কিছু ব্যবহারই হয় না, কিছু আবার ফেলে দেওয়া হয় নর্দমা বা গৃহস্থালি বর্জ্যে, যা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। এই সমস্যার একটি সমাধান খুঁজতে যুক্তরাজ্যের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জেমস গেরান্স, আর. সাইমন শেরাট এবং টেকনো ইন্টারন্যাশনাল নিউ টাউন, কলকাতার নীলাঞ্জন দে মিলে তৈরি করেছেন একটি স্মার্ট প্যাকেজিং সেন্সর, যার নাম দেওয়া হয়েছে SPaRAS (Smart Packaging and Returns Assessment System)। এই গবেষণাটি নেচার গোষ্ঠীর জার্নালে প্রকাশের জন্য গৃহীত হয়েছে।
সমস্যাটা কতটা গুরুতর:
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস)-এর হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ১১ কোটি পাউন্ড মূল্যের ওষুধ ফার্মেসিতে ফেরত আসে এবং তা নষ্ট করে ফেলা হয়। বাড়িতে অব্যবহৃত পড়ে থাকা ওষুধের পরিমাণ আরও বেশি—গবেষণা বলছে, প্রায় অর্ধেক প্রেসক্রিপশন ওষুধই শেষ পর্যন্ত ব্যবহৃত হয় না। এর একটি বড় অংশ মানুষ ফেলে দেন সাধারণ আবর্জনায় কিংবা বেসিন-নর্দমায়, ফলে ওষুধের সক্রিয় উপাদান (API) মাটি, নদী ও এমনকি পানীয় জলেও মিশে যাচ্ছে। থেমস নদীর প্রতিটি পরীক্ষিত অংশেই এই ধরনের রাসায়নিক উপাদান পাওয়া গেছে, এবং এর প্রভাব পড়ছে জলজ প্রাণীদের প্রজনন ক্ষমতা ও আচরণেও।
কেন ওষুধ পুনর্ব্যবহার এখনও কঠিন:
যুক্তরাজ্যে বর্তমানে প্রেসক্রিপশন ওষুধ পুনর্ব্যবহার আইনত নিষিদ্ধ, যদিও কোভিড-১৯ মহামারির সময় কেয়ার হোম ও হসপিসে সাময়িকভাবে এর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ৪৫টি রাজ্যে এটি বৈধ এবং ২৯টি রাজ্যে সক্রিয় কর্মসূচিও চালু আছে। সাধারণ মানুষ মূলত ওষুধ পুনর্ব্যবহারের পক্ষেই মত দেন, বিশেষত যদি তা কোনো চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্ট যাচাই করেন কিংবা প্যাকেজিংয়ে থাকে কোনো নিরাপত্তা-যাচাইকারী সেন্সর। তবে মূল বাধা হলো খরচ—ফেরত আসা ওষুধ পরীক্ষা করে সংরক্ষণ করার জন্য প্রয়োজনীয় শ্রম ও সম্পদের ব্যয়।
SPaRAS কীভাবে কাজ করে:
SPaRAS মূলত একটি ছোট্ট এমবেডেড সেন্সর, যা ওষুধের প্যাকেটের ভেতরেই বসানো থাকে এবং তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়মিত পরিমাপ করে সংরক্ষণ করে রাখে। এটি তৈরি হয়েছে STMicroelectronics-এর SmarTag2 ইভ্যালুয়েশন বোর্ডের ওপর ভিত্তি করে, যাতে যুক্ত করা হয়েছে Sensirion-এর SHT40 তাপমাত্রা-আর্দ্রতা সেন্সর এবং নির্ভুল সময় রাখার জন্য একটি রিয়েল-টাইম ক্লক।
এই ডিভাইসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর নিয়ার ফিল্ড কমিউনিকেশন (NFC) প্রযুক্তির ব্যবহার—একই প্রযুক্তি যা মোবাইল ফোনে টাচলেস পেমেন্টে ব্যবহৃত হয়। এর ফলে ওষুধ বিতরণের সময় একটি JSON ফাইলের মাধ্যমে দ্রুত সেন্সরটি কাস্টমাইজ করা যায়, এবং ফার্মেসিতে ফেরত আসার পর NFC-এর মাধ্যমেই তথ্য দ্রুত পড়ে নেওয়া যায়—প্যাকেট না খুলেই। এতে প্যাকেজিং ডিজাইনে কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ে না এবং সাধারণ মানুষকেও নতুন কোনো অভ্যাস রপ্ত করতে হয় না।
পরীক্ষার ফলাফল:
গবেষকরা দুটি ডিভাইস টানা ৯ দিন ধরে চালিয়ে পরীক্ষা করেছেন, যেখানে একটি বাড়িতে ওষুধ সংরক্ষণের বাস্তব পরিস্থিতি অনুকরণ করা হয়েছিল। দুটি ভিন্ন প্রোফাইলে চলা সত্ত্বেও তাপমাত্রায় গড় পার্থক্য ছিল মাত্র ০.২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং আর্দ্রতায় ০.২৮ শতাংশ—অর্থাৎ যন্ত্রটি বেশ নির্ভুল।
ব্যাটারি লাইফ নিয়ে পরীক্ষায় দেখা গেছে, এনএইচএস-এ বর্তমানে ব্যবহৃত সেন্সরের মতো একই হারে (প্রতি ১০ মিনিটে একবার) তথ্য সংগ্রহ করলে SPaRAS একটানা ১৭ দিন চলতে পারে। আর যদি বিদ্যুৎ সরবরাহের কোনো সীমাবদ্ধতা না থাকত, তাহলে বোর্ডটি প্রায় ১৬৮ দিন পর্যন্ত চালানো সম্ভব হত। গবেষকরা জানিয়েছেন, একটি বিশেষায়িত সার্কিট বোর্ড ডিজাইন করে বিদ্যুৎ খরচ কমানো গেলে বর্তমান মেমোরি ক্ষমতাতেই ডিভাইসটি প্রায় ৩৩৭ দিন পর্যন্ত সচল রাখা সম্ভব—যা বেশিরভাগ ওষুধের নিরাপত্তা যাচাইয়ের জন্য যথেষ্ট। মেমোরির ক্ষেত্রে, ফ্ল্যাশ মেমোরিতে প্রায় ৯৭ হাজারের বেশি রিডিং সংরক্ষণ করা সম্ভব, আর তুলনামূলক ছোট NFC চিপে সংরক্ষণ করা যায় প্রায় হাজার খানেক রিডিং। তথ্য ডাউনলোড করার গতিও যথেষ্ট দ্রুত—সাধারণ ব্যবহারে এক মাসের তথ্য ডাউনলোড করতে এক মিনিটেরও কম সময় লাগে।
সামনের পথ ও চ্যালেঞ্জ:
গবেষকরা মনে করছেন, এই প্রযুক্তি নীতিনির্ধারকদের কাছে বড় পরিসরে ওষুধ পুনর্ব্যবহারের পরীক্ষা চালানোর পক্ষে যুক্তি জোরদার করতে সাহায্য করবে। তবে তাঁরা কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরেছেন। যেমন, নকল বা ক্ষতিগ্রস্ত প্যাকেট শনাক্ত করে বাতিল করার ব্যবস্থা, তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা, এবং নতুন সিস্টেম বাস্তবায়নের আর্থিক সম্ভাব্যতা।
ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তিকে ব্লকচেইনের সঙ্গে যুক্ত করে জাল ওষুধ শনাক্তকরণেও ব্যবহারের কথা ভাবছেন গবেষকরা। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে ওষুধের "ডাইনামিক এক্সপায়ারি ডেট" বা পরিবর্তনশীল মেয়াদ নির্ধারণের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হতে পারে, যা বর্তমান নির্দিষ্ট মেয়াদোত্তীর্ণ তারিখের বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে।
গবেষণা দলটির মতে, বাস্তব ফার্মেসি পরিবেশে পরীক্ষা চালিয়ে এই সিস্টেমের কার্যকারিতা যাচাই করাই এখন পরবর্তী ধাপ, যা একদিন ওষুধ অপচয় ও তার পরিবেশগত ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারে।

তথ্যসূত্র: Gerrans, J., Dey, N., & Sherratt, R.S. ‘A Customisable Environmental Sensor to Enable Prescription Medicine Reuse,’ Scientific Reports, Nature (Accepted for publication on 17 July 2026)
















