আজকাল ওয়েবডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ প্রক্রিয়া বা এসআইআর-এর সময় তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার জেরে আটক এক ব্যক্তির বিষয়ে দায়ের করা 'হেবিয়াস কর্পাস' মামলা খারিজ করল কলকাতা হাইকোর্ট। উচ্চ আদালতের জানিয়েছে- ভোটার পরিচয়পত্র, আধার ও প্যান কার্ড ভারতীয় নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা যায় না।

সুমন মোল্লা নামে এক ব্যক্তি এই মামলাটি দায়ের করেছিলেন। তাঁর দাবি ছিল, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার বিরুদ্ধে করা আপিল বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও তাঁর ভাইপো নাসিরকে আটক কেন্দ্রে পাঠান হয়েছে। আদালত জানায়, আবেদনকারী বা আটক ব্যক্তি- কেউই নাসিরের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারেননি। তাই এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে আদালত কোনও হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকার করে।

আবেদনকারী নাসির যে একজন ভারতীয় নাগরিক, তিনি বিদেশি নন- তা প্রমাণ করতে তাঁর ভোটার পরিচয়পত্র, আধার কার্ড, আয়কর বিভাগের দেওয়া প্যান কার্ড এবং একটি ব্যাঙ্ক পাসবুক হাইকোর্টে পেশ করা হয়েছিল। কিন্তু বিচারপতি দেবাংশু বসাক ও বিচারপতি অজয় কুমার গুপ্ত-র ডিভিশন বেঞ্চ রায় দেয় যে, ভোটার পরিচয়পত্র, আধার ও প্যান কার্ড ভারতীয় নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।

বেঞ্চ জানায়, ভোটার পরিচয়পত্রের মাধ্যমে কোনও ব্যক্তি ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিলেন কিনা তা যাচাই হয়। পাশাপাশি আদালত উল্লেখ করে যে, ২০২৬ সালের এসআইআর প্রক্রিয়ার সময় নাসিরের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। আদালত আরও জানায় যে, কেবল ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট- ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ হতে পারে না।

আদালতের পর্যবেক্ষণ, "রিট আবেদনকারী এবং আটক ব্যক্তি 'ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট, ২০২৫'-এর বিধান অনুযায়ী প্রমাণের দায়ভার পালনে ব্যর্থ হয়েছেন।" আবেদনকারী বা আটক ব্যক্তি- কেউই নাসিরের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারেননি বলে উল্লেখ করে আদালত জানায় যে, তারা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করতে ইচ্ছুক নয় এবং 'হেবিয়াস কর্পাস' আবেদনটি খারিজ করে দেয়।

বেঞ্চ উল্লেখ করে যে, গত বছর ২রা মে- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের একটি নির্দেশিকা অনুযায়ী চলতি বছরের ১৮ জুন নাসিরকে আটক করা হয়েছিল। বর্তমানে তিনি একটি ডিটেনশন সেন্টারে (আটক কেন্দ্রে) রয়েছেন। আদালত জানায়, ওই নির্দেশিকায় আটক ব্যক্তিকে ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য ৬০ দিন সময় দেওয়া হয়। কিন্তু ২০ জুলাই রায় ঘোষণার দিন পর্যন্ত নাসির তাঁর নাগরিকত্ব প্রমাণকারী কোনও নথি দাখিল করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

আদালত আবেদনকারীর আইনজীবীকে নাসিরের সঙ্গে ফোনে কথা বলার অনুমতিও দেয়। কথোপকথনের সময় নাসির জানান যে, তাঁর বাবা-মা ভারতেই মারা গিয়েছিলেন। তবে আদালত উল্লেখ করে যে, এমন দাবি করা সত্ত্বেও তিনি তাঁদের কোথায় সমাহিত করা হয়েছিল, তা শনাক্ত করতে পারেননি।

বেঞ্চ পর্যবেক্ষণ করে, "আটক ব্যক্তির বাবা-মা যে ভারতেই ছিলেন তা প্রমাণ করার লক্ষ্যে, আবেদনকারী সম্মত হলে তাঁদের দেহাবশেষের ডিএনএ পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়ার জন্য আমরা আটক ব্যক্তির বাবা-মা সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছিলাম।" আদালত আরও বলে, "যেহেতু আটক ব্যক্তি ও রিট আবেদনকারী তাঁর বাবা-মায়ের দেহাবশেষের অবস্থান শনাক্ত করতে অস্বীকার করেছেন, তাই তাঁর বাবা-মা ভারতীয় নাগরিক ছিলেন কি না, সেই বিষয়ে আমরা আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে একটি বিরূপ ধারণা পোষণ করছি।" 

আদালত আবেদনকারীর বিষয়টি নেতিবাচকভাবে দেখে এবং মন্তব্য করে যে, মোল্লা ‘পরিচ্ছন্ন হাত’ নিয়ে (অর্থাৎ সৎ উদ্দেশ্য ও স্বচ্ছতা বজায় রেখে) আদালতের দ্বারস্থ হননি। আদালত লক্ষ্য করে যে, পুলিশের কাছে করা লিখিত অভিযোগে তিনি নিজেকে নাসিরের কাকার ছেলে হিসেবে পরিচয় দিলেও রিট আবেদনে দাবি করেছেন যে- তিনি ওই আটক ব্যক্তির কাকা। আবেদনে আরও বলা হয়েছিল যে, ১৯৮০ সালে নাসিরের বাবার মৃত্যুর পর মোল্লাই তাঁকে বড় করে তুলেছেন। তবে আদালত লক্ষ্য করে যে, আবেদনকারীর বয়স ৩৮ বছর আর আটক ব্যক্তির বয়স ৪৬ বছর। তাই আদালত এই দাবিটি খারিজ করে দেয়।

কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে আইনজীবী জানান, ১৮ জুন ২০২৬ তারিখে নাসিরের বিরুদ্ধে জারি করা আটকের আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে যে- তাঁর নাগরিকত্ব সংক্রান্ত তদন্ত, জিজ্ঞাসাবাদ ও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে তাঁকে একজন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। আদালতে দেওয়া নথিপত্র অপর্যাপ্ত বিবেচিত হওয়ায় এবং আবেদনকারীর দাবি খারিজ হয়ে যাওয়ায়, হাইকোর্ট আবেদনটি বাতিল করে এবং আটকের আদেশটি বহাল রাখে।